দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রেলপথে যাতায়াতের সময় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত করতে দেশের প্রধান প্রধান রুটগুলোতে ‘ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন’ বা বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সাথে যমুনা ও পদ্মা নদীর ওপর আরও দুটি মেগা সেতু নির্মাণ এবং মহাসড়কগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনাও সংসদে পেশ করেছেন তিনি।
আজ বুধবার (১৭ই জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-১০ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলমের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তর পর্বটি টেবিলে উত্থাপিত হয়।
দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়কগুলোতে এক্সপ্রেসওয়ে গ্রিড এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সড়কে অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন বা ওভারলোড নিয়ন্ত্রণে আধুনিক ‘স্মার্ট মনিটরিং’ ও ‘এক্সেল লোড’ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।”
রাজধানীর যানজট নিরসন ও ঢাকার ওপর থেকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কমাতে চারিপাশে রিং রোড ও রেডিয়াল রোড নেটওয়ার্ক নির্মাণ করা হচ্ছে বলে জানান সরকারপ্রধান। তিনি উল্লেখ করেন, ঢাকার প্রবেশমুখ ও প্রধান ইন্টারসেকশনগুলোতে যানজটমুক্ত যাতায়াত নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি আন্ডারপাস ও ওভারপাস নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
যোগাযোগ খাতের চলমান ও ভবিষ্যৎ মেগা প্রকল্পগুলোর ফিরিস্তি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াত আরও সহজ করতে যমুনা নদীর ওপর ‘দ্বিতীয় যমুনা সেতু’ এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌ-রুটে ‘দ্বিতীয় পদ্মা সেতু’ নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এছাড়াও তালিকায় থাকা অন্যান্য মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ঢাকা-আশুলিয়া ও ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগ প্রকল্প।
পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর সেতু পর্যন্ত দৃষ্টিনন্দন দোতলা সড়ক নির্মাণ।
বরিশাল-ভোলা সড়কে কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীর ওপর দুটি বড় সেতু নির্মাণ।
শরীয়তপুর-চাঁদপুর এবং ভুলতা-আড়াইহাজার সড়কে মেঘনা নদীর ওপর মেগা সেতু নির্মাণ।
ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “বাংলাদেশ রেলওয়েকে জাতীয় পরিবহন ব্যবস্থার মূল মেরুদণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে একটি দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। রেলসেবা দেশের প্রতিটি জেলা ও প্রধান অর্থনৈতিক শহরগুলোতে পৌঁছে দিতে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত তিন মেয়াদে মোট ২৪টি মেগা প্রকল্প নির্ধারণ করা হয়েছে।” তিনি স্পষ্ট করেন, পুরো দেশের বর্তমান রেল নেটওয়ার্ককে পর্যায়ক্রমে সিঙ্গেল গেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে, যার ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ উভয় ধরনের যাত্রীবাহী ও মালবাহী ট্রেন নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারবে।
রেলের যাত্রীসেবার মান ও সক্ষমতা বাড়াতে তিন মেয়াদে মোট ২৩০টি নতুন আন্তঃনগর ও কমিউটার ট্রেন চালুর সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী:
স্বল্প মেয়াদে (২০২৬-২৭): নতুন ৩টি আন্তঃনগর এবং ১০টি কমিউটার ট্রেন যুক্ত হবে।
মধ্য মেয়াদে (২০২৭-৩০): নতুন ১৫টি আন্তঃনগর এবং ১৬টি কমিউটার ট্রেন চালু হবে।
দীর্ঘ মেয়াদে (২০৩১-৪৫): রেকর্ড ১০৩টি আন্তঃনগর এবং ৮৫টি কমিউটার ট্রেন চালুর মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, এই মহাপরিকল্পনাগুলো সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হলে দেশের সাধারণ মানুষের রেল ভ্রমণ বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ সহজ, সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও আরামদায়ক হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও সরাসরি অবদান রাখবে।