বিশ্বকাপ ফুটবল বা আন্তর্জাতিক অন্য কোনো ক্রীড়া আসরের তীব্র উত্তেজনা নিয়ে যখন দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ এক কৃত্রিম উন্মাদনায় মেতে থাকেন, ঠিক সেই বিনোদনমূলক ডামাডোলের আড়ালে আমাদের উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক স্বপ্ন ও তরুণ প্রজন্মের ক্যারিয়ারের ওপর এক ভয়ংকর ও নীরব সুনামি ধেয়ে আসছে। মাঠের সাময়িক জয়-পরাজয়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত ভুলে যাচ্ছি আমাদের টিকে থাকার আসল লড়াইয়ের কথা। যখন চারপাশের মানুষ সাময়িক আনন্দ আর উৎসবে বিভোর, ঠিক তখনই বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও স্বপ্নের উচ্চশিক্ষার গন্তব্য—যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতিতে এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ও বড় ধাক্কা লেগেছে। যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া বিদেশী শিক্ষার্থী, গবেষক এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্য দীর্ঘ প্রায় ৪৭ বছর ধরে চলমান ‘ডিউরেশন অব স্ট্যাটাস’ বা ভিসার অনির্দিষ্ট মেয়াদের যে চিরাচরিত সুবিধা ছিল, তা সম্পূর্ণ বাতিল করে একটি চূড়ান্ত ও কঠোর রক্ষণশীল নীতিমালা জারি করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। দেশটির ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে এখন থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য মার্কিন ভূখণ্ডে থাকার সময়সীমা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সংকুচিত করে আনা হয়েছে, যা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে এক গভীর ও নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর এদেশের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে পাড়ি জমান, যার মধ্যে অনেকেরই মূল লক্ষ্য থাকে আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে ভালো চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। এই স্বপ্নের তালিকায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ সবসময়ই যুক্তরাষ্ট্র। তবে নতুন এই অভিবাসন নীতির কারণে দেশটিতে অবস্থানরত এবং নতুন করে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা নানামুখী মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়েছেন। ১৯৭৮ সালের পর থেকে চলা নিয়মের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন এই বিধিনিষেধে স্টুডেন্ট ও এক্সচেঞ্জ ভিজিটর ভিসাধারীদের সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য মার্কিন ভূখণ্ডে থাকার অনুমোদন দেওয়া হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর তার নির্দিষ্ট একাডেমিক কোর্স বা গবেষণা সম্পন্ন করতে চার বছরের বেশি অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়, তবে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট অফিসের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস’ (ইউএসসিআইএস)-এর কাছে ‘এক্সটেনশন অব স্টে’ বা থাকার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জটিল ও আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। এর সরাসরি অর্থ হলো, ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর যাবতীয় তদারকি ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সরাসরি ফেডারেল কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একই সাথে মেয়াদ বাড়াতে চাওয়া আবেদনকারীদের অত্যন্ত কড়া বায়োমেট্রিক পরীক্ষা, গভীর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক এবং তথ্য জালিয়াতি স্ক্রিনিংয়ের মতো মানসিক ও প্রশাসনিক হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এই কঠোর নীতিমালার সবচেয়ে বড় ও নির্মম আঘাতটি আসতে চলেছে পিএইচডি এবং উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর। আমরা জানি, যুক্তরাষ্ট্রে একটি মানসম্মত পিএইচডি বা ডক্টরেট প্রোগ্রাম সফলভাবে শেষ করতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আগে যেখানে ডিউরেশন অব স্ট্যাটাসের আওতায় অতিরিক্ত কোনো কাগজের ঝামেলা বা ফেডারেল অনুমতি ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা ও ল্যাবরেটরি গবেষণা চালিয়ে যাওয়া যেত, সেখানে এখন