• শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২৭ অপরাহ্ন
Headline
ভাইভায় বিশেষ নম্বরে কাউকে পাশ করানোর পরিকল্পনা নেই সরকারের: পানিসম্পদমন্ত্রী লংমার্চে উৎসাহিত হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ‘ফ্যাসিস্টরা’ মিছিল করছে: পাট প্রতিমন্ত্রী সরকারের ৬ মাসে খাদ্য মজুত বেড়েছে দেড় লাখ মেট্রিক টন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ১৫১ শয্যায় উন্নীত হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ফ্যাসিস্ট সরকারের দুর্নীতির কারণে মানুষ ঠিকমতো বিদ্যুৎ পাচ্ছে না: পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাসব্যাপী ইসলামী বইমেলা শুরু আজ তিন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারসহ ৫ কর্মকর্তাকে বদলি নারীদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে: রুহুল কবির রিজভী কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র গঠনে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর আসুন এবার রাষ্ট্রকে আমরা পুনর্গঠন করি : প্রধানমন্ত্রী

ভরা গুদামেও সারের হাহাকার: কৃষকের ক্ষোভ ও ডিলার সিন্ডিকেটের কারসাজি

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারি নথিপত্র ও পরিসংখ্যান বলছে, দেশের কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক গুদামগুলোতে রাসায়নিক সারের কোনো ঘাটতি নেই| আগামী কয়েক মাসের সামগ্রিক জাতীয় চাহিদা মেটানোর মতো পর্যাপ্ত মজুত যেমন রয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও নিয়মিত সার আমদানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে| তবে কাগজ-কলমের এই উপচে পড়া হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের রুঢ় বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছেন না দেশের কৃষককুল| ভরা মৌসুমে যখন জমিতে সার প্রয়োগের সবচেয়ে জরুরি মুহূর্ত, তখন ডিলারের দরজায় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শত শত কৃষককে ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে| নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে| আবার ডিলারদের দোকানে ‘সার নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হলেও সেই একই বস্তা রাতের আঁধারে খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রির ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠছে| ফলে ফসলের মাঠে অনিশ্চয়তা আর ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে কৃষকদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এবং ডিলারের গুদাম ভাঙচুরের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা|
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১০ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র এক মাসের ব্যবধানে সারের দাবিতে কৃষকরা দেশজুড়ে অন্তত ১৫টি পৃথক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন| এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে উত্তপ্ত| গত ১০ আগস্ট লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়ার দাবিতে কয়েক হাজার ক্ষুব্ধ কৃষক লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন| এরপর ১২ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে শত শত কৃষক উপজেলা পরিষদ চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানান|
দিন যত গড়িয়েছে, কৃষকের ক্ষোভ ততই চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে| ২৩ আগস্ট কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর শিলখুড়ী ইউনিয়নে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েও সার না পেয়ে একপর্যায়ে গুদামে ঢুকে সার নিয়ে যান প্রান্তিক কৃষকরা| উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্যমতে, ওই ডিলারের নামে বরাদ্দ হওয়া ৩৪০ বস্তা সারের মধ্যে প্রায় ২০০ বস্তা কৃষক জোরপূর্বক নিয়ে যান| ৩০ আগস্ট দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সামনে এবং ৩১ আগস্ট রংপুরের মিঠাপুকুর ও রংপুর নগরীর খামার মোড়ে সিন্ডিকেট ভেঙে সার সরবরাহের দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়| এরপর ২ সেপ্টেম্বর ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট বাজারে সড়ক অবরোধ, ৫ সেপ্টেম্বর ঝিনাইদহের শৈলকুপায় গাছের গুঁড়ি ফেলে আঞ্চলিক মহাসড়ক অবরোধ এবং ৬ সেপ্টেম্বর নাগেশ্বরীর কচাকাটা বাজারে ডিলারের গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে|
সবচেয়ে চরম অস্থিতিশীলতা দেখা দেয় গত ৭ সেপ্টেম্বর| ওই দিন কুড়িগ্রামের রৌমারীর বন্দবেড় বাজারে ভোর থেকে অপেক্ষা করেও সার না পেয়ে কৃষকরা ডিলারের গুদামের দরজা ও টিনের বেড়া ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়েন এবং প্রায় ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে যান| একই দিন ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকরা সড়ক অবরোধের একপর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে দীর্ঘক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখেন| এছাড়া রাজশাহীর পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজারে প্রায় তিন শতাধিক কৃষক মহাসড়ক অবরোধ করে সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবি জানান এবং লালমনিরহাটেও পুনরায় মহাসড়ক অবরোধ করা হয়| কৃষকের মাঠে জমে ওঠা এই তীব্র ক্ষোভ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বিতরণ ব্যবস্থার শিকড়েই বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা বাসা বেঁধেছে|
