-রিন্টু আনোয়ার
বিচারের আগে বিচার করে ফেলার একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি বাংলাদেশে রয়েছে। সেই বিচারে দোষী সাব্যস্ত করার ঘটনাই বেশি। সেটি পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনী নিয়মিতই করছে। মাঝেমধ্যে গণমাধ্যমও কম যায় না। কখনো কখনো কোনো কোনো আসামি বা মহলকে বর্ণনাসহ এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে বিচারের আগেই তারা জনমনে দোষী বলে চিহ্নিত হয়ে যান। অনেকের ক্ষেত্রে নানারকম আপত্তিকর বিশেষণও ব্যবহার হয়। এরকম কর্মকাণ্ড বন্ধ করার বিষয়ে ২০১২ সাথে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে বাংলাদেশের হাইকোর্ট। তারপরেও সেটি বন্ধ হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মব বা মিডিয়া ট্রায়াল একতরফা ঘায়েলের মতো। বিষয়টি আবার বেশ আপেক্ষিক। যার যেমন অনুভূতি। মিডিয়া ট্রায়ালে আক্রান্ত দল ব্যথায় ভোগে। উপকৃতদের কাছে এটি বেশ স্বস্তির। উচিৎ বিচারও মনে করেন তারা।
গত কিছুদিন ধরে এক ধরনের মিডিয়া ট্রায়ালে ভূগছে দেশের বৃহৎ দল বিএনপি। এ ব্যথার প্রকাশ ঘটিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এক-এগারোর মতো বিএনপিকে আবারও মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বলেছেন, নির্বাচনে জেতার জন্য বিএনপির যত বেশি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, তত বেশি বিএনপিকে মিডিয়া ট্রায়ালের মুখোমুখি করা হচ্ছে। অভিযোগ হিসেবে গুরুতর। আবার এটিই বাস্তবতা। তিনি বলেন, আগামীতে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে যেখানে দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিএনপিকে সমর্থন করছেন ততবেশি মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হচ্ছে। সোমবার সকালেও বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকায় কিছু ঘটনা দেখলাম। দেখার পরে কেন্দ্রীয় অফিসে (নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়) যখন খবর নিলাম- তারা আমাকে জানালো, ঘটনা ঘটেছে একরকম পত্রিকায় উপস্থাপন করা হয়েছে আরেক রকমভাবে। এ ট্রায়ালের ফের উল্লেখও বাদ দেননি তিনি। তার ভাষায় ১/১১-এর সময় যেভাবে বিএনপিকে মিডিয়া ট্রায়ালের সম্মুখীন করা হয়েছিল সেভাবেই তারা তাদের মদদপুষ্ট মিডিয়া দ্বারা ঠিক একইভাবে এরকম একটি প্রেক্ষাপট তৈরির চেষ্টা করছে।
‘তারা’ বলতে ‘বিএনপি বিরোধী শক্তি’। রাজনৈতিকভাবে ’বিএনপি বিরোধী’ আর আসন্ন নির্বাচন প্রশ্নে ‘বিএনপি বিরোধী’ এক নয়। ৫ আগস্ট বিবেচনায় তারা সমশক্তি। নির্বাচন সামনে রেখে এ শক্তিগুলোর মধ্যে এখন বেশ বিভাজন। আর বিএনপিকে যে কোনোভাবে ঘায়েল করার কাজে এখনো ক্রিয়াশীল আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র-সহযোগী-বেনিফিসিয়ারি শক্তি। তাদের প্রধান অবলম্বনই মিডিয়া। আর মিডিয়াতে এখনও শক্তিমান বিএনপিবিরোধী মহল। তাদের বাঘা বাঘা কিছু ব্যক্তি পালিয়েছেন বা গা ঢাকা দিয়েছেন। হাতে গোনা জনা কয়েক পাকড়াও হয়েছেন। বাকিরা দম নিয়ে টিকে আছেন নানান ছল-বাহানা-চাতুরিতে। মাঝেমধ্যে সুযোগ মতো সুক্ষ ট্রায়ালের কাজটি করে নিচ্ছে।
তথ্য প্রযুক্তির বিকাশ ও ইন্টারনেটের প্রসার মিডিয়া ট্রায়াল প্রবণতাকে আরও প্রবল করেছে। সাথে যুক্ত হয়েছে ডিসইনফরমেশন, ডিপফেকসহ নানা অনুষঙ্গ। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মানুষ সবসময় প্রতিশোধ নিতে চায়। শত্রুকে যেকোনো মূল্যে পরাজিত ও নিশ্চিহ্ন করতে চায়। যে কারণে হাতের কাছে মানুষ যা পায় তাই ব্যবহার করে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমও ব্যবহৃত হয়েছে আদি কাল থেকেই। সাধারণত খুব চাঞ্চল্যকর কোনো ঘটনা বা কোনো বিখ্যাত-কুখ্যাত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট ঘটনায় মিডিয়া ট্রায়াল হয়ে থাকে। গণমাধ্যম পরিসরে এই শব্দযুগলের ব্যবহার শুরু হয় ষাটের দশকে। তখন টেলিভিশন ছিল খুবই শক্তিশালী মাধ্যম। সাংবাদিকরাও সমাজে সম্মানিত ও প্রভাবশালী ছিলেন। একজন সাংবাদিকের প্রতিবেদন ও উপস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে জনমত গঠিত হতো।
