কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ ও জীর্ণ বাঁশ-পলিথিনের ঝুপড়ি ঘরের আড়ালে গড়ে উঠেছে অত্যন্ত সুসংগঠিত, ভয়ংকর ও সশস্ত্র অপরাধীদের এক সমান্তরাল জগৎ। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক বিশেষ অভিযানে সাধারণ বসতঘরের মেঝের নিচে অত্যন্ত চতুরতার সাথে তৈরি করা গোপন সুরঙ্গ এবং মাটির নিচের একাধিক লুকানো কক্ষের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও প্রশাসনকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার তৎপরতা শুরু হলেই যাতে মুহূর্তের মধ্যে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে এবং সেখান থেকে পাহাড়ি দুর্গম ঢালে পালিয়ে যাওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এই সুপরিকল্পিত গোপন সুড়ঙ্গপথ নির্মাণ করেছে। উখিয়ার ময়নারঘোনা ১২ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-ব্লকে পরিচালিত এই অভিযানের মধ্য দিয়ে ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অপরাধী চক্রগুলোর শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত হয়েছে, তা আরও একবার দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ঘটনার বিশদ বিবরণ থেকে জানা যায়, ময়নারঘোনা ক্যাম্পে চিহ্নিত রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী চক্রের সদস্যদের এক বড় ধরনের জমায়েত ও প্রকাশ্যে গরু জবাই করে ভূরিভোজের আয়োজন করার সুনির্দিষ্ট গোপন তথ্য পায় ৮ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। সেই সংবাদের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ডিআইজির নেতৃত্বে পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ওই ব্লকে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। তবে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর বিষয়টি আগেভাগেই টের পেয়ে যায় অপরাধীরা এবং তারা নিমেষেই মেঝের নিচে তৈরি করা সুড়ঙ্গপথ ও পেছনের গোপন রুট ব্যবহার করে গাঢাকা দেয়। পরবর্তীতে ওই বাড়িগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে কেবল অসহায় নারী ও শিশুদের উপস্থিতি দেখতে পান অভিযানকারী দলের সদস্যরা। তল্লাশিকালে সাধারণ শরণার্থীদের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটে ওঠে ওই সন্ত্রাসীদের আস্তানায়। বাড়িগুলোর ভেতরে আধুনিক ও চোখধাঁধানো সাজসজ্জা এবং মেঝের ঢাকনা সরাতেই বেরিয়ে আসা লুকানো কক্ষ ও সুড়ঙ্গ দেখে স্তম্ভিত হয়ে পড়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের আড়ালে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা মাদক ও চোরাচালানের অঢেল টাকায় রাজকীয় জীবনযাপন করছে।
উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোর ভৌগোলিক অবস্থানকে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করে এক শ্রেণির সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পুরো এলাকাটিকে কার্যত তাদের নিজস্ব অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। বিশেষ করে ক্যাম্প-৮-এর পূর্ব ও পশ্চিমের অংশসহ দুর্গম পাহাড়ি খাঁজ ও গভীর অরণ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রবেশ করা অত্যন্ত দুরূহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রামের কুখ্যাত জঙ্গল সলিমপুরের অনুরূপ এক ধরনের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে এই অপরাধীরা। পাহাড়ের ওপর থেকে নজরদারি চালানো, সশস্ত্র পাহারা বসানো এবং যেকোনো অভিযানের মুখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর অতর্কিত প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে গভীর বনে আত্মগোপন করার সমস্ত প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। পর্যাপ্ত ভারী অস্ত্র এবং অতিরিক্ত জনবল ছাড়া এসব দুর্গম পয়েন্টে প্রবেশ করা যেকোনো বাহিনীর জন্যই এখন বড় ধরনের সামরিক ঝুঁকির শামিল। ফলে সাধারণ রোহিঙ্গারা যেমন এই অস্ত্রধারী ক্যাডারদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে, তেমনি ক্যাম্পের সীমানা পেরিয়ে আশপাশের স্থানীয় বাংলাদেশি জনপদেও চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তা শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ছে।
ক্যাম্পের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির এমন মারাত্মক অবনতি এবং সন্ত্রাসী চক্রের লাগামহীন তৎপরতার পেছনে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কাঠামোর শিথিলতা ও গভীর সমন্বয়হীনতাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন সংশ্লিষ্টরা। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে নানা ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে সপ্তাহের নিয়মিত সরকারি ছুটির দিনগুলোতে ক্যাম্প ইনচার্জ বা সিআইসিদের বড় একটি অংশ কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না। ক্যাম্পে অবস্থান উপযোগী আবাসন ও খাবারের সুব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ছুটির দিনগুলোতে তাদের অনুপস্থিতির কারণে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ে। ফলে জরুরি কোনো পরিস্থিতিতে বা কোনো অপরাধী চক্রকে আটকের উদ্দেশ্যে তাৎক্ষণিক যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে গেলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতাপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের খুঁজে পাওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। একই সাথে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পারস্পরিক যোগাযোগের ঘাটতি এবং পরবর্তীতে অভিযান নিয়ে নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হওয়ায় মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অপরাধচিত্রের এক লোমহর্ষক ও আঁতকে ওঠার মতো বাস্তব রূপ ফুটে ওঠে। বিগত নয় বছরে আশ্রয়শিবিরগুলোতে কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং মাদক বিরোধকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৮৮ জন ব্যক্তি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় ২৭৭টি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় দুই হাজার আসামিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে গড়ে ওঠা মাদক সিন্ডিকেটের ভয়াবহত প্রকাশ পায় এর মামলার পরিসংখ্যানে। গত সাত বছরে মাদক সংক্রান্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে এবং এসব মামলায় প্রায় ছয় হাজার অপরাধীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ডাকাতি, অবৈধ অস্ত্র সংরক্ষণ, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে মানবপাচারের ঘটনায় আরও কয়েক শত মামলা দায়ের করা হয়েছে।
বিগত ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাত বছরে পরিচালিত ধারাবাহিক অভিযানে এপিবিএন প্রায় ৪৯ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, বিপুল পরিমাণ ইয়াবার কাঁচামাল বা গুঁড়া, শত শত কেজি গাঁজা, বিপুল পরিমাণ দেশি মদ এবং স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই সহস্রাধিক চিহ্নিত অপরাধীকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেছে বিশেষায়িত এই পুলিশ বাহিনী। ক্যাম্পের সুরক্ষায় এপিবিএন সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি করছে এবং সাইবার অপরাধ, উগ্রবাদ ও সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদ কঠোর হাতে দমনের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, বিশেষ শাখা ও কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সমন্বয়ে একটি বিশেষায়িত শক্তিশালী কাঠামো গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশাল আয়তনের ক্যাম্প ও পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে অপরাধীদের পুরোপুরি সমূলে উৎপাটন করা এখনও এক বিশাল চ্যালেঞ্জ।
এমন এক রক্তক্ষয়ী ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই আজ পূর্ণ হলো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের দীর্ঘ নয় বছর। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমার সামরিক জান্তা এবং তাদের দোসরদের বর্বরোচিত জাতিগত নিধন, গণহত্যা ও নারকীয় নির্যাতনের মুখে পড়ে বেঁচে থাকার তাগিদে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল লাখ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক। পরবর্তীতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের জেরে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েক লাখ মানুষ এ দেশে প্রবেশ করে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের কিছু বেশি, যার প্রায় ৭৮ শতাংশই নারী ও শিশু এবং অর্ধেকেরও বেশি অপ্রাপ্তবয়স্ক। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, জন্মহার বৃদ্ধি এবং তালিকার বাইরে থাকা বিপুল জনগোষ্ঠী মিলিয়ে এই সংখ্যা বাস্তবে ১৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে।
দীর্ঘ নয়টি বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ জন্মভূমি মিয়ানমারে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক মহলের কূটনৈতিক আলোচনা, একের পর এক বৈঠক এবং মানবিক উদ্বেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে গোটা সংকট। প্রত্যাবাসন কার্যক্রমের কোনো দৃশ্যমান আলো দেখতে না পেয়ে সাধারণ শরণার্থীদের মধ্যে চরম নৈরাশ্য ও হতাশা দানা বাঁধছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, তারা কোনো রাজনৈতিক খেলায় ব্যবহৃত হতে চান না, বরং নাগরিক অধিকার ও জানমালের পূর্ণ নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের পৈতৃক ভিটামাটিতে ফিরে যেতে চান। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃশ্যমান পদক্ষেপ ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটবে না এবং ক্যাম্পগুলোর অপরাধের এই বিষবাষ্প নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে তা সমগ্র অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যই এক মহাবিপদ ডেকে আনবে।