ব্যক্তিমালিকানার খাস জমির পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধে চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। ভূমি সংস্কার বোর্ডের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশে ভূমি উন্নয়ন করের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে শুধু সরকারি ও বিভিন্ন সংস্থার কাছেই পাওনা রয়েছে প্রায় ৫৫৬ কোটি টাকা। বিপুল অঙ্কের এই রাজস্ব অনাদায়ী পড়ে থাকায় এবার কঠোর পদক্ষেপে যাচ্ছে সরকার। অনাদায়ী কর আদায়ে প্রভাবশালী ও বড় ভূমি মালিকদের চিহ্নিত করে লাল নোটিশ জারি, সার্টিফিকেট মামলা দায়ের, বিশেষ ক্যাম্প স্থাপন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাসহ একগুচ্ছ সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয়।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক বিশেষ নীতিগত সভায় বকেয়া আদায়ের এই কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়। সভায় উপস্থিত কর্মকর্তা ও মাঠ প্রশাসনের বিবরণ অনুযায়ী, দেশে ভূমি উন্নয়ন কর বাবদ মোট পাওনার পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকারও বেশি, যার বিপরীতে এখন পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৯১৪ কোটি টাকা। অবশিষ্ট বিশাল অঙ্কের বকেয়ার একটি বড় অংশ সাধারণ করদাতাদের কাছে থাকলেও সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর বাজেট বরাদ্দের অজুহাত এবং নামজারি না করার অবহেলা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। বিশেষ করে ঢাকা, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও যশোরের মতো শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলগুলোতে রাজস্ব আদায়ের হার প্রত্যাশার তুলনায় অত্যন্ত হতাশাজনক।
মাঠ পর্যায়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সাধারণ করদাতাদের সচেতন করার নানাবিধ উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রভাবশালী চক্র ও সরকারি সংস্থাগুলো বিষয়টিকে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা করে আসছে। তবে বরগুনা, পঞ্চগড় ও গোপালগঞ্জের মতো কিছু জেলা জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে কর আদায়ে প্রশংসনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কেবল সচেতনতা বাড়িয়ে অনাদায়ী রাজস্ব উদ্ধার সম্ভব নয়। তাই এখন থেকে কর বকেয়া থাকলে জমি হস্তান্তর, বিক্রি, বন্ধক রাখা এমনকি ভবনের নকশা অনুমোদনের ওপর আইনি বিধিনিষেধ কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে।
নিয়মিত কর পরিশোধকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারকেরা সতর্ক করেছেন যে, দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখতে হলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় পক্ষকেই বকেয়া পরিশোধে বাধ্য করা হবে। রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সব খাতেই কর শৃঙ্খলার মেলবন্ধন ঘটাতে এবার লাল নোটিশ ও সরকারি আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে এই বকেয়ার পাহাড় ভাঙার পরিকল্পনা করছে প্রশাসন।