হামজা। এতদিন বাংলাদেশিদের কাছে যে নামটি পরিচিত ছিল উদ্ধারকারী জলযান হিসেবে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ-বিআইডব্লিউটিএর চারটি উদ্ধারকারী জলযানের একটি হচ্ছে— হামজা। যে গভীর খাদ থেকে টেনে তুলত লঞ্চ, স্টিমার কিংবা বাল্কহেডকে। সেই হামজার নতুন ভার্সন— হামজা দেওয়ান চৌধুরী। যার কাঁধে এখন ডুবতে থাকা মৃতপ্রায় বাংলাদেশের ফুটবলকে টেনে তোলার দায়িত্ব।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। আওয়ামী সরকারের পতনের পর দ্বিতীয়বারের মতো দেশ স্বাধীন হয়েছে। সেই সঙ্গে সালাউদ্দিনযুগের অবসান ঘটিয়ে ‘৯০ দশকের ফুটবলের মহাজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। এ মুহূর্তে বাংলার মেসিখ্যাত হামজা দেওয়ান চৌধুরীকে পেয়ে ফুটবলজ্বরে আক্রান্ত সারা দেশ। সালাউদ্দিনের একনায়কতন্ত্রের দ্বাম্ভিক ক্ষমতার দাপটের অবসান ঘটিয়ে নতুন এক আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে বাংলাদেশের ফুটবল। আর সেটি আজ নতুনরূপে ভারত মিশন দিয়েই শুরু হচ্ছে।
৩৬ জুলাইয়ের পর আমরা ফুটবলে আলোর সন্ধান দেখতে পেয়েছি। আমরা ফুটবল স্বৈরাচার সালাউদ্দিনের পতনের পর মৃত ফুটবলকে বাঁচাতে ফুটবল নিবেদিত অন্তপ্রাণ বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়ালকে আলোর দিশারি হিসাবে পেয়েছি। এ মুহূর্তে ফুটবলের জোয়ারে ভাসছে দেশ। আমরা বাংলার ফুটবলের রাজাকে পেয়েছি। যে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি না হলেও বংশরক্তে পরম্পরায় বাংলাদেশি। তিনিই আমাদের ফুটবলে জিয়নকাঠি। মৃত ফুটবলকে বাঁচাতে রক্তের বন্ধনে মাটির টানে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ছুটে এসেছেন বাংলাদেশে।
আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মিশন শুরু এশিয়ান বাছাইয়ে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। আজ থেকেই আমাদের ফুটবল বিপ্লবের শুরু। আজকের এই ফুটবলের লড়াই শুধু ভারতের বিপক্ষেই নয়। সেটি হোক— এশিয়া মহাদেশ তথা বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে তোলার সংগ্রামে ভারত ম্যাচ দিয়ে যাত্রা শুরুর অঙ্গীকার। এ যাত্রাই হোক এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব লড়াইয়ের যাত্রা; ফুটবল বিশ্বকাপমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানোর লড়াইয়ের যাত্রা। ভিশন হোক আমাদের— ২০৩০ ওয়ার্ল্ডকাপে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো ১৬ কোটি বাঙালির অঙ্গীকার। আমরা হামজা দেওয়ানকে নিয়েই আজ ভারতবধ মিশনে মাঠে নামছি।
তবে আমাদের কিন্তু… রয়ে গেছে। ভুলে গেলে চলবে না, আমরা বাঙালি জাতি। আমরা আবেগে ভেসে যাই। বাস্তবতাকে ভুলে যাই। এটুকু আমাদের ভাবতে হবে। আবেগের বাঙালি হামজাকে পেয়েই সবকিছু ভুলতে বসেছি— ফুটবলপ্রেমী শুরু করে বাফুফের সভাপতি থেকে পরিচালক-কর্মকর্তা সবাই।
আমাদের সবার ধারণা— এক হামজাতেই আমরা বিশ্ব জয় করে ফেলব, এমন ধারণা পোষণ করে বসে আছি। এটি অলৌকিক স্বপ্ন। রাতারাতি সবকিছু বদলে দেওয়া যায় না কিংবা বদলানো সম্ভব নয়; তবে হ্যাঁ— আমরা খালি হাতে যুদ্ধের ময়দানে নামছি না; এবার কঠিন অস্ত্র নিয়েই মাঠে নামছি। এ মুহূর্তে হামজাই হচ্ছে আমাদের বড় অস্ত্র— যাকে বলে ‘একে ফোরটিসেভেন’।
তবে এখানে বারবার কিন্তু… কাজ করছে। আবেগী নয়, বাস্তবতার নিরিখে আসতে হবে। আপনি ভুলে গেলে চলবে না— ফুটবল ১১ জনের খেলা। ম্যাচ জিততে ১১ জনকেই খেলতে হয় এবং খেলতে হবে। একা কখনো ম্যাচ জেতা যায় না। আর তাই যদি হতো, তাহলে আমাদের বিশ্বসেরা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানই একা বিশ্বকাপ এনে দিতে পারতেন। কিন্তু তা সম্ভব নয়। আমাদের সবসময় ‘কিন্তু’ মাথায় রাখা উচিত।
তাই আবেগ নয়, বাস্তবতা দিয়েই ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবুন। ফুটবল স্বৈরাচার সালাউদ্দিনমড়কে মৃত ফুটবলে হামজা দেওয়ান আমাদের ১৬ কোটি মানুষের আশীর্বাদ—এটি শতভাগ সত্যি। কিন্তু …
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমরা ফুটবল উন্নয়নের পথে একজন সুপারস্টার পেয়েছি। ৩৬ জুলাইয়ের দ্বিতীয় স্বাধীন দেশে ফুটবলের উজ্জ্বল প্রতীক হামজা দেওয়ান চৌধুরী। তাই আজ ভারত মহারণে ফলাফল যাই হোক, তাতে দমিয়ে না গিয়ে সারাবিশ্বে হাজারো হামজা দেওয়ান ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তাদের খুঁজে বের করে দ্রুতই জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করে ২০২৫ সালেই এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ি। যদি এ উদ্যোগ বাফুফে গ্রহণ না করে, তবে কোনো দিনই আমরা ফুটবলের সাফল্য দেখতে পাব না।
এবার এই ‘যদি…’
এই যদি পূরণ না করলে আপনি কখনোই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন না। ডেনমার্ক প্রবাসী জামাল ভূঁইয়া, তারিক কাজীর সঙ্গে হামজা দেওয়ান যোগ দেওয়ায় আমাদের জাতীয় দল আরও শক্তিশালী হয়েছে। ইতালি প্রবাসী ফাহামিদুলকে পাওয়ায় মনে হয়েছিল দল আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু কোন অদৃশ্য কারণে তাকে বাদ দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। এটি বাংলাদেশ ফুটবলে একটি বড় অশনিসংকেত। প্রবাসী ফুটবলারদের দেশের হয়ে খেলতে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার একটি পূর্বলক্ষণ। এটি বাংলাদেশ ফুটবলে ‘বাজে উদাহরণ’ সৃষ্টি করবে বলে আমার ধারণা।
কিন্তু ফাহামিদুলকে দূরে সরিয়ে দিয়ে সফলতা অর্জন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতই বলে মনে করা হচ্ছে। তাই বাফুফেকে আরও সংস্কার করতে হবে। এখনো বাফুফে ভবনে আওয়ামী ষড়যন্ত্রের বীজ রয়েছে, তা রুখতে না পারলে ভবিষ্যতে ভালো কোনো অর্জন করা সম্ভব নয়। শুধু বক্তব্য দিয়েই ফুটবল চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, যা বাঙালি জাতি বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলে দেখে এসেছে।
ইতালি প্রবাসী ফুটবলার ফাহামিদুল প্রসঙ্গে কোচ হাভিয়ের কাবরেরা সাংবাদিকদের বলেছেন— ‘সে খুবই প্রতিভাবান ফুটবলার। আসলে সে এখনো তরুণ, বাকিদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার আরও সময় লাগবে।’ এটি মূলত কোচ হাভিয়ের কাবরেরার হাস্যকর বক্তব্য ছাড়া আর কিছুই নয়। ১৮ বছর বয়সের ফাহামিদুল তরুণ এটা ঠিক। ২৭ বছরের হামজা দেওয়ানকে পাওয়া কোচ হয়তো ভুলে গেছেন ওটা পড়ন্ত বিকালে পাওয়া রত্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ গোধূলিলগ্নে হামজাকে দিয়ে আমরা বেশি দূর এগিয়ে যেতে পারব না। এ জন্য আমাদের প্রয়োজন ১৮ বছরের ফাহামিদুলকেই। উচ্চশিখরে পৌঁছাতে ২৭ বছর বয়সের হামজা নয়; ১৫ থেকে ২৫-এর তরুণ খেলোয়াড়রাই আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। এরা ফুটবলের জাগরণ তুলতে বদ্ধপরিকর। যদি বাফুফের ভালো কোনো চিন্তাধারা থাকে, তবে এখনই বোর্ডের সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলতে হবে; প্রবাসীদের দ্রুতই ডেরায় ভেড়াতে হবে। তবেই সম্ভব ফুটবলকে সঠিক পথে নিয়ে যাওয়া।
