• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১০ অপরাহ্ন
Headline
ই-রিকশা চলাচলে নতুন বিধিমালা প্রণয়ন: ১২ বছরের আয়ুষ্কাল ও ২৫ কিমি গতিসীমা নির্ধারণ শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা: জাপানের সব শর্ত মেনে নিল বাংলাদেশ ৯ হাজার ৫০০ টন চাল বিতরণ স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর: ভারত থেকে আমদানিকৃত চালে ক্যানসারের উপাদান ব্যাংক খাতে আস্থার নতুন মাপকাঠি: ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে আট বেসরকারি ব্যাংক বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৬ ভারতে মুসলিম-দলিতদের প্রতিনিয়ত নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে: নেহা গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের প্রাক্কালে বিহারের নতুন দাবি ভারতের সঙ্গে পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে ট্রানজিট বন্ধের হুঁশিয়ারি নাহিদ ইসলামের ফলাফল সন্তোষজনক নয় এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার নির্দেশ পরওয়ারকে শাহে আলম: আতঙ্কিত হবেন না, ৭০০টির মধ্যে ৫টি অটোরিকশার নিবন্ধন পাবেন

ব্যাংক খাতে আস্থার নতুন মাপকাঠি: ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত নিয়ে শীর্ষ অবস্থানে আট বেসরকারি ব্যাংক

Reporter Name / ২ Time View
Update : সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬

দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ব্যাংক খাতের চলমান চরম অস্থিতিশীলতা এবং বহুমুখী সংকটের মধ্যেও দারুণ সুসংবাদ দিয়েছে বেশ কিছু প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। আমানত সংগ্রহ এবং ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি এই ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সর্বোচ্চ ক্রেডিট রেটিং বা ঋণমান কৃতিত্বের সঙ্গে ধরে রেখেছে। বিগত দিনে ব্যাংক খাতে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার যে সংকট তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় হেঁটে এই ব্যাংকগুলো নিজেদের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি প্রমাণ করেছে। আমানতকারীদের আস্থার প্রতীক হিসেবে বর্তমানে দেশের এমন আটটি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে, যেগুলোর প্রতিটি ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে এবং আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সির মূল্যায়নে তারা সর্বোচ্চ ‘ট্রিপল এ’ বা ‘ডাবল এ’ ঋণমান অর্জন করেছে।

স্বনামধন্য ক্রেডিট রেটিং সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ অবস্থান তথা ‘এএএ’ বা ট্রিপল এ ঋণমান পাওয়া ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় ছয়টি বেসরকারি ব্যাংক। এগুলো হলো ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং প্রাইম ব্যাংক। এর পাশাপাশি ‘এএ’ বা ডাবল এ ঋণমান নিয়ে এই অভিজাত তালিকায় শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে ট্রাস্ট ব্যাংক এবং ব্যাংক এশিয়া। আন্তর্জাতিক রেটিং মানদণ্ডে এই ক্যাটাগরির অবস্থানকে আর্থিক দায় পরিশোধে সর্বোচ্চ সক্ষমতা এবং সর্বনিম্ন ঝুঁকি হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে বর্তমান সংকটময় সময়েও সাধারণ ও করপোরেট আমানতকারীরা তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখার জন্য এই ব্যাংকগুলোকেই প্রধান পছন্দ হিসেবে বেছে নিচ্ছেন।

কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মূলধন পর্যাপ্ততা, সম্পদের গুণগত মান, সার্বিক তারল্য পরিস্থিতি, বার্ষিক আয় ও মুনাফা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা, করপোরেট সুশাসন এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা হয়। অতীতে বাংলাদেশের সাধারণ গ্রাহকেরা ব্যাংকে টাকা রাখার সময় সুশাসন বা ঋণমানের বিষয়টি খুব একটা বিবেচনা করতেন না। কিন্তু গত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে ব্যাংক খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও কেলেঙ্কারি প্রকাশ্যে আসার পর আমানতকারীদের মানসিকতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ অন্ধভাবে যেকোনো ব্যাংকে টাকা না রেখে ব্যাংকের ক্রেডিট রেটিং, সুশাসন ও স্বচ্ছতার দিকগুলো যাচাই করেই আমানত রাখছেন।