মিডিয়া ট্রায়াল হলো সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের কাভারেজের ফল। যার মাধ্যমে কোনো বিচারিক আদালতের রায়ের আগেই একজন ব্যক্তিকে সম্ভব্য দোষী আখ্যায়িত করে তার সুনাম ক্ষুণ্ন করা হয়। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জীবনযাপন করা অনেক কঠিন হয়ে যায়। এই ধরনের বিচার উচ্ছৃঙ্খল মানসিকতাকে উৎসাহিত করে। এমনই প্রেক্ষাপটে ১৯৬৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট ইনস্যুরেন্স ব্যবসায়ী এমিল সাভুনড্রার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। এই অনুষ্ঠানে তার সাথে ফ্রস্ট্রের বেশ বাদানুবাদ হয়। পরে আইটিভি’র নির্বাহী প্রশ্ন তুলেছিলেন এই অনুষ্ঠানের কারণে এমিল সাভুনড্রার বিচার প্রভাবিত হতে পারে। ওই সময় অনিয়ম ও তহবিল তছরুপে অভিযোগে আদালতে এমিল সাভুনড্রার বিচার চলছিল। এরপর দেখা গেছে খুবই সংবেদনশীল মামলার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম একটি বিশেষ রায়ের পক্ষে এক ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করে। যাতে বাধাগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচার।
গণমাধ্যম নীতির ন্যূনতম মানদণ্ড হলো বিচারের আগে , দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে কোনো নেতিবাচক অভিধায় অভিযুক্ত না করা। কিন্তু, গণমাধ্যমে ট্রায়ালের কাজটি হয় কিছু শব্দ-বাক্যে স্টোরির মাধ্যমে। একে অভিযুক্ত বা দোষারোপ বলার অবস্থা থাকে না। গণমাধ্যম ব্যাপি, দল বা মহলকে নিয়ে এমনভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করে যাকে দোষারোপ বলার সুযোগ থাকে না। ঠিক ট্রায়ালও বলা যায় না। কিন্তু, বাস্তবে ট্রায়ালের চেয়েও বেশি। দেশে এখন যার একটি পরম্পরা চলছে। নেতিবাচক থেকে রক্ষা পেতে প্রথমেই প্রয়োজন মিডিয়া ট্রায়াল ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সীমারেখা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা। বিচারিক প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা, স্বতন্ত্র। বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব থাকা উচিত নয়। যদিও সংবাদমাধ্যমের নানাভাবে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকে। আবার সাংবাদিকতা ও বন্তুনিষ্ঠতা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় কিছু গণমাধ্যম বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে গিয়ে একটি তথ্যকে কতটা চাঞ্চল্যকরভাবে উপস্থাপন করা যায় সেদিকে বেশি দৃষ্টি দিচ্ছে। গল্প-উপন্যাস বা অন্যান্য বিনোদনধর্মী লেখার মধ্যে কাল্পনিক কিছু যুক্ত করা যেতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতায় তা চলে না। এটি অ্যাকাডেমিক কথা। বাস্তবটা বড় নির্মম।
আর সেই নির্মমতার শিকার হয়েই মিডিয়া ট্রায়ালের যন্ত্রণার কথা বলেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সম্প্রতি বিএনপির ‘অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট’–দের সম্মানে আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতীতে বিএনপির অবদানের কথা উল্লেখ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বিএনপি যতবারই সরকার পরিচালনা করেছে, ততবারই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি এবং শিল্পে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। দল হিসেবে একমাত্র বিএনপিই