• বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:২৬ অপরাহ্ন
Headline
সাবেক ৭ এমপির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা, ৩ জনকে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কুশল বিনিময় তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমুদ্রের তলদেশে আটকা ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না পরিমাণে বেশি, আয়ে কম: হাতছাড়া হচ্ছে উচ্চমূল্যের বিশাল বাজার

সমুদ্রের তলদেশে আটকা ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ

Reporter Name / ১ Time View
Update : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশে দ্রুতগতির ও সুলভ ইন্টারনেটের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে যখন নতুন সাবমেরিন ক্যাবলের কোনো বিকল্প নেই, ঠিক তখনই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশের প্রথম বেসরকারি সাবমেরিন ক্যাবল প্রকল্প। তিন বছর ধরে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অভাবে বঙ্গোপসাগরের তলদেশে আটকে আছে দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার এই বিশাল বিনিয়োগ। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের আপামর ইন্টারনেট গ্রাহক এবং বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির ওপর। কারণ, এই প্রকল্পের কাজ যথাসময়ে শেষ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ আমদানির পরিমাণ ব্যাপক হারে বাড়াতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ গ্রাহকরা যেমন সুলভ মূল্যে নিরবচ্ছিন্ন দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি প্রতি বছর বিদেশি মুদ্রারও বিপুল অপচয় হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের মোট ইন্টারনেট চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই আসছে ভারত থেকে আমদানি করা স্থলভাগের ব্যান্ডউইথের মাধ্যমে। গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমদানির এই হার সর্বোচ্চ। এর আগে ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির হার ছিল প্রায় ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্প্রতি সাবমেরিন ক্যাবল স্থাপনের চূড়ান্ত ধাপটি স্থগিত করে এবং একই সাথে ভারত থেকে ব্যান্ডউইথ আমদানির সর্বোচ্চ সীমা মোট চাহিদার ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনে। কিন্তু ব্যান্ডউইথ আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট এই সীমার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। ফলে ভারতের ওপর ইন্টারনেট নির্ভরতা কমার বদলে উল্টো আরও বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল সক্ষমতা ও নিরাপত্তার জন্য এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেটাকোর সাবকম, সামিট কমিউনিকেশনস এবং সিডিনেট কমিউনিকেশনস—এই তিনটি দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ৫১ টেরাবিট পার সেকেন্ড (টিবিপিএস) সক্ষমতার তিনটি অত্যাধুনিক সাবমেরিন ক্যাবল চালুর কথা ছিল। ২০২৫ সালের মার্চের মধ্যে প্রকল্পটি পুরোপুরি চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আগস্টের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরও তা আলোর মুখ দেখেনি। সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে কক্সবাজার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কনসোর্টিয়াম ক্যাবলের সাথে যুক্ত হতে ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রাঞ্চ ক্যাবল স্থাপনের জন্য ভাড়া করা জাহাজ এবং বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুত রয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর চূড়ান্ত ছাড়পত্র বা অনাপত্তিপত্র (এনওসি) না পাওয়ায় জাহাজগুলো বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করতে পারছে না। আর ঠিক এই জায়গাতেই আটকে আছে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই মেগা প্রকল্পটি।
মেটাকোর সাবকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আমিনুল হাকিম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র এখনও ঝুলন্ত অবস্থায় থাকায় ক্যাবল স্থাপনের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) যথাযথ অনুমোদন নিয়েই তারা এই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করেছেন, তাই সরকারে কে আছেন বা কে নেই তার ওপর ভিত্তি করে এই ধরনের ব্যবসায়িক হয়রানি মোটেও কাম্য নয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ জুলাই ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ (পিটিডি) থেকে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং এনএসআই প্রধানের কাছে ‘অতীব জরুরি ও গোপনীয়’ চিহ্নিত একটি বিশেষ চিঠি পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে ফাইবার স্থাপনকারী জাহাজ ‘সিএস ব্লু’ এবং ‘এনডেভার’-এর আগমনের জন্য কোনো ধরনের অনাপত্তিপত্র দেওয়া থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
