• রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪১ অপরাহ্ন
Headline
জিম্মি থাকা কার্গো মুক্ত করলো তুরস্ক ও সোমালি বাহিনী, ১৪ জলদস্যু নিহত হাম উপসর্গে চারজনের মৃত্যু, নতুন রোগী দেড় হাজারের বেশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে: স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সাগর-রুনি হত্যায় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের প্রাথমিক সম্পৃক্ততা মিলেছে: চিফ প্রসিকিউটর জাতীয় ফুটবল দলের নতুন ম্যানেজার বাবু, কো-অর্ডিনেটর আমের সালমান শাহ হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পেছালো প্রস্তাবিত নতুন পে-স্কেলে কোন গ্রেডে কত বেতন জিসান হত্যা- হাসিনা-জয়সহ ২৯ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র কিশোরগঞ্জে কাভার্ড ভ্যান-সিএনজি সংঘর্ষে নিহত ৩ একযোগে ২৭ উপসচিবকে ডিসি অফিসে উপপরিচালক নিয়োগ

মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ ও তিন দেশের ভাগ্য

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

একটি দেশের কেন্দ্রীয় সরকার যখন নিজ ভূখণ্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সেনাবাহিনী একের পর এক সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, তখন সাধারণত সেই দেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার কথা। তবে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত মিয়ানমারের ক্ষেত্রে ঘটছে ঠিক উল্টো ঘটনা। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শুরু হওয়া বহুমুখী গৃহযুদ্ধ এবং ২০২৬ সালে রাখাইন রাজ্যে জান্তা বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির তীব্র রক্তক্ষয়ী লড়াই দেশটিকে চরম অস্থিতিশীলতার মুখে দাঁড় করালেও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলো এই অঞ্চলকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করতে পারছে না। বরং মিয়ানমারের এই বিশৃঙ্খলা ও আঞ্চলিক সংকটকে ঘিরে চীন, ভারত ও বাংলাদেশ—তিনটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই নিজেদের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সংযোগের নতুন জটিল সমীকরণ মেলাতে বাধ্য হচ্ছে।
মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থানই মূলত দেশটির সবচেয়ে বড় কৌশলগত শক্তি। একদিকে হিমালয়ের পরাশক্তি চীন ও ভারত, অন্যদিকে দক্ষিণে বাংলাদেশ এবং ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গোপসাগর। এই অবস্থানের কারণে মিয়ানমারের রাখাইন, মংডু, বুথিডং কিংবা রাথেডংয়ের মতো সীমান্ত এলাকায় যখন গুলির শব্দ ওঠে, তার প্রত্যক্ষ প্রতিধ্বনি পৌঁছায় ঢাকা, দিল্লি ও বেইজিংয়ের নীতি-নির্ধারণী টেবিলে। সামরিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী বিশেষ করে আরাকান আর্মি রাখাইনের বিস্তীর্ণ উপকূল ও সীমান্ত এলাকা দখলে নেওয়ায় পরিস্থিতি এখন আর শুধু মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে একটি বহুস্তরীয় আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক দাবার বোর্ডে।
বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারের এই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা সরাসরি জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এক বড় ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। ঢাকার জন্য যুদ্ধের সরাসরি সামরিক সংঘাতের চেয়েও বড় বিপদ হলো তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং নতুন করে শরণার্থীর ঢল। দেশটি আগে থেকেই বিপুল সংখ্যক বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ভার বহন করছে। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাখাইনে নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় সাগরপথে বিপজ্জনকভাবে পালাতে গিয়ে নৌকাডুবিতে শত শত মানুষের প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এক কঠিন উভয় সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে—সীমান্ত কঠোরভাবে সিলগালা করলে দেখা দেয় চরম মানবিক বিপর্যয়, আর শিথিল করলে তৈরি হয় বাড়তি জনসংখ্যার স্থায়ী চাপ। তদুপরি, ওপারে যদি অরাষ্ট্রীয় বা সশস্ত্র গোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তবে তা বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
