বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল দেশের বামপন্থী দলগুলো। কিন্তু ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভয়াবহ ভরাডুবির মুখে পড়েছে এই জোট। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে জোটের ১৪৭ জন প্রার্থীর সবারই জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ, কোনো আসনেই প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগও পাননি তারা।
জোটের ফাটল ও ভোটের চিত্র
নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, নির্বাচনে বিএনপি ২১২টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সংগঠকদের দল এনসিপি ৬টি আসনে জয়ী হয়েছে। কিন্তু বাম জোটের ঝুলিতে কোনো আসন তো জুটেইনি, উল্টো ভোটের ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল।
বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদের সমন্বয়ে গঠিত ৮ দলীয় এই মোর্চার শরিকরা মোট ১৪৭টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এর মধ্যে সিপিবি ৬৫, বাসদ ৩৭, বাসদ (মার্কসবাদী) ৩৩ এবং বাংলাদেশ জাসদ ১৫টি আসনে প্রার্থী দেয়।
শীর্ষ নেতাদের জামানত হারানো
জোটের মধ্যে ব্যক্তিগত ইমেজে এগিয়ে থাকা প্রার্থীরাও জামানত রক্ষা করতে পারেননি।
সর্বোচ্চ ভোট: জোটের প্রার্থীদের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন বরিশাল-৫ আসনের বাসদ প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি পেয়েছেন ২২ হাজার ৪৮৬ ভোট।
সাবেক এমপির পরিণতি: পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান পেয়েছেন মাত্র ৩ হাজার ১০ ভোট।
সিপিবি শীর্ষ নেতৃত্ব: সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন (নরসিংদী-৪) ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ কাফী রতন (কুমিল্লা-৫) উভয়েই জামানত হারিয়েছেন।
ভোটের তলানি ও বিস্ময়কর সংখ্যা
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন আসনে বাম প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট ছিল বিস্ময়করভাবে কম। অনেকের ভোট সংখ্যা তিন অংকের ঘরেও পৌঁছাতে পারেনি।
ঢাকা-৮: বাংলাদেশ জাসদের এএফএম ইসমাইল চৌধুরী (মোটরগাড়ি) পেয়েছেন মাত্র ৫৬ ভোট। একই আসনে বাসদ-মার্কসবাদী প্রার্থী এএইচএম রফিকুজ্জামান আকন্দ (কাঁচি) পেয়েছেন ৯৬ ভোট।
ঢাকা-৫: বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী শাহিনুর আক্তার সুমি পেয়েছেন ২২১ ভোট।
ঢাকা-৭: জাসদের শাহানা সেলিম ২০৮ ভোট এবং বাসদের (মার্কসবাদী) সীমা দত্ত ৬৭৭ ভোট পেয়েছেন।
অন্যান্য: খুলনা-১ আসনে কিশোর রায় ৪,৮৪২ ভোট এবং নেত্রকোনা-১ আসনে আলকাছ উদ্দিন মীর ৪,৪২৯ ভোট পেয়েছেন। সিলেটে বাসদের প্রণবজ্যোতি পাল পেয়েছেন ১,১৩৪ ভোট।
কী বলছেন নেতারা?
বিপর্যয়কর এই ফলাফলের কারণ হিসেবে ‘দ্বিদলীয় মেরুকরণ’কে দায়ী করছেন বাম নেতারা। সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “শেষ মুহূর্তে ভোটাররা দ্বিদলীয় হিসাবের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন—কোন দল ক্ষমতায় যাবে আর কারা কাছাকাছি থাকবে। আমাদের কিছু প্রার্থীর জনপ্রিয়তা থাকলেও ভোটের বাক্সে তার প্রতিফলন ঘটেনি। তবে আমাদের দুর্বলতাগুলো নিয়ে আমরা পরবর্তীতে মূল্যায়ন করব।”
আরপিও বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী প্রদত্ত ভোটের আট ভাগের এক ভাগ না পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। সেই হিসেবে বাম জোটের ১৪৭ প্রার্থীর কেউই তাদের জামানত ফেরত পাচ্ছেন না।