পিটিডি তাদের ওই চিঠিতে দাবি করেছে যে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানি পিএলসিকে (বিএসসিপিএলসি) আর্থিকভাবে সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। এছাড়া বেসরকারি অপারেটররা লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিয়েছে এবং এর সাথে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তবে মেটাকোরের সিইও আমিনুল হাকিম লাইসেন্স লঙ্ঘনের এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানান, দেশে যখন বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট চলছিল, তখন বিটিআরসির পরামর্শ ও আনুষ্ঠানিক অনুমোদন সাপেক্ষেই তিনটি কোম্পানি তাদের ক্যাবলের বাইরের আবরণ বা কোটিংটি একত্রিত করেছিল। এটি পুরো ক্যাবল একীভূত করা নয়, বরং ডলার বাঁচাতে নেওয়া একটি যৌক্তিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ ছিল। সরকারের একটি শাখা অনুমোদন দেওয়ার পর অন্য একটি শাখা যদি সেটির বিরোধিতা করে, তবে বিনিয়াগকারীরা কোথায় যাবে—এমন যৌক্তিক প্রশ্নও তোলেন তিনি।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, সাবমেরিন ক্যাবল ব্যবসায় রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া আধিপত্য বা মনোপলি ধরে রাখতেই পিটিডি ইচ্ছাকৃতভাবে বেসরকারি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। আমিনুল হাকিম দাবি করেন, বিএসসিপিএলসি এই মনোপলি বাজারের একচেটিয়া সুবিধা ভোগ করছে। ২০০৮ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ৭ দশমিক ২ টিবিপিএস সক্ষমতার জন্য মাত্র ৮২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার বেশি নিট মুনাফা অর্জন করেছে। তাদের নিট মুনাফার হার প্রায় ৪৫ শতাংশ, যা যেকোনো মানদণ্ডেই একটি বিরল ঘটনা এবং এটি সাধারণ মানুষকে সাশ্রয়ী মূল্যের ইন্টারনেট থেকে বঞ্চিত করার প্রমাণ। এছাড়া বিএসসিপিএলসির কর্মীরা সরকারি লভ্যাংশের বাইরেও ৭২ কোটি টাকার বেশি মুনাফার ভাগ পেয়েছেন বলে উদ্যোক্তারা অভিযোগ করেন। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা বলছেন, তারা দেশের স্বাভাবিক ব্যবসায়িক পরিবেশ অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত মুনাফাতেই ইন্টারনেট সেবা দিতে প্রস্তুত।
দেশে বর্তমানে সাবমেরিন ক্যাবলের যে একচেটিয়া বাজার রয়েছে, সেখানে বিএসসিপিএলসির অধীনে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইথের দাম পড়ছে ১২০ টাকা। অথচ বেসরকারি ক্যাবলগুলো চালুর সুযোগ দিলে এই দাম অনায়াসেই ৬০ থেকে ৭০ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। ভিয়েতনামে যেখানে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের পেনিট্রেশন রেট ২৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা মাত্র ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ভিয়েতনাম ৬টি, ভারত ২০টির বেশি, মালয়েশিয়া ২৪টির বেশি এবং থাইল্যান্ড ১২টির বেশি সাবমেরিন ক্যাবলের সাথে যুক্ত থাকলেও, বাংলাদেশ বিএসসিপিএলসির মাধ্যমে মাত্র দুটি ক্যাবলের সাথে যুক্ত। সামনের বছর ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে ‘এসএমডব্লিউ ৬’ ক্যাবলের মাধ্যমে সরকার আরও ৩৪ টিবিপিএস সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। কিন্তু দেশের ডিজিটাল রূপকল্প অনুযায়ী ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৪২০ থেকে ৪৫০ টিবিপিএস ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হবে, যা এককভাবে কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মেটানো অসম্ভব।
সিডিনেটের সিইও মশিউর রহমান জানান, ভারত থেকে বিপুল পরিমাণ ব্যান্ডউইথ আমদানিই এখন দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। গত তিন বছরে ব্যান্ডউইথ আমদানির পেছনে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে বেসরকারি কনসোর্টিয়ামের চেয়েও বেশি সক্ষমতার একটি নিজস্ব সাবমেরিন ক্যাবল তৈরি করা সম্ভব ছিল। অন্যদিকে, পিটিডি সচিব একই সাথে বিএসসিপিএলসির বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করায় এখানে বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হচ্ছে বলে উদ্যোক্তারা মনে করছেন। যদি এই একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে এবং আমদানির সীমা কার্যকর না হয়, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশের মোট চাহিদার ৯০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় এমন একটি গুঞ্জন উঠেছিল যে, এশিয়ান ক্যাবল সিস্টেমটির বিষয়ে হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি থাকতে পারে। তবে বর্তমানে সেই যুক্তির আর কোনো ভিত্তি নেই। কারণ বেসরকারি কনসোর্টিয়াম ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে যে, সিঙ্গাপুরের সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য ব্যবহৃত সমস্ত সক্রিয় সরঞ্জাম বা অ্যাকটিভ ইকুইপমেন্ট পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকেই সংগ্রহ করা হয়েছে। মেটা বা গুগলের মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে ডেটা সেন্টার বা ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিশাল বিনিয়োগ করতে চায়, যার আকার ২ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের বিনিয়োগের জন্য নিরবচ্ছিন্ন এবং ৫০ টিবিপিএসের বেশি উচ্চমানের ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া বাজার দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সাগরে ক্যাবল স্থাপনের কাজটি শীতকালেই করতে হয়, কারণ এ সময় সাগর শান্ত থাকে। আগামী এক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন না পেলে ক্যাবল স্থাপনের আরও একটি মৌসুম হাতছাড়া হবে, যা বিনিয়োগকারীদের ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে জরিমানাসহ বিশাল আর্থিক ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন বাঁচাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীরা।

 

তথ্যসূত্র: ডেইলি টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category