অথচ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসের ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে বিভিন্ন গুদামে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন রাসায়নিক সার সুরক্ষিত রয়েছে| এর মধ্যে রয়েছে ৪ লাখ ২৭ হাজার টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৩২ হাজার টন ডিএপি, ১ লাখ ১৭ হাজার টন এমওপি এবং ৩ লাখ ৫২ হাজার টন টিএসপি| শুধু তাই নয়, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সামগ্রিক জাতীয় চাহিদা ও সম্ভাব্য সরবরাহের একটি বিশদ হিসাবও চূড়ান্ত করেছে সরকার| অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চার ধরনের সারের সম্মিলিত চাহিদা ধরা হয়েছে ৪০ লাখ ২৯ হাজার টন, যার বিপরীতে সম্ভাব্য জোগানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৩ লাখ ৭১ হাজার টন| অর্থাৎ সম্ভাব্য চাহিদার চেয়েও প্রায় ১৩ লাখ ৪২ হাজার টন বেশি সার নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে| এছাড়া বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন সার পাইপলাইনে পরিবহনাধীন রয়েছে এবং ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আরও ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার টন সার আমদানির চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে|
মজুত ও আমদানির এমন বিশাল পরিসংখ্যান সত্ত্বেও কৃষকের হাতে সার না পৌঁছানোর পেছনে মূলত পুরোনো বিতরণ কাঠামোর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ দায়ী| অতীতে একটি ইউনিয়নে একজনমাত্র প্রধান ডিলারের মাধ্যমে সার বিতরণের নিয়ম থাকায় স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও একই পরিবারের একাধিক সদস্যের হাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল| বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) আলাদা ও সমন্বয়হীন কাঠামোর কারণে সেখানে কোনো সুস্থ প্রতিযোগিতা ছিল না| বর্তমান সরকার সেই আধিপত্য ভেঙে একটি ইউনিয়নে একাধিক ডিলার এবং একাধিক খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন শুরু করেছে, যাতে সাধারণ কৃষকের কাছে পৌঁছানোর বিকল্প সুযোগ তৈরি হয়|
তবে এই সংস্কার আনতে গিয়েই স্বার্থের বড় সংঘাত তৈরি হয়েছে| পুরোনো প্রভাবশালী ডিলারদের একটি অংশ নিজেদের একচেটিয়া মুনাফা হারানোর ভয়ে নতুন নীতিমালাকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ খোদ কৃষি মন্ত্রণালয়ের| তাদের অসহযোগিতা ও অনীহার কারণে বেশ কয়েকটি জেলায় বরাদ্দ পাওয়া সত্ত্বেও ডিলাররা সময়মতো সার উত্তোলন করেননি| মাঠপর্যায়ে কৃত্রিম সংকট তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে ইতোমধ্যে ১৫টি জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে, প্রত্যাহার করা হয়েছে চারজন জেলা কর্মকর্তাকে এবং আরও চারজনকে তাৎক্ষণিক স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে| স্থানীয় পর্যায়ে অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি গুদামে সার ঢোকার পরপরই একটি নির্দিষ্ট অংশ জোরপূর্বক কম দামে হাতিয়ে নিয়ে পরে খোলাবাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে| কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও স্বীকার করেছেন যে, পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও কিছু অসাধু ব্যক্তির স্বার্থান্বেষী তৎপরতায় মাঠের পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে|
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রের গুদামে সারের পাহাড় থাকা আর একজন প্রান্তিক কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানো কখনোই এক বিষয় নয়| কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইদুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, সার আমদানির বন্দর থেকে শুরু করে ডিলারের গুদাম পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ যেখানে প্রত্যক্ষভাবে সরকারি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে, সেখানে কৃষককে খোলাবাজার থেকে বেশি দামে সার কিনতে হলে সরকার শুধু জাতীয় মজুতের খতিয়ান দেখিয়ে নিজের দায় এড়াতে পারে না|
সংকট নিরসনে সরকার অবশ্য শেষ মুহূর্তে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপে নেমেছে| কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র দশ দিনে সারাদেশে ২০৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে| অভিযানে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা আদায়, চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড এবং পাঁচজন অসাধু ডিলারের লাইসেন্স সরাসরি বাতিল করা হয়েছে| পাশাপাশি লুট বা সরিয়ে ফেলা প্রায় ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করেছে প্রশাসন| পুরো ব্যবস্থা নিবিড় তদারকিতে রাখতে ৬৪টি জেলায় একজন করে মনিটরিং কর্মকর্তা নিয়োগ এবং কৃষি কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক যোগাযোগের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে| কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অনিয়মে অভিযুক্তদের তালিকা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন| অন্যদিকে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান দ্ব্যর্থহীন ভাষায় দাবি করেছেন যে, দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই; বরং একটি অসাধু চক্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল ও সরকারকে বিব্রত করতে কৃত্রিম সংকট ও অস্থিরতা তৈরি করছে| তবে প্রশাসন ও অসাধু ডিলারদের এই পারস্পরিক দোষারোপের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে কৃষকের ফসল যেন নষ্ট না হয়, সেটিই এখন এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ|
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category