দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রমের মোট ১৩৭টি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে ১৩৩টিরই পরিমার্জন ও সম্পাদনার কাজ প্রায় শেষ করে আনা হয়েছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যুগোপযোগী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য সম্পূর্ণ নতুন চারটি বই যুক্ত করার জোর প্রস্তুতি চলছে। সংশোধিত ও নতুন বইগুলোতে ইতিহাস, বাংলা সাহিত্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নতুন তথ্য সংযোজন, সমসাময়িক হালনাগাদ বিষয়বস্তু এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিটিবির নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী মাস থেকেই মাঠপর্যায়ে বই মুদ্রণের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে এবং নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে এই মানসম্মত বইগুলো পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনসিটিবি-র অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরের মোট ৩৬টি পাঠ্যবইয়ের সবকটির এবং মাধ্যমিক স্তরের ৯৯টি পাঠ্যবইয়ের মধ্যে ৯৭টির পরিমার্জন ও ইনডিজাইনের কাজ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। অবশিষ্ট চারটি বই নতুন সংযোজন হওয়ায় সেগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু, শৈল্পিক অলংকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো চূড়ান্ত করার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। পুরো শিক্ষাবর্ষের বই প্রস্তুতের এই বিশাল ও জটিল প্রক্রিয়ায় দেশের প্রায় চার শতাধিক প্রথিতযশা বিষয় বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, গবেষক, সম্পাদক এবং অভিজ্ঞ কারিগরি শিক্ষকের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। এই বিশাল পরিমার্জন কাজের মধ্যে প্রাথমিকের বইগুলোর জন্য ১৬০ জন এবং মাধ্যমিকের বইগুলোর জন্য ২৫০ জন বিষয় বিশেষজ্ঞ দিনরাত কাজ করেছেন। এনসিটিবি-র চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা এই বিষয়ে অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, ১৩৩টি বইয়ের মুদ্রণ-পূর্ব সকল প্রস্তুতি ও সম্পাদনা শেষ হয়েছে এবং নতুন বইগুলোর কাজও দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ হবে।
চেয়ারম্যানের তথ্যমতে, এবারের বই সংস্কারের প্রধান লক্ষ্যই হলো সম্পূর্ণ নির্ভুল, আন্তর্জাতিক মানসম্মত এবং সময়োপযোগী পাঠ্যপুস্তক কোমলমতি শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া। এই লক্ষ্যে প্রতিটি বইয়ের বানান, ভাষা, তথ্যের সত্যতা এবং তা শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপনের শৈল্পিক পদ্ধতির ক্ষেত্রে একাধিক ধাপে নিবিড় যাচাই-বাছাই ও কঠোর স্ক্রিনিং করা হয়েছে। একই সাথে বছরের শুরুতে বই মুদ্রণ ও সারা দেশে তার নির্বিঘ্ন বিতরণ নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা প্রশাসনের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সমন্বয় ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। এনসিটিবি-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সারা দেশে প্রায় ৩০ কোটি ৮৩ লাখের বেশি পাঠ্যবই ছাপানো হবে। এর মধ্যে কেবল প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য আট কোটির বেশি (সঠিকভাবে ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩০ কপি) এবং মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য ২১ কোটির বেশি (সঠিকভাবে ২১ কোটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার ৩৩২ কপি) বই মুদ্রিত হবে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই এই ছাপার কাজ শুরু হয়ে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তা শেষ করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে ডিসেম্বর থেকেই ধাপে ধাপে দেশের সব অঞ্চলে বই বিতরণ শুরু করা যায়।
এবারের পাঠ্যবইয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তু ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক উল্লেখযোগ্য ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিখ্যাত দুটি রচনা ‘একটি জাতির জন্ম’ এবং ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’র ওপর ভিত্তি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক একটি নতুন এবং সমৃদ্ধ পাঠ যুক্ত করা হচ্ছে। একইভাবে পঞ্চম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ শীর্ষক অধ্যায়েও বড় ধরনের পরিমার্জন আনা হচ্ছে। বর্তমানে অন্তর্ভুক্ত থাকা চার জাতীয় নেতার পাশাপাশি সেখানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ও দেশের জন্য অবদানকে বিস্তারিতভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনায় থাকা শরীফ ওসমান বিন হাদীর নাম আগামী শিক্ষাবর্ষের বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। এনসিটিবি-র সদস্য অধ্যাপক ড. মো. ইকবাল হায়দার জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের বইয়ের সম্পাদনার কাজ ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ায় এবার তাঁর নাম যুক্ত করা সম্ভব হয়নি, তবে ২০২৮ সালের শিক্ষাক্রমে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’ অধ্যায়ে তিতুমীর, প্রীতিলতা, নূর হোসেন, আবু সাঈদ ও মুগ্ধের পাশাপাশি তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ইতিবাচক চিন্তাভাবনা রয়েছে।
