• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২০ অপরাহ্ন
Headline
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীকে অশোভনভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে: রিজভী বিএনপি জনগণের সরকার, জনগণের কল্যাণে সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে হবে : শ্রমমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমন্বিত উদ্যোগে নৌ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে: নৌপরিবহন মন্ত্রী বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর আত্মহত্যায় প্ররোচনা: এমপি গাজী নজরুলের ফের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর ৫২ সহকারী কমিশনারকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত

যে কঠোর মডেলে গ্যাংমুক্ত হলো এল সালভাদর

Reporter Name / ১ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মাত্র এক দশক আগেও মধ্য আমেরিকার ছোট্ট দেশ এল সালভাদরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে উঠত সশস্ত্র গ্যাং, রক্তপাত আর লাশের স্তূপ। ২০১৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে হত্যার হার ছিল ১০৩ জন, যা এল সালভাদরকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং বিপজ্জনক দেশের তালিকায় শীর্ষে তুলে এনেছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ভয়াবহ দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে হত্যার হার নেমে এসেছে প্রতি লাখে মাত্র ১ দশমিক ৯ জনে। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ থেকে এল সালভাদর আজ ওই অঞ্চলের অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই অভাবনীয় রূপান্তরের রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে। তার প্রবর্তিত ‘স্টেট অব ইমার্জেন্সি’ বা জরুরি অবস্থা এবং গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি দেশটির সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে এক আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে।
এল সালভাদরের এই গ্যাং সমস্যার শেকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে কয়েক দশক আগে। ১২ বছরের দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর ১৯৯২ সালে যখন দেশটিতে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তখন রাষ্ট্রকাঠামো ছিল অত্যন্ত দুর্বল। অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত এবং তরুণ সমাজের সামনে কোনো ভবিষ্যৎ ছিল না। ঠিক এমন এক ভঙ্গুর সময়ে দেশটিতে নতুন এক বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দেয় ‘এমএস-১৩’ এবং ‘ব্যারিও ১৮’ নামের দুটি কুখ্যাত গ্যাং। এই গ্যাংগুলোর জন্ম এল সালভাদরে হয়নি, বরং আশির দশকে যুদ্ধ থেকে বাঁচতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানো অভিবাসীদের মাধ্যমে লস অ্যাঞ্জেলেসের রাস্তায় এদের উৎপত্তি ঘটে। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্র সরকার অপরাধে জড়িয়ে পড়া এসব গ্যাং সদস্যদের ব্যাপকভাবে নিজ দেশে বহিষ্কার করা শুরু করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাং সংস্কৃতি মধ্য আমেরিকার এই দেশটিতে এসে আস্তানা গাড়ে। দুর্বল রাষ্ট্রকাঠামো ও বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে এই গ্যাংগুলো তরুণ সমাজের কাছে ক্ষমতা, অর্থ ও নিরাপত্তার এক বিকৃত বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়।
গ্যাংগুলোর প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা এল সালভাদরে এক সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছিল। রাজধানী সান সালভাদরসহ দেশের অধিকাংশ এলাকার নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতে। এক এলাকার মানুষ গ্যাংয়ের অনুমতি ছাড়া অন্য এলাকায় প্রবেশ করতে পারত না। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী—সবাইকে নিয়মিত গ্যাংয়ের নির্ধারিত চাঁদা বা ‘রেন্টা’ দিতে হতো। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে পরিণতি হতো নির্মম মৃত্যু। গ্যাং দমনে এল সালভাদরের পূর্ববর্তী সরকারগুলো নানা কৌশল অবলম্বন করেছিল। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ‘মানো দুরা’ বা কঠোর দমননীতি এবং পরবর্তীতে গ্যাংগুলোর সঙ্গে রাষ্ট্রের গোপন যুদ্ধবিরতি—কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদি শান্তি আনতে পারেনি। বরং গ্যাংগুলো আরও সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এল সালভাদরের ভাগ্যের চাকা মূলত ঘুরতে শুরু করে ২০১৯ সালে নায়িব বুকেলে ক্ষমতায় আসার পর। তিনি ‘প্ল্যান কন্ট্রোল তেরিতোরিয়াল’ নামের একটি নিরাপত্তা কর্মসূচি হাতে নেন। তবে সবচেয়ে বড় মোড় আসে ২০২২ সালের মার্চ মাসে। ওই মাসের শেষ দিকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে গ্যাংগুলোর চরম সহিংসতায় ৯২ জন সাধারণ মানুষের নির্মম মৃত্যু হয়। এই অভাবনীয় রক্তপাতের পর প্রেসিডেন্ট বুকেলে জাতীয় কংগ্রেসে জরুরি অবস্থা জারির প্রস্তাব করেন, যা দ্রুত পাস হয়। এই জরুরি অবস্থার অধীনে নাগরিকদের বেশ কিছু সাংবিধানিক অধিকার স্থগিত করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়।
জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকে এল সালভাদরের পুলিশ ও সেনাবাহিনী দেশজুড়ে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। গ্যাং নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তল্লাশি চালানো হয়। মানুষের শরীরে থাকা গ্যাংয়ের ট্যাটু বা সামান্য সন্দেহের বশবর্তী হয়ে হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা শুরু হয়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে শুরু করে বিগত কয়েক বছরে দেশটিতে ৮৬ হাজারের বেশি মানুষকে কারাবন্দী করা হয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক বন্দীকে রাখার জন্য সরকার ‘সিসট’ (CECOT) বা ‘সেন্টার ফর দ্য কনফাইনমেন্ট অব টেররিজম’ নামে একটি মেগা কারাগার নির্মাণ করে, যেখানে একসঙ্গে ৪০ হাজার বন্দী রাখা সম্ভব। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর নিরাপত্তার এই কারাগারটি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও কঠোর কারাগার হিসেবে পরিচিত।
প্রেসিডেন্ট বুকেলের এই কঠোর পদক্ষেপের ফল সাধারণ এল সালভাদরবাসী খুব দ্রুতই পেতে শুরু করে। গ্যাংগুলোর প্রকাশ্য নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। একসময় যে রাস্তাগুলোতে সন্ধ্যার পর বের হওয়া কল্পনারও অতীত ছিল, সেখানে আজ সাধারণ মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, পার্কে খেলাধুলা করা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিশ্চিন্তে ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পরিবহন খাতসহ স্থানীয় অর্থনীতির ওপর গ্যাংগুলোর যে পরোক্ষ কর বা চাঁদাবাজির চাপ ছিল, তা একেবারেই বিলুপ্ত হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে প্রেসিডেন্ট বুকেলে আজ এক জাতীয় বীর। গ্যাংমুক্ত নিরাপদ জীবনের স্বাদ পাওয়া এল সালভাদরের বিশাল এক জনগোষ্ঠী বুকেলের এই পদক্ষেপকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে, যার প্রতিফলন দেখা যায় তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায়।
তবে এই সফলতার আড়ালে লুকিয়ে আছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক চরম অন্ধকার দিক। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বুকেলের এই ‘নিরাপত্তা মডেল’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অভিযোগ রয়েছে, গ্রেপ্তারের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে বন্দী করা হয়েছে। কারাগারে চরম অমানবিক পরিবেশ, গাদাগাদি করে বন্দী রাখা, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন এবং বিনা বিচারে মৃত্যুর মতো অসংখ্য অভিযোগ সামনে এসেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দাবি, গ্যাংয়ের সঙ্গে বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই—এমন অনেক তরুণকে শুধু নির্দিষ্ট এলাকার বাসিন্দা হওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার করে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। যথাযথ আইনি সহায়তা না পাওয়া এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য জরুরি অবস্থা প্রলম্বিত করার কারণে দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো ও আইনের শাসন মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এল সালভাদরের এই বর্তমান পরিস্থিতি রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্রে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। শক্তির মাধ্যমে একটি অপরাধী চক্রকে সাময়িকভাবে দমন করা সম্ভব হলেও, গ্যাং সংস্কৃতি তৈরির পেছনের মূল কারণগুলো—যেমন চরম দারিদ্র্য, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো—এখনো পুরোপুরি নিরসন হয়নি। হাজার হাজার গ্যাং সদস্যকে কারাগারে বন্দী করে রাখার এই মডেল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানীদের সংশয় রয়েছে। কারণ, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাদের পুনর্বাসন বা সমাজে ফিরিয়ে আনার কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনো সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে, যেসব তরুণ একসময় গ্যাংকে নিজেদের পরিবার ভাবত, তাদের সামনে একটি সুস্থ, উৎপাদনশীল এবং সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে ভবিষ্যতে নতুন রূপে এই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটার শঙ্কা থেকেই যায়। গ্যাংমুক্ত এল সালভাদর তার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু একটি টেকসই ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণে দেশটিকে এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা স্ট্রিম


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category