প্রায় প্রত্যেক পিএইচডি গবেষককে কোর্সের মাঝপথেই ভিসা স্ট্যাটাস এক্সটেনশনের জন্য আবেদন করে দাপ্তরিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হবে। শুধু তাই নয়, নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীদের হুটহাট মেজর বা একাডেমিক কোর্স পরিবর্তনের সুযোগ সম্পূর্ণ সংকুচিত করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সাথে ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষার্থীদের দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন কিংবা ভিসার ক্যাটাগরি পরিবর্তনের জন্য আগে যেখানে ৬০ দিনের একটি স্বস্তিদায়ক গ্রেস পিরিয়ড বা অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ ছিল, তা এক ধাক্কায় অর্ধেকে নামিয়ে মাত্র ৩০ দিন করা হয়েছে। এই ৩০ দিনের সংকীর্ণ সময়ের মধ্যে অপশনাল প্র্যাকটিক্যাল ট্রেইনিং বা ওপিটির কাজের অনুমোদন না মিললে কিংবা পরবর্তী উচ্চতর ডিগ্রিতে ভর্তি নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়তে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারের পরিকল্পনাকে এক চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মোট ভিসা অনুমোদনের সংখ্যা ছিল ১৮ লক্ষাধিক, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১১ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া ওই একই অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ লাখের বেশি এক্সচেঞ্জ ভিজিটর এবং প্রায় ৩৭ হাজার ৩০০ জন বিদেশী সাংবাদিককে ভিসা প্রদান করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাপ্রাপ্তি ও সেখানে টিকে থাকার আইনি লড়াই তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠলেও, দেশটিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের ‘ওপেন ডোরস রিপোর্ট অন ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশনাল এক্সচেঞ্জ’-এর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে ২০ Core ১৫৬-এ দাঁড়িয়েছে, যা তার আগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ছিল ১৭ হাজার ৯৯ জন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ছয় শিক্ষাবর্ষের তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাফে ১২৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে পূর্বে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৮ হাজার ৮৩৮ জন। এই বিপুল পরিমাণ প্রবৃদ্ধি এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশী মেধার এক বিশাল অংশ মার্কিন উচ্চশিক্ষার ওপর কতটা নির্ভরশীল।
এই নজিরবিহীন নীতিগত পরিবর্তনের ফলে দেশটিতে গবেষণারত শিক্ষার্থীরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই নতুন নিয়মটি আসলে অবৈধ অভিবাসন বা অবৈধ অবস্থান নিয়ন্ত্রণের নামে বৈধ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরণের কৃত্রিম প্রশাসনিক জটিলতা ও মানসিক চাপ তৈরি করবে। এটি সরাসরি ভিসার মেয়াদ না কমালেও, যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে থাকার অনুমোদিত সময়সীমাকে এক সংকীর্ণ সীমানায় বেঁধে দিচ্ছে। সাধারণ মাস্টার্স বা স্নাতক ডিগ্রির পর শিক্ষার্থীরা সাধারণত এক বছর এবং স্টেম ফিল্ড তথা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের শিক্ষার্থীরা তিন বছর পর্যন্ত ওপিটির অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোর্স শেষ হওয়ার পর স্ট্যাটাস পরিবর্তনের জন্য মাত্র ৩০ দিন সময় পাওয়া যাবে, যা ওপিটি আবেদনের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। আন্তর্জাতিক ফুটবলের আসরে প্রিয় দলের বিদায় বা হারে কষ্ট পাওয়া যেমন স্বাভাবিক, তেমনি দেশের এই হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর হঠাৎ আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ে স্বপ্নের ক্যারিয়ার থেকে ছিটকে পড়ার নির্মম বাস্তবতার বিষয়েও আমাদের গভীরভাবে ভাবা অত্যন্ত জরুরি। সময় থাকতে এই বৈশ্বিক নীতিগত পরিবর্তনের লাল বাতির সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের আগাম সতর্ক ও বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় খাদের কিনারা থেকে এই তরুণ গবেষকদের স্বপ্নভঙ্গ ঠেকানো আর কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা