• বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৩ অপরাহ্ন
Headline
‘ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাই না’: প্রধানমন্ত্রী ফুটবল মাঠের পরিচিত মুখ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী: গুলিতেই শেষ হলো মাফিয়া টিটনের অধ্যায় কক্সবাজারে বন্যহাতির আক্রমণে মা ও শিশুকন্যার মর্মান্তিক মৃত্যু মার্কিন অবরোধে তেলের ব্যারেল ১২০ ডলারে আবারও গাজা অভিমুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের হামলা পরমাণু চুক্তি ছাড়া নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারে ট্রাম্পের ‘না’, ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যুতে পুতিনের প্রস্তাব, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত ট্রাম্পের ধাপে ধাপে আসছে নবম পে-স্কেল: প্রথম ধাপেই বাড়ছে মূল বেতন বেঙ্গালুরুতে হাসপাতালের দেয়াল ধসে ৭ জনের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত শিক্ষার্থী লিমনের মরদেহ ৪ মে দেশে আসছে

মব জাস্টিস না ক্ষমতার প্রভাব?: রিজওয়ানার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

Reporter Name / ৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতের অন্যতম পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়ার যে অনন্য দৃষ্টান্ত এই প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করেছিল, তা আজ এক গভীর সংকটের মুখে। সম্প্রতি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাপ্রবাহ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি ভয়ংকর অভিযোগ—ক্ষমতার অপব্যবহার। আর এই অভিযোগের তীর বারবার গিয়ে বিদ্ধ হচ্ছে সাবেক বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের দিকে।

পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে একসময় যিনি ছিলেন দেশের মানুষের কাছে এক পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম, আজ তার বিরুদ্ধেই উঠেছে একটি অলাভজনক সেবামূলক প্রতিষ্ঠান দখলের ইন্ধন জোগানোর মতো গুরুতর অভিযোগ। এই ঘটনা জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে থাকা ব্যক্তিদের নৈতিকতা ও ক্ষমতার সীমারেখা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।


ভাবমূর্তির সংকট: পরিবেশকর্মী থেকে ক্ষমতার প্রভাবক

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশের একজন সুপরিচিত পরিবেশবাদী আইনজীবী। পলিথিন নিষিদ্ধকরণ, নদী দখল রোধ এবং বনভূমি রক্ষার মতো জাতীয় ও জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তার দৃঢ় ও আপসহীন অবস্থানের কারণে জনমনে তার একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ তাকে নাগরিক অধিকার রক্ষার একজন অগ্রজ সৈনিক হিসেবেই জানত।

কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর তার সেই উজ্জ্বল ভাবমূর্তির সাথে বাস্তবের কর্মকাণ্ডের এক বিশাল ফারাক নিয়েই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে। সমালোচকরা বলছেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তার মতো একজন নীতিবান মানুষের কাছ থেকে যে ধরনের নিরপেক্ষতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত আশা করা হয়েছিল, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ক্ষেত্রে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব কীভাবে একজন অধিকারকর্মীকে প্রভাবিত করতে পারে, এটি তার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।


ডা. জাফরুল্লাহর প্রয়াণ ও নেতৃত্বের শূন্যতা

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বর্তমান এই সংকটের সূত্রপাত খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মৃত্যুর পরবর্তী সময়টিতে। ডা. জাফরুল্লাহ দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তার নিজস্ব ক্যারিশমা, দৃঢ় ব্যক্তিত্ব এবং অসামান্য নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি শক্ত নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।

তার জীবদ্দশায় কোনো স্বার্থান্বেষী মহল এই প্রতিষ্ঠানের দিকে হাত বাড়ানোর সাহস পায়নি। কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ধীরে ধীরে দুর্বল হতে শুরু করে। নেতৃত্বের এই চরম শূন্যতাকে পুঁজি করেই একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠানটির ওপর নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নীলনকশা প্রণয়ন করে।


গণস্বাস্থ্য দখলে ক্ষমতার অপব্যবহার: সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধান

বুধবার দেশের একটি জাতীয় দৈনিকে ‘গণস্বাস্থ্য দখলে সাবেক উপদেষ্টা’ শিরোনামে একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মতো একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা শুরু হয়।

এই জবরদখল প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ও সবচেয়ে নগ্ন রূপটি দেশবাসী দেখতে পায় ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে। সেদিন সাভারের মির্জানগরে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মূল সদর দপ্তরে হঠাৎ করেই একদল বহিরাগত লোক জোরপূর্বক ঢুকে পড়ে। একটি চিকিৎসা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন পেশিশক্তির মহড়া ছিল সম্পূর্ণ নজিরবিহীন। অভিযোগ রয়েছে, এই পুরো দখল প্রক্রিয়ার সময় প্রভাবশালীদের সাথে ফোনে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল এবং মোবাইলের মাধ্যমেই দখলদারদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল।


আইন ও নৈতিকতার প্রশ্ন: ট্রাস্ট আইন লঙ্ঘন

এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি হলো নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত আইনের চরম লঙ্ঘন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র একটি ট্রাস্ট দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান। ১৯২৮ সালের ট্রাস্ট অ্যাক্ট এবং গণস্বাস্থ্যের নিজস্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ট্রাস্টের কোনো নতুন বোর্ড গঠন বা বড় ধরনের রদবদল করতে হলে অবশ্যই প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের সুস্পষ্ট সম্মতি থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের মতামত ও সম্মতি ছাড়া কোনোভাবেই নতুন বোর্ড গঠন করা যায় না।

অথচ অভিযোগ রয়েছে, ট্রাস্ট আইনের এই সুস্পষ্ট বিধানকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্যদের বাইরে রেখে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে একটি নতুন ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এখানে শুধু কতিপয় ব্যক্তির ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষাই কাজ করেনি, বরং এর পেছনে কাজ করেছে ক্ষমতার চরম মনস্তত্ত্ব। যখন কোনো ব্যক্তি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেন, তখন তার একটি ইশারা বা সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক বড় হয়ে যায়। সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি বেসরকারি বা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করাটা কেবল অনৈতিকই নয়, এটি একটি বড় ধরনের আইনি অপরাধও বটে। প্রশ্ন উঠেছে, একজন সরকারি উপদেষ্টা কি তার পদের প্রভাব খাটিয়ে একটি বেসরকারি ট্রাস্টের দখলদারিত্বে ইন্ধন জোগাতে পারেন?


মব জাস্টিস ও প্রশাসনের নীরবতা

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই ঘটনাটিকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কোন্দল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘মব’ বা জনতার ক্ষোভকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জবরদখল ও নিজেদের সুবিধামতো সিদ্ধান্ত আদায়ের যে একটি ভয়ংকর প্রবণতা দেখা গেছে, এটি তারই একটি অংশ।

সাভারের মির্জানগরে যখন বহিরাগতরা প্রবেশ করে তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিল রহস্যজনকভাবে নীরব। প্রশাসনের এই নীরবতা বা দুর্বলতাই মূলত দখলদারদের উৎসাহিত করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যখন দখলদাররা বুঝতে পারে যে তাদের মাথার ওপর রাষ্ট্রের কোনো শীর্ষ কর্তাব্যক্তির (যেমন একজন উপদেষ্টার) ছায়া রয়েছে, তখন তারা আইন-কানুনের তোয়াক্কা করে না। প্রশাসনিক এই দুর্বলতা রাষ্ট্রের আইনের শাসনের ভিত্তিমূলকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।


ভবিষ্যতের শঙ্কা ও উত্তরণের পথ

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র কেবল একটি হাসপাতাল বা ঔষধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি জীবন্ত প্রতীক। গরিব ও প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এই প্রতিষ্ঠানটির অবদান অনস্বীকার্য। ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ নিয়ে যদি এমন একটি ঐতিহাসিক ও জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে গায়ের জোরে দখল করে নেওয়া হয়, তবে তা দেশের পুরো এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী খাতের জন্যই একটি অশনিসংকেত।

সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলোর একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। যদি এই অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা প্রমাণ করবে যে ক্ষমতার কেন্দ্রে গেলে নীতি ও আদর্শ কতটা দ্রুত হারিয়ে যেতে পারে।

আজ গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই সংকটের সমাধান কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে দেশের হাজারো অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা। রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করে, আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের জবরদখল সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করা সম্ভব। তা না হলে, সাধারণ মানুষের কল্যাণে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবেই একসময় ক্ষমতাশালীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category