• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ন
Headline
মানবপাচারের মহোৎসব ও আমাদের দায় মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপি এলিজার মনোনয়নপত্র জমা সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান পুনর্বহাল সিঙ্গাপুরে তেলের মজুত গড়বে সৌদি আরামকো ক্রসফায়ারের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি টিআইবির চলতি বছরই ১ লাখ আনসার সদস্যকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা: আনসার ডিজি দুই বছরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত গেলেন এনএসআই মহাপরিচালক দেশের মানুষ আপনার অপেক্ষায় আছে: হাসিনাকে দুলু রাষ্ট্রায়ত্ত ৩ ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জীবনাবসান

Reporter Name / ৯৬ Time View
Update : রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। আজ রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) ভোর ৪টা ১৯ মিনিটে রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। বর্ষীয়ান এই নেতার মৃত্যুতে দেশের রাজনীতিতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি হলো। জীবনভর আইন ও রাজনীতির জটিল পথে হাঁটা এই ক্ষণজন্মা মানুষটি সততা ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ধাপে।

১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স ও মা বেগম ফখরুন্নেছা। শিক্ষাজীবনে অত্যন্ত মেধাবী জমির উদ্দিন সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। জ্ঞানপিপাসু এই মানুষটি ১৯৬১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে এবং লন্ডনের বিখ্যাত লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফেরার পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে সংবিধান, দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ হিসেবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি এক কন্যা ও দুই পুত্রের জনক ছিলেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের রাজনীতির হাতেখড়ি হয় ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে ১৯৪৫ সালে, যখন তিনি ছিলেন ছাত্রাবস্থায়। সেই সময়ের উত্তাল রাজনীতিতে তিনি ক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পেয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জিয়ার গড়া ‘জাগদল’ বা জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘স্থায়ী কমিটি’র সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আইন পেশায় অসাধারণ দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বিষয়ে পাণ্ডিত্যের কারণে তিনি রাষ্ট্রপতির বিশেষ আস্থাভাজন ছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে টানা পাঁচবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করেন, যা ছিল তাঁর কূটনৈতিক সফলতার এক অনন্য নজির। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের আমলে রাষ্ট্রপতি একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর এক জটিল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে ২১ জুন ২০০২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

মন্ত্রী হিসেবে তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় ৬ এপ্রিল ১৯৮১ থেকে ২৭ নভেম্বর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি বর্তমান জাতীয় সংসদ ভবনের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এরপর আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় তিনি পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়ার প্রথম মন্ত্রিসভায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষাখাতে সংস্কারে ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের স্বল্পকালীন মেয়াদে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল প্রণয়নে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন।

সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে তাঁর নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অষ্টম জাতীয় সংসদে ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সফলভাবে জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-১ আসন থেকে প্রথমবার জয়ের পর, ১৯৯১ সালে ঢাকা-৯ আসন থেকে জয়লাভ করেন। এরপর ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, ১২ জুন ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হন। সর্বশেষ ২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদের বগুড়া-৬ আসনের উপ-নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন আইন ও নীতির এক সংমিশ্রণ। সুপ্রিম কোর্টের আঙিনা থেকে শুরু করে জাতীয় সংসদের স্পিকারের চেয়ার পর্যন্ত প্রতিটি জায়গাতেই তিনি রেখে গেছেন তাঁর মেধার স্বাক্ষর। তাঁর মৃত্যুতে একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। দেশের রাজনীতি ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে চিরদিন স্মরণ করবে। তাঁর প্রয়াণে শোকসন্তপ্ত পরিবার এবং অনুসারীদের প্রতি রইল গভীর সমবেদনা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category