অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনিক আমলে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা ও সাংবিধানিক পরিধি বাড়ানোর পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করলেও প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এখন সেই সংস্কার প্রস্তাব থেকে অনেকটাই পিছু হটছে। বিগত জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এবং বিভিন্ন নীতিনির্ধারণী ফোরামে রাষ্ট্রপতির হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা অর্পণ বা প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য আনার আলোচনা বেশ জোরালো হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপির পক্ষ থেকে পরিষ্কার করা হয়েছে যে, সংবিধানে বড় ধরনের কোনো মৌলিক পরিবর্তন এনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে দলটির ভেতরে এখন আর কোনো বড় সুনির্দিষ্ট কার্যপরিধি বা তাগিদ নেই। দলটির প্রণীত ৩১ দফার সনদেও নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্যের সাধারণ কথার বাইরে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সম্প্রসারণসংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট বা দৃশ্যমান অঙ্গীকার রাখা হয়নি।
১৯৯১ সালে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই মূলত রাষ্ট্রপতি মূলত প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ও নির্দেশ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ও কার্যাবলি পরিচালনা করে আসছেন। এমনকি রাষ্ট্রপতির প্রাত্যহিক ভাষণ বা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বক্তব্যগুলোও মূলত সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা মন্ত্রণালয় থেকেই প্রস্তুত করে দেওয়া হয়। সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যতিক্রম বাদে রাষ্ট্রপতিকে বাধ্যতামূলকভাবে মন্ত্রিপরিষদের বা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। সমালোচকরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে এই সাংবিধানিক কাঠামোগত ব্যবস্থার কারণে নির্বাহী ক্ষমতার প্রায় পুরোটাই এককভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। যদিও রাষ্ট্রপতি দেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে বহাল আছেন, তথাপি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা মূলত সরকারপ্রধানের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক আলোচনাগুলোতে প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্য তৈরির কথা উঠলে বিএনপির পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে কিছুটা ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির নীতিনির্ধারক ও স্থায়ী কমিটির একাধিক সিনিয়র নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে যে, তারা সংবিধানে বড় কোনো সংশোধনী এনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর বাস্তব কোনো সুযোগ বা প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রভাবশালী বিএনপি নেতা মন্তব্য করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি দেশের একটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বোচ্চ সাংবিধানিক অভিভাবকত্ব পদ, যেখানে জীবনের এই পর্যায়ে নতুন করে অর্জনের বা চাওয়ার কিছু থাকে না। ফলে অহেতুক সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে মনে করে দলটি। অপর এক নেতার মতে, অতীতে প্রেসিডেন্টশিয়াল বা রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থা বাংলাদেশে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছিল বলেই সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়েছিল, সুতরাং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব কেবল প্রচলিত সংবিধান ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠলে বিএনপির পক্ষ থেকে পুরো দায়টি মূলত বিরোধী দল ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বর্তানো হয়েছে। দলটির দায়িত্বশীল নেতারা জানিয়েছেন যে, সংবিধানের কাঠামোগত সংশোধনী বা ভারসাম্য আনার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে যদি অন্য রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে আলোচনায় অংশ নেয় এবং একটি জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছায়, কেবল তবেই বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। তাড়াহুড়ো করে কোনো বিতর্কিত বা একপেশে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে নয় বিএনপি, বরং তারা সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সাংবিধানিক সুব্যবস্থা গড়ে তুলতে আগ্রহী। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য সমমনা দলগুলোর রূপরেখায় এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রস্তাব থাকলেও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে বিরোধীদের আশানুরূপ সক্রিয় অংশগ্রহণ না থাকায় বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আর খুব একটা এগোয়নি।
সংবিধানের বিদ্যমান বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতির হাতে হাতে গোনা যে কয়েকটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে, তার মধ্যে বিল ফেরত পাঠানোর ক্ষমতা অন্যতম। সংবিধানের ৮০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অর্থবিল ব্যতিরেকে যেকোনো সাধারণ বিল সংসদে পুনর্বিবেচনার জন্য রাষ্ট্রপতি একবারের জন্য ফেরত পাঠাতে পারেন। অতীতে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ জননিরাপত্তা বিল এবং ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল সংসদে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। বিশ্বজুড়ে অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়; যেমন ভারতের সংবিধানে পকেট ভিটো বা পাকিস্তানের সংবিধানে সংসদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মূলত আলংকারিক ও সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার প্রতীক হিসেবেই দায়িত্ব পালন করে আসছেন।