বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন দলটির দীর্ঘদিনের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জাতীয় সংসদে দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় আগামী ২০ আগস্ট তাঁর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে শপথ নেওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার। তবে বঙ্গভবনে প্রবেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে একসাথে শূন্য হতে যাচ্ছে তাঁর মহাসচিবের দায়িত্ব, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য পদ। এ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদের মধ্যে এখন দেশজুড়ে এবং স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ভবিষ্যৎ উপনির্বাচন নিয়ে।
চলতি বছরের জাতীয় নির্বাচনের সময়েই মির্জা ফখরুল প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এটিই হতে যাচ্ছে তাঁর জীবনের শেষ নির্বাচন। একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার এমন বিদায়ী ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবেই এলাকায় রাজনৈতিক উত্তরসূরি নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের মুখে মুখে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তখন থেকেই একটি কথা জোরালোভাবে ভাসছে—‘বাবা যাবেন বঙ্গভবনে, মেয়ে আসবেন সংসদে’। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন মির্জা ফখরুলের বড় মেয়ে, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসা বিজ্ঞানী ড. সামারু মির্জা।
৪৪ বছর বয়সী ড. সামারু মির্জা পেশাদার কোনো রাজনীতিবিদ নন; তিনি একজন গবেষক ও মানবাধিকার কর্মী। অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী ক্যানবেরার ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনকারী এই বিজ্ঞানী ২০০৬ সাল থেকে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। দেশের দুই বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম ও তারামন বিবির স্মৃতিতে ২০১৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘সিতারাস স্টোরি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্ম, যার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘অস্ট্রেলিয়ান অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। সরাসরি বিএনপির কোনো পদে না থাকলেও বিদেশের মাটিতে বসে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো নিয়ে তিনি সব সময় সরব ছিলেন। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনে নিজ এলাকা রুহিয়াতে বাবার পক্ষে ভোট চেয়ে সাধারণ মানুষের নজর কাড়েন তিনি।
মির্জা পরিবারের রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ঐতিহ্য। সামারুর দাদা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন সাবেক মন্ত্রী ও এমপি, এবং অপর দাদা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন জাতীয় সংসদের স্পিকার। এদিকে সামারু মির্জার পাশাপাশি এই আসনে আরেকজন হেভিওয়েট বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সাল আমিন। মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা এবং সাবেক মেয়র হিসেবে এলাকায় তাঁরও রয়েছে নিজস্ব শক্তিশালী প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা।
আইন অনুযায়ী ২০ আগস্ট মির্জা ফখরুল শপথ নেওয়ার পর আসনটি আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষণা করা হবে এবং পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদিও দল কিংবা পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামারু মির্জার অতীত রাজনৈতিক ও অধিকারভিত্তিক তৎপরতার নানা পোস্ট স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তৃণমূলের ত্যাগী নেতাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা বনাম একজন উচ্চশিক্ষিত ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত নারীর আগমন—সব মিলিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনী টিকিট কার হাতে যাচ্ছে, তা এখন জাতীয় রাজনীতির এক চমকপ্রদ অধ্যায় হয়ে উঠেছে।