• মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬, ১২:১৬ পূর্বাহ্ন

বিচারালয়ে মামলার মহাপাহাড়: দিনে গড়ে আসছে সাড়ে তিন হাজার মামলা

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬

গত এক-দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলার সীমাহীন সংখ্যাধিক্য ও বহুল বিস্তার এক চরম সংকটের রূপ নিয়েছে। আইন ও বিচার বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে ‘মামলা জট’, ‘পাহাড়সম বোঝা’ কিংবা ‘মহাজট’—এর মতো নানা বিশেষণে অভিহিত করছেন। পরিস্থিতি এখন এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে যে, প্রচলিত কোনো শব্দ দিয়ে এর গভীরতা প্রকাশ করা কঠিন। উচ্চ ও অধস্তন আদালতে দেওয়ানি, ফৌজদারি বা অন্যান্য মামলার যে লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, তা বিচারপ্রার্থীদের যন্ত্রণাকে বহু গুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০০৭ সালের নভেম্বরে যখন দেশের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে পৃথক করা হয়, তখন দেশের জনসংখ্যা ছিল ১৪ কোটির কিছু বেশি এবং উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে বিচারাধীন মামলা ছিল প্রায় ১৬ লাখ। প্রায় ১৯ বছর পর দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটিতে পৌঁছালেও, মামলার এই বহুল বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি মোটেই। উল্টো দেড় দশকের কিছু বেশি সময় পর মামলার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিনগুণ, অর্থাৎ প্রায় ৪৮ লাখ। পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় বছরে দেশের আদালতগুলোতে প্রতিদিন গড়ে নতুন করে মামলা রুজু বা দায়ের হয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার (৩,৪৪৩)।

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ও অধস্তন আদালতগুলোতে বর্তমানে বিচারাধীন বা অনিষ্পন্ন মামলার মোট সংখ্যা ৪৭ লাখ ৯১ হাজার ৯২১টি। এর মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেই ঝুলে আছে ৩৮ হাজার ৯৭৩টি মামলা, হাইকোর্ট বিভাগে বিচারাধীন ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৫১৬টি এবং দেশের অধস্তন বা নিম্ন আদালতগুলোতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—৪০ লাখ ৭৮ হাজার ৪৩২টি। বিচারাধীন মামলার এই বিশাল স্তূপের কারণ খুঁজতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজেরা মানুষের ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণতা ও জমি-জমা নিয়ে বিরোধকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এছাড়া, অপেক্ষাকৃত লঘু বা ছোটখাটো মামলায় বিকল্প উপায়ে বিরোধ মীমাংসায় (এডিআর) সাধারণ মানুষের অনাগ্রহ, আদালতের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা, সমাজে আইন ভাঙার প্রবণতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা অভিযোগের মামলা দায়েরের কারণেও এই চাপ বাড়ছে। বিপরীতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা বা সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। সেই সাথে বিচারক ও আদালতের অবকাঠামো সংকট, শুনানির ঘন ঘন মুলতবি এবং আদালত অঙ্গনে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকারকে মারাত্মকভাবে খর্ব করছে।

জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতে, পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াটি এখন একটি এলোমেলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে গেছে, যেখান থেকে মুক্তির কোনো স্পষ্ট পথ দেখা যাচ্ছে না। তাঁরা কেবল চিঠি চালাচালি, সেমিনার বা নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, সরকারকে একটি সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা করার তাগিদ দিচ্ছেন। বিশেষ করে জমিজমা সংক্রান্ত মামলা কমানোর জন্য এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থাকে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কড়া নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন; কারণ আইনের শাসন যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে মামলার পরিমাণ এমনিতেই কমে আসবে। তবে এই সংকট বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা জানতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়কমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি এবং অ্যাটর্নি জেনারেলও এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

আদালতের গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে এই সংকটের এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২০ সালের শুরুতে দেশের আদালতে মোট বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৬ লাখ ১৮ হাজার ৭৪০টি, যেখানে ওই বছর নতুন করে দায়ের হয় আরও ১১ লাখ ১ হাজার ২৭১টি মামলা। সব মিলিয়ে ৫০ লাখের বেশি মামলার মধ্যে সে বছর নিষ্পত্তি হয়েছিল মাত্র ৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৬৩টি। ২০২১ সালে মোট ৫৭ লাখ ২৮ হাজার ১১৪টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ৯ লাখ ১১ Client হাজার ৮৫২টি। ২০২২ সালে মোট ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৭০৬টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল ১৪ লাখ ৭১ হাজার ৪০২টি। ২০২৩ সালে ৬৪ লাখ ৩ হাজার৫৭১টি মামলার মধ্যে ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৭৫০টি নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। ২০২৪ সালে মোট ৬৪ লাখ ৯২ হাজার ৪৩৭টি মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয় ১২ লাখ ১ হাজার ২৪০টি। আর ২০২৫ সালে মোট ৫৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩৩৮টি মামলার বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৬ হাজার ৫০৬টি মামলা।

পুরো ছয় বছরের (২০২০-২০২৫) এই ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে দেশের আদালতগুলোতে নতুন করে বিচারের জন্য এসেছে মোট ৭৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৯টি মামলা। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ১২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০টি এবং প্রতি মাসে ১ লাখ ৩ হাজারেরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছে। বছরের সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটি (গড়ে ১৩০ দিন) বাদ দিলে কার্যদিবসের হিসাবে প্রতিদিন দায়ের হওয়া মামলার সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অথচ প্রতি বছর গড়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ১০ লাখ ৭ হাজার ৮৮৫টি মামলা। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকট থেকে রেহাই পেতে হলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে হবে। যেমন—কোনো মামলা আদালতে আসার পর সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করার বিধান থাকলে মামলার বিস্তার অনেকটাই কমে যেত। অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজদের মতে, নিম্ন আদালতে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার জজের বিপরীতে কমপক্ষে ১০ হাজার বিচারক প্রয়োজন। বিচারকের এই তীব্র ঘাটতি ও অবকাঠামো সংকটের কারণে মামলা ঝুলে থাকায় লাভবান হচ্ছে কেবল সরকারের রাজস্ব খাত, আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীরা; কিন্তু চরম লোকসানের মুখে পড়ছেন সাধারণ বিচারপ্রার্থীরা, যাদের জীবনের বড় অংশই কেটে যাচ্ছে আদালতের বারান্দায়।

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category