আর বাংলাদেশের কোচ হয়তো খেলা দেখেন না। যদি খেলা দেখতেন, তাহলে দেখতে পেতেন মাত্র ১৫ বছর ৯ মাস ১৬ দিন বয়সে বার্সেলোনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় ছিলেন স্পেনের লামিনে ইয়ামাল। তিনিই বর্তমানে বিশ্বের সেরা পাঁচজনের মধ্যে একজন।
তাই মান্ধাতা আমলের নিয়ম বদলে ফেলে ডিজিটাল চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করা উচিত। এবং ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে নিতে দূরপ্রবাসে ভেসে বেড়ানো ১৫-২৫ বছর বয়সি তরুণ ফুটবলারদের দ্রুত দেশে এনে জাতীয় দলকে শক্তিশালী করে এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এবং বিশ্ব ফুটবলমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
তাই স্বৈরাচারকাণ্ডারি ২০২২ বিশ্বকাপে খেলার অলীক স্বপ্ন দেখানো আর ফাঁকা বুলি ছড়ানো বাফুফের সাবেক সভাপতি সালাউদ্দিনের মতো বাঙালি জাতিকে মিথ্যাচার এবং বছরের পর বছর ফুটবলকে হিমাগারে রেখে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের গল্পের ঝাঁপি খুলে দাপিয়ে বেড়ালেই ফুটবল কোনো দিনেই আলোর মুখ দেখবে না।
ঠিক তাই— আলোর মুখ দেখতে হলে হামজা দেওয়ান চৌধুরীর মতো প্রবাসী ইতালির ফাহামিদুল, পোল্যান্ডের ফরিদ আলী, যুক্তরাষ্ট্রের জিদান মিয়া ও জায়ান আহমেদ, অস্ট্রেলিয়ার রিদওয়ান হান্নান, কানাডার সামিত বোস ও রাহবার খান, আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়ার দুই ভাই কুইন সুলিভান ও কাভান সুলিভান, সুইডেনের নাসিফ মারজুকের মতো খেলোয়াড় আনতে হবে। এ রকম অসংখ্য প্রবাসী ফুটবলার রয়েছে, যাদের এনে আমাদের ফুটবলকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
শুধু এখানেই শেষ নয়; এর বাইরেও আমাদের ফুটবলকে এগিয়ে নিতে তৃণমূলে প্রতিযোগিতা আনতে হবে। দেশব্যাপী তৃণমূলে অনূর্ধ্ব ১২ ও ১৪ বাছাই করে সিলেট ফুটবল একাডেমিকে কার্যকর রূপ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ফুটবলকে এগিয়ে নিতে হবে। সারা দেশ ফুটবলে জাগরণ তুলতে হবে এবং তা এখনই।
তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক— আমরা একজন হামজাকে পেয়েছি। দলে ভিড়িয়ে শক্তি বৃদ্ধি করেছি। এ জন্য বাংলাদেশ দলকে শুভকামনা জানাচ্ছি। আজকের ভারত মিশনেই আমরা বুঝতে পারব— আমরা কতটা পিছিয়ে আছি কিংবা কতটা এগিয়েছি। যদিও বাফুফের কর্মকর্তা ও ফুটবলপ্রেমীরা মনে করছেন—এক হামজাকে পেয়ে আকাশছোঁয়া স্বপ্নের বাস্তবায়নে শুধু সময়ের অপেক্ষা; আদতে কাজটা মোটেও সহজ নয়; সফলতা একজনে নয়, এগারোজনে।
আর তাই বাফুফের সিন্ডিকেট আগে নির্মূল করতে হবে। তা না হলে যতই আন্তরিকতা থাক না কেন, আর প্রবাসী খেলোয়াড়কে নিয়ে আসুন না কেন? দোসরদের সিন্ডিকেট একটা না একটা খুঁত-ভূত খুঁজে বের করে ষড়যন্ত্রের জোট বাঁধিয়ে দেবে। যেমনটি ফাহামিদুলকে ফেরত পাঠিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
তারপরও আমরা আশাবাদী— সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে দ্রুতই আমরা প্রবাসী ফুটবলারদের দলে ভিড়িয়ে বাংলাদেশ দলকে আরও শক্তিশালী করে বিশ্ব ফুটবলমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াব। আমরা শুধু এশিয়া নয়; ২০৩০ বিশ্বকাপ ফুটবলেও বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে সক্ষম হব। আর এর জন্য সদিচ্ছাই যথেষ্ট বলে মনে করেন ফুটবলপ্রেমী মানুষ।
আমরা আশাবাদী, আমরা এখনো স্বপ্ন দেখি— আগামী ২০৩০ সালেই ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা উঁচু করে তুলে ধরব—এটিই আমাদের ১৬ কোটি বাঙালির স্বপ্ন।