• মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন
Headline
মানবপাচারের মহোৎসব ও আমাদের দায় মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপি এলিজার মনোনয়নপত্র জমা সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান পুনর্বহাল সিঙ্গাপুরে তেলের মজুত গড়বে সৌদি আরামকো ক্রসফায়ারের বক্তব্য প্রত্যাহার করে আইজিপির জবাবদিহি নিশ্চিতের দাবি টিআইবির চলতি বছরই ১ লাখ আনসার সদস্যকে বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা: আনসার ডিজি দুই বছরের মধ্যে জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত গেলেন এনএসআই মহাপরিচালক দেশের মানুষ আপনার অপেক্ষায় আছে: হাসিনাকে দুলু রাষ্ট্রায়ত্ত ৩ ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগ দিয়েছে সরকার

বিশেষ পাসপোর্ট পাচ্ছে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গা

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী শ্রমবাজারের নিরাপত্তা রক্ষা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের আইনি সুরক্ষার মধ্যে এক অদ্ভুত ও সূক্ষ্ম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র প্রশাসন। কয়েক দশক ধরে সৌদি আরবে বসবাসরত হাজার হাজার বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের নাগরিক বা রোহিঙ্গাদের আইনি পরিচিতি নিয়ে রিয়াদের কূটনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত সমঝোতায় পৌঁছেছে ঢাকা। সৌদি আরবে দীর্ঘকাল ধরে অবস্থান করা ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার হাতে ধাপে ধাপে তুলে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের পরিচয়মূলক বাংলাদেশি ভ্রমণ নথি বা ‘বিশেষ পাসপোর্ট’। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২৪ হাজার ৩০০ জনের হাতে এই বিশেষ পাসপোর্ট হস্তান্তর সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট আবেদনকারীদের চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পাসপোর্ট সরবরাহের চূড়ান্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ সমন্বয়ে পরিচালিত এই বিশাল কর্মযজ্ঞ আপাতদৃষ্টিতে একটি প্রশাসনিক সমাধান বলে মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের স্থায়িত্ব রক্ষা, অভিবাসন কূটনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নাগরিক সুরক্ষার বহুস্তরীয় জটিল হিসাব-নিকাশ।
এই সংকটের শেকড় মূলত নিহিত রয়েছে নব্বইয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘটিত অসংগঠিত অভিবাসনের ইতিহাসের মধ্যে। তৎকালীন সময়ে পরিচয় শনাক্তকরণের ডিজিটাল ডেটাবেজ বা বায়োমেট্রিক ব্যবস্থার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক নানা অনানুষ্ঠানিক পথ ও অসাধু মাধ্যমের আশ্রয়ে বাংলাদেশের হস্তলিখিত পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন। সেইসব পুরোনো নথিপত্র ব্যবহার করে তারা সৌদি আরবে প্রবেশ করেন এবং জীবিকার তাগিদে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তবে কালের পরিক্রমায় যখন হস্তলিখিত পাসপোর্টের কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে বাতিল হয়ে যায় এবং সৌদি কর্তৃপক্ষ বিদেশি নাগরিকদের জন্য কঠোর ডিজিটাল পরিচয়পত্র ও ইকামা নবায়ন বাধ্যতামূলক করে, তখনই এই বিপুল জনগোষ্ঠী মারাত্মক এক আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। তাদের পাসপোর্টের মেয়াদ বহু আগেই উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ায় তারা কার্যত পরিচয়হীন বা রাষ্ট্রহীন অবস্থায় মরুভূমিতে আটকে পড়েন।
পরবর্তী সময়ে সৌদি সরকারের তরফ থেকে বারবার ঢাকাকে চাপ দেওয়া হতে থাকে এই মানুষগুলোর পাসপোর্ট নবায়ন অথবা নতুন যন্ত্রে পাঠযোগ্য পাসপোর্ট প্রদানের জন্য। বাংলাদেশ প্রথমদিকে এই দাবিকে এড়িয়ে যাওয়ার সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়েছিল, কারণ কোনো অবস্থাতেই ভিনদেশি কোনো জনগোষ্ঠীর নাগরিক দায়ভার আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের কাঁধে নিতে প্রস্তুত ছিল না রাষ্ট্র। তদুপরি, এই ব্যক্তিরা কীভাবে পুরোনো পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছিলেন, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল স্পষ্ট। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার একপর্যায়ে যখন রিয়াদের তরফ থেকে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা আসতে শুরু করে এবং সৌদি আরবে কর্মরত প্রায় ত্রিশ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর ভবিষ্যৎ ও দেশটির বিশাল শ্রমবাজারের ওপর সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কা দেখা দেয়, তখন বাংলাদেশ কৌশলগত নমনীয়তা প্রদর্শনে বাধ্য হয়। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নীতিগতভাবে বিষয়টি ইতিবাচক বিবেচনার পথ তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ গতিশীলতা লাভ করে।
বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল নেতৃত্বের সাথে সৌদি কূটনৈতিক মহলের ধারাবাহিক আলোচনার পর বিষয়টি চূড়ান্ত সমাধানের পথে হাঁটে। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ জাফর বিন আবিয়াহর এক গুরুত্বপূর্ণ সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে সৌদি রাষ্ট্রদূত অত্যন্ত জোরালোভাবে সৌদিতে অবস্থানরত ৬৯ হাজার মায়ানমার নাগরিকের বিশেষ পাসপোর্ট ইস্যু করার বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং পুরো কার্যক্রমটি দ্রুততম সময়ে শেষ করার তাগিদ দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবহিত করেন যে, প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ যাচাই-বাছাইয়ের পর ইতোমধ্যে ২২ হাজারেরও বেশি ব্যক্তির পাসপোর্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। অবশিষ্ট থাকা প্রায় ৪৫ হাজার ব্যক্তির আবেদন দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কারিগরি ও প্রশাসনিক দল সৌদি আরবে পাঠানো হয়, যাতে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে যোগ্য ব্যক্তিদের দ্রুত পাসপোর্ট সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
তবে সাধারণ নাগরিকদের জন্য ইস্যু করা সাধারণ পাসপোর্টের সাথে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রস্তুত করা এই নথির মৌলিক ও কাঠামোগত বিরাট ফারাক রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পাসপোর্টগ্রহীতারা কোনোভাবেই বাংলাদেশের সাংবিধানিক নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত নন। এটি মূলত আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের নির্বিঘ্নে টিকে থাকা ও আইনগত পরিচয় নিশ্চিত করার এক বিশেষ ‘আইডেন্টিটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ বা পরিচিতিপত্র মাত্র। এই বিশেষ পাসপোর্টের ভেতরে সুস্পষ্টভাবে একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত সিরিয়াল নম্বর ব্যবহার করা হচ্ছে, যা সাধারণ পাসপোর্টের ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সবচেয়ে বড় আইনি রক্ষাকবচ হলো, এই পাসপোর্টের জাতীয়তা বা স্ট্যাটাসের অংশে স্পষ্টভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মায়ানমার থেকে বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া নাগরিক। ফলে এই নথি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কোনো বিমানবন্দরে পৌঁছালে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মুহূর্তের মধ্যেই তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হবে।
শুধু নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ না রেখে এর অপব্যবহার রোধে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। আবেদনকারী প্রত্যেক রোহিঙ্গার আঙুলের ছাপ, চোখের মণির আইরিশ স্ক্যান এবং মুখমণ্ডলের ত্রিমাত্রিক ছবি বায়োমেট্রিক ডেটাবেজে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এই সমন্বিত ডেটাবেজ তৈরির প্রধান লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে এই ব্যক্তিদের কেউ যেন কোনো অসদুপায়ে বা দালাল চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি সংগ্রহ করতে না পারেন। এই বিশেষ পাসপোর্ট কেবল সৌদি আরবে তাদের আইনগত বৈধতা দিয়ে কাজের সুযোগ নিশ্চিত করবে। এটি দেখিয়ে তারা সৌদি আরবের নাগরিকত্ব দাবি করতে পারবেন না, আবার এই নথির জোরে বাংলাদেশে ফিরে এসে স্থায়ীভাবে বসবাসেরও কোনো আইনি অধিকার পাবেন না। গত ২৩শে সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বাকি থাকা পাসপোর্টগুলো দ্রুত বিতরণের চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এই প্রক্রিয়ার পেছনে সৌদি আরবের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বড় তাগিদ কাজ করছে। বিশিষ্ট অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বহু বছর আগে অবৈধ বা বৈধ যে পথেই হোক না কেন বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে তারা সৌদিতে পা রেখেছিলেন। এখন সেই মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের কারণে লক্ষাধিক মানুষ যদি পরিচয়হীন হয়ে পড়ে থাকে, তবে দেশটির নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য তা মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা অবৈধ নেটওয়ার্কে যেন এই ব্যক্তিরা জড়িয়ে পড়তে না পারেন, তা নিশ্চিত করতেই সৌদি প্রশাসন কঠোরভাবে তাদের বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ এবং নির্ভরযোগ্য নথিপত্র নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সৌদি আরব হলো বৃহত্তম রেমিট্যান্সের উৎস এবং অদক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের প্রধানতম কর্মসংস্থান ক্ষেত্র। ফলে এই বিশাল কূটনৈতিক স্বার্থের জায়গায় অনড় অবস্থান ধরে রেখে সৌদির সাথে বড় ধরনের কূটনৈতিক বিরোধে জড়ানো ঢাকার জন্য একরকম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতো।
একই সাথে অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের দৃঢ় অভিমত হলো, এই বিশেষ পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার পর এই ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার বাংলাদেশে ফিরে আসার কোনো বাস্তব আশঙ্কা নেই। কারণ এই মানুষগুলো কয়েক দশক ধরে সৌদি সমাজ ও কর্মপরিবেশে নিজেদের স্থায়ীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন এবং তাদের রুটি-রুজির উৎস সেখানে সুপ্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশে তাদের কোনো পূর্বপুরুষের বসতভিটা বা আর্থিক ভিত্তি নেই। তারা কোনোদিনই বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাবেন না, বরং এই বিশেষ পাসপোর্ট তাদের জন্য কেবল দেশটিতে বৈধভাবে বেঁচে থাকা ও কাজ করার আইনি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।
সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে, সৌদি আরবে থাকা রোহিঙ্গাদের বিশেষ পাসপোর্ট প্রদানের এই সিদ্ধান্তটি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক সমঝোতার প্রতিফলন। এক অর্থে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি ঐতিহাসিক দায়মুক্তি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারকে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষিত রাখার একটি সুচিন্তিত কৌশল। বিশেষ সিরিয়াল নম্বর, বায়োমেট্রিক নজরদারি এবং এনআইডি পাওয়ার পথ রুদ্ধ করার মতো সুরক্ষাবলয়গুলো যদি নিখুঁতভাবে বজায় রাখা যায়, তবে জাতীয় স্বার্থ অটুট রেখেই এই সংকটের স্থায়ী সমাপ্তি টানা সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ডিসেম্বরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবশিষ্ট পাসপোর্টগুলোর স্বচ্ছ ও নির্ভুল বিতরণ নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এটি স্পষ্ট রাখা যে বাংলাদেশ কেবল মানবিক ও বাস্তবতার নিরিখে এই পরিচয়পত্র প্রদান করেছে, যা কোনোভাবেই এই বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের স্বীকৃতি বহন করে না।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category