দেশের সড়ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-থ্রি-হুইলার এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। মহাসড়ক ও শহরের প্রধান সড়কে এসব ধীরগতির বাহনের অবাধ চলাচল ট্রাফিক ব্যবস্থায় জটিলতা সৃষ্টির পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। একই সাথে গভীর রাতে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে লাখ লাখ যানবাহনের চার্জ নেওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। এই দ্বিমুখী সংকট সামাল দিতে সরকার এবার ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলারগুলোকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন, সুনির্দিষ্ট রুট বণ্টন, আধুনিক নকশা প্রণয়ন এবং অনুমোদনহীন উৎপাদন কারখানাগুলোর ওপর কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি।
সারা দেশে চলাচলকারী এই ধরনের বাহনের সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুল পরিসংখ্যান কোনো একক সরকারি দপ্তরের কাছে নেই। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রাক্কলন অনুযায়ী, দেশের সড়কগুলোতে বর্তমানে ৪৫ থেকে ৫০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক চলাচল করছে। তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই সংখ্যা প্রায় ৬০ লাখের কাছাকাছি এবং কেবল রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ২০ লাখ যান্ত্রিক থ্রি-হুইলার সক্রিয় রয়েছে। প্রচলিত প্যাডেল রিকশায় মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে রূপান্তর, নতুন কাঠামোর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং মফস্বলে চলাচলকারী ইজিবাইক—এই তিন ধরনেই মূলত যানবাহনগুলো বিস্তৃত। সনাতন প্যাডেল রিকশার নিবন্ধন ব্যবস্থা থাকলেও যান্ত্রিক থ্রি-হুইলারগুলোর কোনো বৈধ আইনি নিবন্ধন কাঠামো না থাকায় এগুলোর সংখ্যা ক্রমেই অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিপুলসংখ্যক বাহন দৈনিক প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, যা জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ। মধ্যরাতের পর সাধারণ নিয়মে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের চাহিদা এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট কমে আসার কথা থাকলেও অবৈধ চার্জিংয়ের আধিক্যের কারণে সেই চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে না। বিশেষ করে রাজধানীতে অনুমোদিত মাত্র তিন হাজার তিনশ চার্জিং পয়েন্টের বিপরীতে প্রায় ৪৮ হাজারের বেশি অননুমোদিত চার্জিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। ফলে রাষ্ট্র প্রতি বছর আনুমানিক চার হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর বাইরে নিম্নমানের রাসায়নিক ব্যাটারির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পরিবেশের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে কেবল মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা বা রিকশা ডাম্পিং করে এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অবৈধ যন্ত্রাংশ আমদানিকারক, বডি তৈরির অনুমোদনহীন কারখানা এবং বিদ্যুৎ চুরির সাথে জড়িত অসাধু চক্রের মূল উৎপাটন করতে হবে। যানবাহনগুলোকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে বরং একটি আইনি কাঠামোর অধীনে এনে চালকদের প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পরীক্ষা এবং প্রধান সড়ক বাদে ফিডার রোডে চলাচলের অনুমতি দিলে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও জনস্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হবে।
এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার বিভাগ একটি সমন্বিত আইনি ও প্রযুক্তিগত নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় সিটি কর্পোরেশন ও গ্রামীণ এলাকার জন্য পৃথক যাত্রী ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ই-রিকশার আধুনিক ও নিরাপদ নকশা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। রাজধানী ঢাকাকে আটটি পুলিশ জোনে ভাগ করে ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন নম্বরের আওতায় এসব যান পরিচালনার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতিটি বাহনে জিপিএস ট্র্যাকার ও জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি সংযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে এক এলাকার যানবাহন অন্য এলাকার প্রধান সড়কে প্রবেশ করতে না পারে।
একই সাথে প্রচলিত আইন সংশোধন করে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়ে সমন্বিত লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ গঠনের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি অনিবন্ধিত কারখানা বন্ধে সুনির্দিষ্ট উৎপাদন কেন্দ্র নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানি বা জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে সৌরচালিত চার্জিং ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হওয়ার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে সড়কের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা এবং জ্বালানি খাতের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।