সরকারের শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলোতে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ধারাবাহিকভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ার ফলে নিয়মিত ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পথ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একটি সচিব পদে চুক্তিতে কাউকে বসালে অন্তত এক বছরের জন্য সেই পদে নতুন করে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হয়ে যায়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে প্রশাসনিক কাঠামোর নিচের স্তরের তিন থেকে চারজন কর্মকর্তার কর্মজীবনের ওপর। আগামী এক বা দুই বছরের মধ্যে যারা সচিব বা অতিরিক্ত সচিব হওয়ার অপেক্ষায় আছেন, চুক্তির মেয়াদ শেষে একই ব্যক্তিকে পুনরায় নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।
আর্থিক অপচয় ও ওএসডি কর্মকর্তাদের বোঝা
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ রাষ্ট্রের কোষাগারের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ২২ জন কর্মকর্তা চুক্তিতে জ্যেষ্ঠ সচিব বা সচিব পদে এবং নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদে আরও ১২ জন কর্মরত আছেন। ৭৮ হাজার থেকে ৮২ হাজার টাকা মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া ও গাড়ির সুবিধাসহ একজন চুক্তিভিত্তিক সচিবের পেছনে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ৩০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়। অন্যদিকে, ৭১৪ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি বা সংযুক্ত করে রাখায় তাদের পেছনে প্রতি মাসে রাষ্ট্রের প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। দায়িত্বহীন অবস্থায় রেখে বেতন দেওয়া এবং অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিতে ফেরানো—এই দুই কারণে রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতার ফারাক ও আইনি দুর্বলতা
বর্তমান সরকার প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও মেধাভিত্তিক করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরি আইনের ৪৯ ধারায় জনস্বার্থে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও এর কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। ফলে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে নিয়োগের অভিযোগ জোরালো হচ্ছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন তারিখে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র, ধর্ম, এলজিআরডি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে অবসরপ্রাপ্তদের চুক্তিতে বসানো হয়েছে। এমনকি ১৭ আগস্ট মেয়াদ শেষের দিন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবের চুক্তি আরও এক বছর বাড়ানো হয়েছে। বিগত সরকারের আমলের চুক্তি বাতিল করা হলেও নতুন করে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়ায় প্রশাসনে প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নষ্ট হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত ও সরকারের অবস্থান
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, আশির দশকে কারিগরি পদের শূন্যতা পূরণের জন্য শুরু হওয়া এই প্রথা এখন রাজনীতিকীকরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তবে সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারের মতে, বিগত সরকারের আমলে বঞ্চনার শিকার যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তাদের ফিরিয়ে আনার যৌক্তিকতা থাকলেও ঢালাও নিয়োগ প্রশাসনের স্বাভাবিক কাঠামোকে দুর্বল করবে। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এ বিষয়ে জানিয়েছেন যে, নির্বাচনি ইশতেহার ও নীতি বাস্তবায়নে কিছু অভিজ্ঞ ব্যক্তির প্রয়োজন রয়েছে। তিনি দাবি করেন, সরকার ঢালাওভাবে নয়, বরং নিতান্ত প্রয়োজনে এবং সর্বোচ্চ এক বছরের জন্যই এই ধরনের নিয়োগ দিচ্ছে।