ভবিষ্যতে সরকারে গিয়ে কী করবে সে রোডম্যাপ (পথনকশা) দিয়েছে, আর কেউ কি তা দিয়েছে? বিএনপি দুই বছর আগেই সংস্কারের রূপরেখা দিয়েছে। রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতে বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরে তারেক রহমান আরো বলেন, ‘আপনারা (অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট) এগুলো যুক্তিতর্ক দিয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরবেন। মানুষের কাছে এসব নিয়ে যেতে হবে। আপনারা যুক্তিতর্ক দিয়ে তরুণ ভোটারসহ ভোটারদের আগ্রহী করতে বিএনপির ৩১ দফা তুলে ধরবেন এবং বিএনপির পক্ষে জনমত গড়ে তুলবেন। অতীতেও আপনারা করেছেন, সামনেও আপনাদেরই করতে হবে। আপনারাই সুন্দর করে করতে পারবেন।’
অথচ নির্বাচন-সংস্কারসহ আরো কতোক বিষয়ে বিএনপিকে নিয়ে কিছু দলের মাঝে এলার্জি লক্ষ্য করা যায়। পর্বত সমান অপকর্মের অনিবার্য জেরে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বিতাড়নের পর দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি। রাজনীতি ও ভোটের মাঠে অন্যদের অবস্থান বিএনপির ধারেকাছে নয়। সুষ্ঠু ভোট হলে বিএনপি আগামীতে সরকার গঠন করবে। আর তাই, বিএনপিকে দেশবাসীর কাছে ভিলেন প্রমান করা কোনো কোনো দলের জন্য জরুরি। তাদের সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা গণমাধ্যমগুরেঅর একাট্টা হওয়া স্বাভাবিক। তাদের কারো কারো জনগনের সামনে বিএনপিকে আওয়ামী লীগের মতোই একটি খারাপ দল প্রমাণ করতে হচ্ছে। অপপ্রচার- প্রোপাগান্ডার সাথে তিলকে তাল বানিয়ে বিএনপিকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি মিশন তারা নিয়েছে। সেই বিবেচনায় তারেক রহমান যথার্থই কথাটি বলেছেন, এক এগারোর মত বিএনপির বিরুদ্ধে মিডিয়া ট্রায়াল চলছে। আজকের প্রজন্ম যাদের বয়স বিশের কোঠায় তাদের বেশীর ভাগই জানে না, এক এগারোর সরকারের সময়ে বিএনপির বিরুদ্ধে কি না হয়েছিল। কিভাবে নিয়মিত চরিত্র হনন করা হয়েছিল তারেক রহমানের।
সেই সময়ে বিএনপির মধ্যম সারির কিছু নেতাকে টিআই সেলে নিয়ে নির্যাতন করে, দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তাদের লিখিত চোথায় সাক্ষর নিয়ে, সেসব চোথা আবার মিডিয়ায় সরবরাহ করা হতো। বড় বড় পত্রিকায় সেই সব চোথা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে ছাপা হতো। তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে সেই অপপ্রচারের একটিও বিগত সরকার প্রমাণ করতে পারেনি। ট্রাজেডি হচ্ছে, বিএনপি কখনো মিডিয়াকে সেইভাবে গুরুত্ব দেয়নি। কখনো বিএনপির নিজেদের লোককে মিডিয়াতে স্পেস করে দেয়নি। হাসিনা অনুগত সাংবাদিকদেরকেই প্রায়োরিটি দিয়েছে। রাজউকের প্লট দিয়ে, তাদের তদবির, সুপারিশ শুনেছে সব সময়। ভেবেছে, তারা হয়তো, অসম্ভব সময়ে বিএনপির পক্ষে দাঁড়াবে। সেটা পরে হাড়ে হাড়ে টের পেলেও উপলব্ধিতে কতোটুকু এসেছে- এ প্রশ্ন রয়েই গেছে। তারেক রহমান যখন দলটির বিরুদ্ধে আবার মিডিয়া ট্রায়ালের লক্ষণ দেখছেন, এবার একটা বিহিত বা ফয়সালা আসতেও পারে।
সেই প্রত্যাশার সমান্তরালে এ কথাও সত্য, মিডিয়াক্ষেত্রে বিএনপি পুরোপুরি ব্যর্থ বলে একটা সমালোচনা আছে। দলের কেউ কেউ ক্ষোভ ঝাড়তে গিয়ে বলে থাকেন, বিএনপি মিডিয়ার মর্মটা কখনোই বুঝতে পারেনি। রাজনৈতিকক্ষেত্রে মিডিয়া যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এর আন্দাজটা ভালো বুঝে আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী। তা বর্তমানে বিএনপির একটি নিজস্ব মিডিয়া সেল থাকার পরও । মিডিয়াতে বিএনপি বিরোধীরা বিএনপির বিরুদ্ধে যে প্রোপাগাণ্ডা চালাচ্ছে তার কাউন্টার হিসেবে মিডিয়া সেলের কর্মযজ্ঞ দৃশ্যমান নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
rintu108@gmail.com