অন্যদিকে বেইজিংয়ের কাছে মিয়ানমার তার ভূ-কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার এক অপরিহার্য করিডর। চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি আমদানির একটি বিশাল অংশ নির্ভর করে ঝুঁকিপূর্ণ মালাক্কা প্রণালীর ওপর। বঙ্গোপসাগরের তীরে মিয়ানমারের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের (সিএমইসি) মাধ্যমে চীনের ইউনান প্রদেশকে সরাসরি ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করার একটি বিকল্প স্থলপথ পায় বেইজিং। দেশটির অভ্যন্তরীণ সংঘাত চললেও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সিএমইসি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ তাগিদ বজায় রেখেছেন। বেইজিংয়ের নীতি মূলত কোনো নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থার প্রতি আনুগত্য নয়, বরং ক্ষমতা যার হাতেই থাকুক—সামরিক জান্তা কিংবা স্থানীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠী—তাদের সাথে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত যোগাযোগ অক্ষুণ্ণ রেখে ভারত মহাসাগরে নিজেদের প্রবেশদ্বার নিশ্চিত করা।
চীনের এই ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির বিপরীতে ভারতও মিয়ানমারকে নিজের জাতীয় নিরাপত্তা ও যোগাযোগের লাইফলাইন হিসেবে বিবেচনা করে। মূল ভূখণ্ডের সাথে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো কেবল ‘শিলিগুড়ি করিডর’ বা ‘চিকেনস নেক’ নামের একটি অত্যন্ত সরু ভূখণ্ড দিয়ে যুক্ত। এই কৌশলগত দুর্বলতা কাটাতে এবং বিকল্প পথ তৈরি করতে ভারত দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে ‘কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট’ বাস্তবায়ন করছে। বঙ্গোপসাগরের সিত্তে বন্দর থেকে কালাদান নদী হয়ে মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে ভারতের মিজোরামে সংযোগ স্থাপন করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এছাড়া প্রস্তাবিত ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় হাইওয়ে বাস্তবায়নের ওপরও জোর দিচ্ছে দিল্লি। ফলে চীন যেমন ভারত মহাসাগরে নামার পথ খুঁজছে, তেমনি ভারতও তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে নিরাপদ রাখতে মিয়ানমারের বিকল্প পথকে আকড়ে ধরে আছে।
এই আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বাংলাদেশও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দরের কারণে বঙ্গোপসাগরের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান কৌশলগতভাবে অপরিহার্য। ২০২৬ সালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময়ও চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে একটি বহুপক্ষীয় অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার বিষয়ে বেইজিংয়ের আগ্রহ প্রকাশ পেয়েছে, যেখানে প্রয়োজনে ভারতকে যুক্ত করার ধারণাও আলোচিত হয়েছে। ফলে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ এবং বঙ্গোপসাগরের বন্দর অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় ঢাকার অবস্থান অত্যন্ত ওজনদার।
বাস্তবতা হলো, ইউক্রেন যুদ্ধ যেমন সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তা বলয় বদলে দিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা যেভাবে বিশ্ব জ্বালানি রাজনীতিকে ওলটপালট করেছে, মিয়ানমারের ভেতরের সংঘাতও তেমনি দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র ও ভবিষ্যৎকে নতুন রূপ দিচ্ছে। চীন চায় ভারত মহাসাগরে অবাধ করিডর, ভারত চায় তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সংযোগ ও নিরাপত্তা, আর বাংলাদেশ চায় নিরাপদ সীমান্ত, রোহিঙ্গাদের সম্মানজনক প্রত্যাবাসন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ন্যায্য অংশীদারিত্ব। একটি দুর্বল ও গৃহযুদ্ধে দীর্ণ রাষ্ট্র হয়েও কেবল ভৌগোলিক অবস্থানের শক্তিতে মিয়ানমার আজ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যার গতিপ্রকৃতির ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্য।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category