এই ধারাবাহিক সাফল্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ব্র্যাক ব্যাংক। গত সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই ব্যাংকটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকটিতে নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭৭ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকায়। বর্তমান সময়ে দেশের ব্যাংক খাতে যখন খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৩ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে, তখন ব্র্যাক ব্যাংক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাদের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ শতাংশের নিচে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি অব বাংলাদেশ বা সিআরএবি থেকে ব্যাংকটি সর্বোচ্চ ‘এএএ’ দীর্ঘমেয়াদী এবং ‘এসটি-১’ স্বল্পমেয়াদী ঋণমান অর্জন করেছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের পাশাপাশি সিটি ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক এবং প্রাইম ব্যাংক সিআরএবি থেকে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ ঋণমান ধরে রাখতে সফল হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে সিটি ব্যাংকের আমানত ৭৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের আমানত ৭৩ হাজার এবং ইস্টার্ন ব্যাংকের আমানত ৬৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে প্রাইম ব্যাংক চলতি বছরের অক্টোবরের মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকার আমানতের ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। প্রাইম ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরা জানিয়েছেন যে তাঁরা যেকোনো মূল্যে চটজলদি ব্যবসা বড় করার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদী গুণগত ও টেকসই প্রবৃদ্ধিকেই সবসময় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আসছেন।

তালিকায় থাকা ট্রাস্ট ব্যাংক লিমিটেড ক্রেডিট রেটিং ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড বা সিআরআইএসএল থেকে ‘এএ১’ বা ডাবল এ ওয়ান ঋণমান অর্জন করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এই ব্যাংকের আমানত স্থিতি বর্তমানে ৫৮ হাজার ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই এই ব্যাংকে নতুন আমানত জমা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মনে করছেন যে অতীতে কিছু ব্যাংকে আমানত রেখে গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ট্রাস্ট ব্যাংক সবসময় করপোরেট সুশাসন এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখায় গ্রাহকদের আস্থার প্রতিদান পাচ্ছে।

একসময়ের সমস্যাগ্রস্ত ও সরকারি খাতের ব্যাংক থেকে সফলভাবে বেসরকারি খাতে রূপান্তরিত হওয়া পূবালী ব্যাংক পিএলসি বর্তমান সময়ে দেশের অন্যতম শীর্ষ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সিআরআইএসএল থেকে সর্বোচ্চ ‘এএএ’ ঋণমান পাওয়া এই ব্যাংকটির আমানত স্থিতি এখন ১ লাখ সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। গত ডিসেম্বর শেষে যেখানে পূবালী ব্যাংকের আমানত ছিল প্রায় ৮৯ হাজার কোটি টাকা, সেখানে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে তা ১৯ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া সিআরআইএসএল থেকে ‘এএ প্লাস’ রেটিং প্রাপ্ত ব্যাংক এশিয়ার আমানত স্থিতিও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ৫৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যাংক নির্বাহীদের মতে, অতীতে যেসব ব্যাংক রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম এবং দুর্বল সুশাসনের মাধ্যমে লাগামহীন ঋণ বিতরণ করেছিল, বর্তমান সংকটে তারাই সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বিপরীতে যারা শুরু থেকেই নিয়মনীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করেছে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বজায় রেখেছে এবং সুশাসন নিশ্চিত করেছে, তারা প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও ব্যবসা সম্প্রসারণে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ৫০ হাজার কোটির বেশি আমানত এবং সর্বোচ্চ ঋণমানধারী এই আটটি ব্যাংক প্রমাণ করেছে যে সততা, স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখলে দেশের ব্যাংক খাতে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ও গ্রাহক আস্থা অর্জন করা সম্ভব। আগামী দিনে অন্যান্য ব্যাংকগুলোর জন্যও এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক মডেল ও সুশাসনের ধারা একটি অনন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকেও ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সুশাসন ও তদারকি জোরদার করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ আদায়ে কড়াকড়ি এবং অযাচিত ঋণ বিতরণে নিয়ন্ত্রণ আরোপের ফলে সুস্থ ধারার ব্যাংকগুলো আরও বেশি শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

গ্রাহকদের আস্থার এই ইতিবাচক ধারা বজায় থাকলে আগামীতে দেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর জনগণের হারানো বিশ্বাস সম্পূর্ণভাবে ফিরে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে গতিশীলতা বজায় রাখতে এই শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও এই উচ্চ ঋণমান ব্যাংকগুলোকে বাড়তি সুবিধা প্রদান করবে।

দেশের ব্যাংকিং খাতের এই ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও বেশি স্থিতিশীল করবে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category