• বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৮ অপরাহ্ন
Headline
লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানি চেঞ্জারদের বৈদেশিক মুদ্রা জমায় নতুন সুবিধা রফতানি ও রেমিট্যান্সে ইতিবাচক ধারা, রিজার্ভ ৩৬.২৫ বিলিয়ন ডলার সিটি গ্রুপকে ৩ হাজার কোটি টাকার ঋণ দিতে আইন শিথিল করল বাংলাদেশ ব্যাংক সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণে যাচ্ছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিবসহ ৩৫ সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে চীনা মন্ত্রীর সাক্ষাৎ, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারের আহ্বান ঋণ সহায়তার বাইরে কোরিয়ার সঙ্গে শক্তিশালী অংশীদারিত্ব চায় বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সৌরবিদ্যুৎ পরিকল্পনা ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিল্পপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে : মাহদী আমিন আর্টিলারি রেজিমেন্টের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীতে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করতে চীনের অঙ্গীকার: লিউ মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে কাজ করবে সংসদীয় ককাস

বাণিজ্যিক কার্যক্রমে স্থবিরতা: চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও আমদানিতে বড় ধস

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতিতে এক গভীর স্থবিরতা ও মন্থরতার চিত্র ফুটে উঠতে শুরু করেছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও কাস্টমস হাউসের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ প্রায় সাত শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অধীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন হওয়া আমদানি পণ্যের পরিমাণও আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও শিল্প উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক চরম নেতিবাচক পরিস্থিতির ইঙ্গিত বহন করছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বা চবকের দেওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই বন্দরের মাসভিত্তিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের হার ধারাবাহিক পতনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অর্থবছরের প্রথম মাস অর্থাৎ জুলাইয়ে বন্দর দিয়ে দুই লাখ আটান্ন হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও পরবর্তী আগস্ট মাসে তা কমে দুই লাখ পঁচাশি হাজারে এবং সেপ্টেম্বরে আরও হ্রাস পেয়ে দুই লাখ ঊনআংশ হাজার টিইইউতে এসে ঠেকেছে। শুধু মাসভিত্তিক তুলনাই নয়, বরং আগের অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় যে চলতি অর্থবছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিচে নেমে গেছে।

আমদানির এই নিম্নগামী চিত্র অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের মাসিক পরিসংখ্যানগুলোতেও। চলতি বছরের অক্টোবর মাসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত এবং শুল্কায়ন হওয়া পণ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় পঁচাত্তর লক্ষ টন, যার আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় একচল্লিশ কোটি টাকার কাছাকাছি। অথচ এর আগের বছর অর্থাৎ বিগত বছরের একই মাসে শুল্কায়ন হওয়া পণ্যের পরিমাণ ছিল এক কোটি টন এবং এর আর্থিক মূল্য ছিল আরও অনেক বেশি। এই হিসাব অনুযায়ী এক বছরের ব্যবধানে কাস্টমসে শুল্কায়িত আমদানি পণ্যের পরিমাণ শতকরা হিসেবে প্রায় সতেরো শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে।

বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদ এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিপির সম্মাননীয় ফেলো ড ফাহমিদা খাতুন এই সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অত্যন্ত উদ্বেগের কথা প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে দেশ বর্তমানে একপ্রকার সুপ্ত অর্থনৈতিক মন্দা বা স্থবিরতার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে। একদিকে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। এর ফলে বাজারে সাধারণ পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিল্প কারখানার কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও আশঙ্কাজনকহারে হ্রাস পেয়েছে, যা নতুন বিনিয়োগের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিচ্ছে।

শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে বর্তমান সময়ে দেশে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ার পেছনে একাধিক গুরুতর কারণ কাজ করছে। একদিকে বিশ্ববাজারে সরবরাহ ব্যবস্থার নানা জটিলতা এবং অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের তীব্র সংকট উদ্যোক্তাদের নতুন কারখানা স্থাপন কিংবা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন অবকাঠামো তৈরি করেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংযোগ বা গ্যাস না পাওয়ার কারণে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করতে পারছেন না, যা দেশের সামগ্রিক শিল্পায়ন প্রক্রিয়াকে বড় ধরনের বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

বেসরকারি খাতের এই চরম স্থবিরতার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানেও। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার বিগত সময়ের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন অবস্থানে গিয়ে ঠেকেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অলস তরল অর্থ নিয়ে বসে থাকলেও উদ্যোক্তারা নতুন কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে সাহস পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও যোগ্য ও আগ্রহী ঋণগ্রহীতার অভাবে সেই সমস্ত প্যাকেজের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

আমদানিকৃত পণ্যের এই ধারাবাহিক পতন কেবল উৎপাদনের ওপরই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক ভোগ্যপণ্যের বাজারেও গভীর প্রভাব ফেলছে। মেঘনা গ্রুপের প্রধান নির্বাহীসহ শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতিরা গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন কেনাকাটা বা ভোগ প্রায় ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আগে একজন সাধারণ ভোক্তা বাজারে গিয়ে যে পরিমাণ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করতেন, বর্তমান চড়া দামের বাজারে তা কমিয়ে অর্ধেক বা তার কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন।

দেশের ইস্পাত খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিএসআরএমের প্রধান নির্বাহী আমীর আলীহুসাইন উল্লেখ করেছেন যে অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ খাতের শ্লথগতির কারণে রডের মতো মৌলিক নির্মাণসামগ্রীর চাহিদা বাজারে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের আকাশচুম্বী দামের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানই কেবল টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান এই অস্থির ও সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে অর্থনীতিকে উদ্ধার করতে হলে অবিলম্বে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ঘটানো এবং সুনির্দিষ্ট পূর্বাভাসভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক খাতের শীর্ষ নির্বাহীরাও দেশের এই অর্থনৈতিক শ্লথগতি নিয়ে নিয়মিতভাবে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা উন্নতির চেষ্টা করছেন।

প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মো আমিরুল হক বলেছেন যে দেশের সিমেন্ট শিল্পসহ সকল ভারী শিল্প খাত বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।

বন্দর ও কাস্টমসের এই আমদানীকৃত পণ্যের মন্দা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হলে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও কাঁচামাল সরবরাহের ঝুঁকি এড়াতে দেশের অভ্যন্তরে কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বন্দর ও কাস্টমসের আমদানি হ্রাসের এই প্রবণতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুতর অশনিসংকেত। সময়মতো কার্যকর নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে এই মন্দা দীর্ঘস্থায়ী রূপ ধারণ করতে পারে।

ভবিষ্যতে মুদ্রার বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষিত রাখতে নীতিনির্ধারক মহলকে এখনই সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।

সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যবসায়িক সংগঠনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল এই গভীর আস্থার সংকট কাটিয়ে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন গতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।

ব্যবসায়িক কার্যক্রমের এই শ্লথগতি অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থান খাতে এক মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

শিল্প কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে এবং বন্দরের কার্যক্রমে গতি ফিরিয়ে আনতে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত বিশেষ প্রণোদনা ও নীতিসহায়তা ঘোষণা করা প্রয়োজন।

দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক খাতের এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট উত্তরণে সকলের সুসমন্বিত প্রচেষ্টা দেশের অর্থনীতিকে পুনরায় সমৃদ্ধির পথে চালিত করতে পারে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category