দেশের মূল ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইগুলোতে ঐতিহাসিক তথ্যের একপেশে উপস্থাপন রোধে বড় ধরনের সংযোজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন সেক্টর, জেড ফোর্স, কে ফোর্সের অবদান, ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়া বৈঠক, তৎকালীন সামরিক কৌশল এবং বিভিন্ন বীর সেনানায়কের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আরও বিস্তারিত ও তথ্যসমৃদ্ধভাবে তুলে ধরা হবে। এছাড়া ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লব, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আপসহীন ভূমিকা এবং অতি সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনাও নতুনভাবে পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এনসিটিবি-র সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর বলেন, ইতিহাসকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একপেশেভাবে নয়, বরং সম্পূর্ণ যাচাইকৃত ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করাই এবারের প্রধান লক্ষ্য। উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৬ সালের মাধ্যমিকের বাংলা বই থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাদ দেওয়া হলেও ইতিহাস এবং বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পুনরাবৃত্তি কমিয়ে তা আগের মতোই যথাযথ স্থানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
যুগোপযোগী প্রযুক্তি শিক্ষাতেও এবার বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসছে এনসিটিবি। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ে প্রথমবারের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিক্স, আধুনিক তথ্য বিশ্লেষণ বা ডেটা অ্যানালাইসিস এবং আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারিক ও বাস্তবমুখী প্রয়োগ নিয়ে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায় যুক্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষাবিদেরা বলছেন, ভবিষ্যতের চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও আন্তর্জাতিক কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা সামঞ্জস্যপূর্ণ করতেই এই আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আগামী শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য যে নতুন চারটি বই যুক্ত হচ্ছে, তার মধ্যে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ এবং ‘সংস্কৃতি’ নামে দুটি নতুন বই পড়ানো হবে। খেলাধুলা বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, দাবা, ব্যাডমিন্টন, অ্যাথলেটিকস এবং সাঁতারের মতো জনপ্রিয় খেলার মৌলিক ধারণা ও ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হচ্ছে ‘আনন্দের সঙ্গে শেখা’ নামক একটি বই এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে আরও একটি বিশেষ বই যুক্ত হবে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৮ সাল থেকে দেশে সম্পূর্ণ নতুন ও আধুনিক এক শিক্ষাক্রম চালুর প্রস্তুতিও সমান্তরালভাবে চলছে। নতুন এই শিক্ষাক্রমে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার সনাতন পদ্ধতিকে পুরোপুরি বিদায় জানিয়ে অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা, গবেষণামুখী শিখন, বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধান, সৃজনশীলতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। বইয়ের সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে কমিয়ে ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বহুগুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এনসিটিবি জানিয়েছে, এই নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়নের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, ফিনল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ বিশ্বের অন্তত ১৬টি উন্নত দেশের আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও কারিকুলাম নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এই বিষয়ে জানিয়েছেন যে, কেবল পাঠ্যবইয়ের পরিবর্তনই নয়, বরং সমন্বিত শিক্ষক নীতিমালা, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, স্মার্ট ক্লাসরুম, ভিডিওভিত্তিক পাঠদান ব্যবস্থা এবং তাৎক্ষণিক ডিজিটাল মূল্যায়ন পদ্ধতির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক প্রাথমিক শিক্ষায় এক গুণগত ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার মহাপরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পাঠ্যবইয়ের এই বিশাল পরিমার্জন ও নতুন বইয়ের সংযোজন শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল