• শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৪ অপরাহ্ন

মালাক্কার ফাঁদ: চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বজয়ের অর্থনৈতিক ও সামরিক মহাসমর

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

মহাজাগতিক যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা কল্পবিজ্ঞান বাদ দিলে, বর্তমান পৃথিবীর ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের চাবিকাঠি আটকে আছে ভারত মহাসাগরের এক কোণায় অবস্থিত মাত্র দেড় মাইল চওড়া এক সংকীর্ণ সামুদ্রিক গলির ভেতর। আধুনিক মানুষের প্রতিদিনের ব্যবহৃত স্মার্টফোন, যাতায়াতের গাড়ি কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের (এসি) পেছনের জ্বালানি ও কাঁচামাল প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট জলপথ পার হয়েই বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছায়। ভূরাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি যদি মাত্র সাত দিনের জন্য পুরোপুরি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে থমকে যাবে গোটা এশিয়া মহাদেশ। নিমিষেই বন্ধ হয়ে যাবে চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরিগুলো এবং গ্লোবাল সাপ্লাই চেইন বা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে পড়বে। এই সংকীর্ণ পানির রেখাটিই হলো ভূরাজনীতির অন্যতম আলোচিত কেন্দ্রবিন্দু ‘মালাক্কা প্রণালী’।

ভৌগোলিকভাবে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপ এবং মালয় উপদ্বীপের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত এই মালাক্কা প্রণালী। তবে বিশ্ব রাজনীতির পরিভাষায় এটি হলো চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক দুঃস্বপ্ন এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনের জন্য বেইজিংকে এক নিমিষে হাঁটু গেড়ে বসিয়ে দেওয়ার মোক্ষম ফাঁদ। ভূরাজনৈতিক আলোচনায় এর আরেক নাম ‘দা মালাক্কা ট্র্যাপ’ বা ‘মালাক্কার ফাঁদ’। প্রতিদিন পৃথিবীর মোট সমুদ্র বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই সরু প্রণালী দিয়ে পার হয়। সংখ্যার হিসেবে বছরে প্রায় ৫০ হাজারের চেয়েও বেশি বড় বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজ এই পথটি ব্যবহার করে।

এই পুরো দাবার ছকের মূল খেলোয়াড় হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। চীন বর্তমানে বিশ্বের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে পরিচিত হলেও, তাদের এই সুবিশাল উৎপাদনযজ্ঞ সচল রাখতে প্রতিদিন প্রয়োজন কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। আর চীনের এই শক্তির মূল উৎস হলো মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকা অঞ্চল। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী কোনো জাহাজ যদি চীনে পৌঁছাতে চায়, তবে তার সামনে একমাত্র কার্যকর ও সংক্ষিপ্ত প্রাকৃতিক রাস্তা হলো এই মালাক্কা প্রণালী। চীন প্রতিবছর যে পরিমাণ জ্বালানি তেল বিদেশ থেকে আমদানি করে, তার প্রায় ৮০ শতাংশ তেলবাহী জাহাজকে এই সাড়ে আটশত কিলোমিটার দীর্ঘ সরু গলিপথটি পাড়ি দিতে হয়। ফলে এটি চীনের জন্য অর্থনীতির মূল শ্বাসনালী বা ‘চিকেন নেক’।

ভূরাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, চীনের মূল শক্তির ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীনের মাটিতে বিপুল পরিমাণ নিজস্ব তেলের রিজার্ভ বা খনি নেই; তারা সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। যদি কোনো কারণে এই মালাক্কা প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে চীনের ভেতরের পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ দিয়ে তারা সর্বোচ্চ ৪৫ থেকে ৬০ দিন রাষ্ট্র সচল রাখতে পারবে। এর পরপরই চীনের সমস্ত কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং দেশের চাকা সম্পূর্ণ থমকে যাবে।

চীনের এই কৌশলগত দুর্বলতাকেই আমেরিকা বানিয়েছে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে তাদের সবচেয়ে বড় ‘চোকপয়েন্ট’ বা শ্বাসরোধকারী অস্ত্র। পেন্টাগনের সামরিক স্ট্র্যাটেজিস্টরা খুব ভালো করেই জানেন যে, তাইওয়ান বা দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে যদি কোনোদিন বেইজিংয়ের সাথে সরাসরি যুদ্ধ বাধে, তবে চীনকে তাদের নিজেদের ঘরের মাঠে (Mainland) হারানো বেশ কঠিন হবে। কারণ চীনের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি তাদের নিজস্ব মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই আমেরিকা যেকোনো যুদ্ধকে চীনের ঘরের মাঠ থেকে দূরে, ভারত মহাসাগরের এই গভীর ট্র্যাপ বা মালাক্কার ফাঁদে নিয়ে আসতে চায়।

মানচিত্রের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মালাক্কা প্রণালীর ঠিক পশ্চিম প্রবেশদ্বারে—যেখানে ভারত মহাসাগর শেষ হয়ে প্রণালীটি শুরু হচ্ছে, সেখানে প্রাকৃতিকভাবে অবস্থান করছে ভারতের আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জটি যেন ভারত মহাসাগরের বুকে প্রকৃতির তৈরি একটি স্থায়ী এবং অবিচল ‘এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার’। ভারতের সাথে আমেরিকার রয়েছে গভীর সামরিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব। আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জে ভারত ইতিমধ্যে তাদের শক্তিশালী ত্রিদেশীয় সামরিক কমান্ড গড়ে তুলেছে। এর অর্থ হলো, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভারতীয় নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনী অত্যন্ত সহজেই মালাক্কা প্রণালীর পুরো প্রবেশমুখ সিল বা অবরুদ্ধ করে দিতে পারবে।

শুধু তাই নয়, প্রণালীর একেবারে পূর্ব প্রান্তে—যেখানে এটি শেষ হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে মিশেছে, সেখানে অবস্থিত ধনী দেশ সিঙ্গাপুর। আর এই সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি নৌঘাটিতে নিয়মিত নোঙর করে থাকে মার্কিন নৌবাহিনীর পরাক্রমশালী সপ্তম নৌবহর বা ‘সেভেন্থ ফ্লিট’-এর যুদ্ধজাহাজগুলো। অর্থাৎ, মালাক্কার শুরুতে বসে আছে মার্কিন মিত্র ভারত, আর শেষ প্রান্তে ওত পেতে বসে আছে খোদ মার্কিন নেভি। যুদ্ধ শুরু হলে বেইজিংয়ের একটি তেলবাহী জাহাজও এই গলি পার হতে পারবে না।

চীন এই ফাঁদের কথা খুব ভালো করেই জানে। ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে চীনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতাদের সামনে এক ঐতিহাসিক ভাষণে এই সংকটের নাম দিয়েছিলেন ‘দা মালাক্কা ডিলেমা’ (The Malacca Dilemma)। বেইজিং বোঝে যে তাদের অর্থনীতির লাইফলাইনের দড়িটি আসলে ওয়াশিংটন এবং নয়া দিল্লির হাতের মুঠোয় বন্দী। আর এই বন্দী দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিগত দুই দশক ধরে চীন যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, তা আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অবকাঠামোগত যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।

২০১৩ সালে সি জিনপিং চীনের ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল এই মালাক্কা ডিলেমা থেকে দেশকে চিরতরে মুক্ত করা। আর এই লক্ষ্য থেকেই জন্ম নেয় চীনের শতাব্দীসেরা মেগা প্রজেক্ট ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বা বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)। আপাতদৃষ্টিতে একে বাণিজ্যিক বিনিয়োগ মনে হলেও, এর পেছনের মূল ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল মালাক্কা প্রণালীকে সম্পূর্ণ বাইপাস করে বিকল্প স্থলপথ এবং আন্তর্জাতিক বন্দর তৈরি করা।

চীনের এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ‘সিপেক’ (CPEC) বা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর, যার পেছনে বেইজিং প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। এই প্রজেক্টের ফলে পারস্য উপসাগর থেকে আসা তেলের জাহাজগুলো এখন আর মালাক্কা প্রণালীমুখী না হয়ে সরাসরি পাকিস্তানের গোয়াদর বন্দরে নোঙর করতে পারবে। এরপর সেই তেল পাইপলাইন এবং সড়ক পথে পাকিস্তানের বুক চিড়ে সরাসরি চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে পৌঁছে যাবে। একই সাথে চীন মিয়ানমারের কিয়াকফিউ বন্দর থেকে সরাসরি চীনের ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত তেল ও গ্যাসের সমান্তরাল পাইপলাইন বসিয়েছে, যার ফলে বঙ্গোপসাগর থেকেই তেল সরাসরি স্থলপথে চীনে ঢুকে যাচ্ছে। এমনকি চীন থাইল্যান্ডের সরকারকে বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছে তাদের দেশের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ ‘ক্রা ইস্তোমাস’ কেটে একটি কৃত্রিম খাল (Kra Canal) তৈরি করার জন্য, যা তৈরি হলে জাহাজগুলো মালাক্কা ও সিঙ্গাপুরকে সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে সরাসরি দক্ষিণ চীন সাগরে প্রবেশ করতে পারবে।

এত কিছুর পরেও চীন এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক এনার্জি বিশেষজ্ঞদের তথ্য ও ডেটা অ্যানালিসিস অনুযায়ী, চীনের এই সমস্ত বিকল্প রুটগুলো একসাথে মিলেও বেইজিংয়ের প্রতিদিনের মোট জ্বালানি চাহিদার সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম। কারণ দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল আর হাজার হাজার কিলোমিটারের স্থলপথে পাইপলাইনের মাধ্যমে কোটি কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন করা সাগরের বিশাল ট্যাংকার জাহাজের তুলনায় অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল। অর্থাৎ, শত বিলিয়ন ডলার খরচের পরেও চীনের ৮০ শতাংশ তেল এখনো এই মালাক্কা প্রণালীর ওপরই নির্ভরশীল।

কাজেই, এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব এখন অনিবার্য রূপ নিয়েছে। চীন দক্ষিণ চীন সাগরে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে একের পর এক যে কৃত্রিম দ্বীপ বানাচ্ছে এবং সেখানে মিসাইল ও ফাইটার জেট মোতায়েন করছে, তার আসল কারণও এই মালাক্কা ফাঁদ। চীন খুব ভালো করে জানে ভারত মহাসাগরে তারা মার্কিন এবং ভারতীয় নৌবাহিনীর চেয়ে দুর্বল। তাই তারা মালাক্কা প্রণালী থেকে বের হবার ঠিক মুখের জায়গাটাতে অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগরে নিজেদের একটি সামরিক প্রতিরক্ষা দেয়াল বা ‘গ্রেট ওয়াল অব স্যান্ড’ তৈরি করছে। এর উদ্দেশ্য হলো, যদি কখনো যুদ্ধ বাধে এবং আমেরিকা যদি মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম মুখ বন্ধও করে দেয়, তবে চীন যেন তাদের এই কৃত্রিম দ্বীপগুলোর মিসাইল এবং যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে প্রণালীর পূর্বমুখে মার্কিন নেভিকে কাউন্টার অ্যাটাক করতে পারে।

আপাতদৃষ্টিতে এটি দুই পরাশক্তির বৈশ্বিক আধিপত্য টিকিয়ে রাখার এবং টিকে থাকার এক নির্মম ও ধ্রুপদী লড়াই। পরমাণু বোমার যুগে পরাশক্তিগুলো হয়তো সরাসরি একে অপরের ওপর মিসাইল ছুড়বে না, কিন্তু মাত্র দেড় মাইলের এই সরু পানির রেখাটিই একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধের সমীকরণ এবং আগামীর পৃথিবীর অর্থনৈতিক চাবিকাঠি নির্ধারণ করছে।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category