• বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৬ পূর্বাহ্ন
Headline
ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে নীতিগত রূপান্তরের তাগিদ হামের উপসর্গে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে: আইনমন্ত্রী তিনি একদম ঠিক আছেন: ইউনূস সেন্টার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু ইরানি নেতাদের হত্যা করার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো অনেকদূর চলে গেছি: ট্রাম্প জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে: এলজিআরডি মন্ত্রী রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা: আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তদন্ত করছে সৌদি আরব প্লাস্টিক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই : পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ

বাংলাদেশের গ্যাস গেলো কোথায়?

Reporter Name / ৫২ Time View
Update : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

বর্তমান সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরবর্তী রাষ্ট্রপতির নাম বা ক্ষমতার বিন্যাস নিয়ে যতই মুখরোচক আলোচনা চলুক না কেন, সাধারণ খেটে খাওয়া নাগরিকের কাছে মূল মাথাব্যথার বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কাজের তাগিদে রাজপথে নামা মানুষের মুখে এখন একটাই হাহাকার—বাংলাদেশের গ্যাস আসলে গেল কোথায়? রান্নার চুলা না জ্বলা, সকালে না খেয়ে কাজে বের হওয়া কিংবা গৃহস্থালি চালাতে গিয়ে বাড়তি খরচে ইলেকট্রিক চুলা ও এলপিজি সিলিন্ডার কেনার কসরত সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। অন্যদিকে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে যানবাহনের মাইলের পর মাইল দীর্ঘ লাইন, শিল্পকারখানায় উৎপাদনে হঠাৎ ভাটা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানির জোগান না থাকা প্রমাণ করে যে সংকট এখন কতটা প্রকাণ্ড রূপ ধারণ করেছে।

মহেশখালীর সাগরে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান ভাসমান এলএনজি রূপান্তর টার্মিনালে (এফএসআরইউ) আকস্মিক যান্ত্রিক বিভ্রাটের কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়েই দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের তীব্র চাহিদা থাকে। অথচ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সরবরাহ একলাফে ২ হাজার ২৬৫ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। প্রতিদিন ১৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও বেশি এই বিশাল ঘাটতি কেবল যে রান্নাঘরের গৃহিণীদের কষ্টে ফেলছে তা নয়, বরং দেশের সার্বিক অর্থনীতি ও উৎপাদনব্যবস্থাকে মারাত্মক এক ঝাঁকুনি দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, স্রেফ একটি অবকাঠামোর কারিগরি ভুলের কারণে গোটা দেশের জ্বালানি খাত কীভাবে এত সহজে থমকে যেতে পারে।

সংকটের অন্তর্নিহিত কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, এটি একদিনের কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। এটি মূলত আমাদের দীর্ঘদিনের অপকৌশল, দেশীয় সম্পদের অনুসন্ধানে অবহেলা এবং আমদানিভিত্তিক নীতির এক বিপজ্জনক মাশুল। বছরের পর বছর ধরে দেশে নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের গতি যেমন ধীর ছিল, তেমনি পুরনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর প্রাকৃতিক সঞ্চয় কমে আসায় দেশীয় উত্তোলনও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়িয়ে টেকসই মজুত গড়ে তোলার বদলে তড়িঘড়ি করে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির ওপর সমস্ত বাজি ধরা হয়েছিল। কোনো শক্ত বিকল্প অবকাঠামো বা বিশাল মজুত ব্যবস্থা না বানিয়ে কেবল ভাসমান টার্মিনালের ওপর এই অতি-নির্ভরশীলতাই আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে চূড়ান্ত ভঙ্গুর করে তুলেছে।

গ্যাসের এই রক্তশূন্যতার সবচেয়ে নির্মম আঘাত পড়ছে দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাত, টেক্সটাইল, সিরামিক, মেটাল ও ভারী শিল্পকারখানাগুলোর ওপর। প্রয়োজনীয় চাপ না পাওয়ায় কারখানার বয়লার ও যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। এতে উৎপাদন যেমন থমকে যাচ্ছে, তেমনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্থবিরতা চলতে থাকলে দেশের রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বড় বিপর্যয় ঘটবে, যা লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।

একই সাথে দেশের বিদ্যুৎ খাতও এই জ্বালানি সংকটের মাশুল গুনছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস না পৌঁছানোয় বাধ্য হয়ে তুলনামূলক অনেক বেশি খরচে ডিজেল বা ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এই বিকল্প প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ তৈরির খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক ভর্তুকির চাপ তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদে এই বাড়তি খরচের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধেই চাপবে, যা বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সেবামূল্য আরও বাড়িয়ে দেওয়ার শঙ্কা তৈরি করে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ববাজার থেকে আমদানীকৃত এলএনজির ওপর নির্ভর করে এই ধরনের স্থায়ী জাতীয় সংকট কাটিয়ে ওঠা কখনোই সম্ভব নয়। এর একমাত্র সমাধান হলো বঙ্গোপসাগর ও স্থলভাগে দ্রুত দেশীয় নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান জোরদার করা এবং নতুন কূপ খনন করা। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির ব্যাকআপ হিসেবে স্থলভাগে স্থায়ী টার্মিনাল ও বিশাল মজুতাগার গড়ে তুলতে হবে, যেন একটি ব্যবস্থা নষ্ট হলেও বিকল্প পথ চালু থাকে। এছাড়া শিল্পে জ্বালানির সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিশ্বজুড়ে সাড়া জাগানো সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। কাঠামোগত এই পরিবর্তনগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিতেও বারবার থমকে যাবে পুরো বাংলাদেশ।

 

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category