• রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন
Headline
বাংলাদেশের মতো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্বে আর কোথাও নেই: রাষ্ট্রপতি সওজের ৪০০ স্থাপনায় বসছে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল রুফটপ সোলারে অর্থায়নে ইডকল ও সরকারের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি জাল সনদ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চায় এপিইউবি ৩২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেল ২৫৩ ইউনিয়ন পরিষদ বিএনপির মুখে হচ্ছে জুলাই সনদ আর অন্তরে আ. লীগ: হাসনাত ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলো গ্রামীণ কল্যাণ সেনাসদস্যদের ‘ওয়ান র‍্যাংক ওয়ান পেনশন’ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াধীন: সাভারে প্রধানমন্ত্রী অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার ব্যাখ্যা দিলেন ইশরাক হোসেন পিস্তল হাতে অভিযানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক, আইনের ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা: ডিবিপ্রধান

সরকারি হিসাবের চেয়ে দেশে হামে মৃত্যু ও আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা বহুগুণ বেশি: পরিসংখ্যানে বিশাল গরমিল

Reporter Name / ১০২ Time View
Update : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬

বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু ও আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) দেওয়া সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। সম্প্রতি বিভিন্ন বিভাগের স্থানীয় ডেটা, হাসপাতালের রেকর্ড এবং স্থানীয় স্বাস্থ্য প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করে সরকারি কেন্দ্রীয় প্রতিবেদনের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির এক বিশাল ফারাক বা গরমিল লক্ষ্য করা গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় নিজেদের কাঠামোগত ব্যর্থতা আড়াল করতে এবং জনরোষ বা সমালোচনা এড়াতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইচ্ছাকৃতভাবে মৃত্যু এবং সংক্রমণের তথ্য কমিয়ে দেখাচ্ছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তথ্য গোপনের এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত দুর্বলতার কারণেই মূলত এই ধরনের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হয়েছে।


বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ভয়াবহ অসামঞ্জস্যতা

কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় তথ্যের মধ্যে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে, তা কয়েকটি বিভাগের দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

  • রংপুর বিভাগ: গত শনিবার পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল যে, রংপুর বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে বা হামের উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। কিন্তু ওই একই সময়ে রংপুরের স্থানীয় হাসপাতাল ও প্রশাসনিক রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, সেখানে অন্তত চারজন শিশু হাম বা এর উপসর্গে মারা গেছে।

  • বরিশাল বিভাগ: একই ধরনের ভয়াবহ অসামঞ্জস্যতা পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগের পরিসংখ্যানেও। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় তথ্যে বলা হয়েছে, বরিশালে হামের উপসর্গ নিয়ে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ৯ জন। অথচ স্থানীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের রেকর্ডে দেখা যাচ্ছে, সেখানে উপসর্গ নিয়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ৩ জন।

  • ময়মনসিংহ বিভাগ: সবচেয়ে বড় গরমিল দেখা গেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, সেখানে হাম বা হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মাত্র তিনজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হিসাব বলছে, শুধুমাত্র ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই হামের উপসর্গ নিয়ে ২৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

  • আক্রান্তের সংখ্যায় ব্যবধান: মৃত্যুর সংখ্যার পাশাপাশি আক্রান্তের পরিসংখ্যানেও রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ময়মনসিংহে সন্দেহভাজন হামের রোগী ৯১১ জন এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া রোগী ৩৯ জন। বিপরীতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নথিপত্রে সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ১,৮৭৪ জন এবং নিশ্চিত হওয়া রোগীর সংখ্যা ১১২ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যান্য বিভাগগুলোতেও কমবেশি এ ধরনের তথ্যের অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা গেছে।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্যাখ্যা বনাম বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ

তথ্যের এই বিশাল ফারাকের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) পরিচালক ডা. আবু আহম্মদ আল মামুন একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। তিনি বলেন, “তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় বা রিপোর্টিং চেইনে কিছু দুর্বলতা থাকার কারণে পরিসংখ্যানে এমন অসামঞ্জস্যতা দেখা দিতে পারে।” তবে তিনি তথ্য গোপনের অভিযোগটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

তাঁর মতে, “আমরা সিভিল সার্জন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের পাঠানো প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিভাগীয় পরিচালকদের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে থাকি। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো আমাদের কাছে নিয়মিতভাবে তাদের প্রতিবেদন পাঠায় না, যার কারণে কেন্দ্রীয় তথ্যে এই ঘাটতি তৈরি হয়।”

অন্যদিকে, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ফয়জুল হাকিম লালা এই ব্যাখ্যার সঙ্গে তীব্র দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেন, সরকারি সংস্থাগুলো প্রায়শই সঠিক তথ্য গোপন করে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার চেষ্টা করে, যা শেষ পর্যন্ত জনস্বাস্থ্য সংকটকে আরও ভয়াবহ রূপ দেয়।

তিনি বলেন, “চলতি বছরের শুরুতে কক্সবাজারে যখন প্রথম হামের রোগী শনাক্ত হয়, তখন কর্তৃপক্ষ জনগণকে সে বিষয়ে সঠিকভাবে জানায়নি বা সতর্ক করেনি। রাজশাহীতে শিশু মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরই বিষয়টি সবার নজরে আসে।” তিনি আরও যোগ করেন, “তথ্য গোপন করার ফলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয় না এবং সরকারের দিক থেকেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হয়। এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।”


সরকারি মোট পরিসংখ্যান ও ল্যাবরেটরি পরীক্ষার ঘাটতি

গত ১৫ মার্চ থেকে দেশব্যাপী হামের আনুষ্ঠানিক হিসাব রাখা শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তাদের শনিবারের তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হাম এবং হামের মতো উপসর্গের কারণে মোট ৩৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে মোট সংক্রমণের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪,৬৩৫ জনে।

অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এই ৩৫২ জনের মধ্যে ৬১ জনের মৃত্যু হয়েছে ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত হওয়া হামের কারণে। আর ৫৪,৬৩৫ জন আক্রান্তের মধ্যে ৬,৯৭৯ জনের শরীরে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে হামের ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেছে। বাকি মৃত্যু ও সংক্রমণের ঘটনাগুলোকে ‘হামের মতো উপসর্গ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা অবশ্য যুক্তি দিয়েছেন যে, মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা এই সরকারি হিসাবের চেয়ে আরও অনেক বেশি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, সন্দেহভাজন অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করা হচ্ছে না বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেই সুযোগ নেই। ল্যাবরেটরি কনফার্মেশন না থাকার কারণে অনেক মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সরকারি নথির আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।


কেন এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব?

চলতি বছর বাংলাদেশে হামের এই ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের পেছনে টিকাদান কর্মসূচির কভারেজ বা আওতা কমে যাওয়া এবং গত কয়েক বছরে এই কার্যক্রমে তৈরি হওয়া বিঘ্নকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের (UNICEF) মতে, যখন কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় টিকাদানের হার ‘হার্ড ইমিউনিটি’ থ্রেশহোল্ড অর্থাৎ ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তখনই হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।

  • বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) একসময় এর শক্তিশালী ও কার্যকর কাঠামোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত ও স্বীকৃত ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে এই কর্মসূচিতে নানাবিধ অপারেশনাল বা কার্যক্ষমতায় বিঘ্ন, তহবিলের মারাত্মক ঘাটতি এবং কাঠামোগত ধাক্কা লেগেছে। ফলে অসংখ্য শিশু টিকার আওতার বাইরে থেকে গেছে, যার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে।


জরুরি টিকাদান কর্মসূচি ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস

হামের এই ভয়াবহ বিস্তার রোধ করতে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে পর্যায়ক্রমে দেশব্যাপী হাম-রুবেলার (MR) টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় এই কর্মসূচি শুরু করা হলেও পরবর্তীতে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে ইতোমধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া সম্পন্ন হয়েছে।

তবে এই টিকার সুফল পেতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী জানান, চলমান এই টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত প্রভাব দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে। তিনি বলেন, “টিকা দেওয়ার পর শরীরে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি তৈরি হতে প্রায় ২০ দিনের মতো সময় লাগে। যদি এই টিকাদান কর্মসূচিটি কার্যকরভাবে এবং শতভাগ সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে আমরা আশা করছি মে মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে সংক্রমণের হার ধীরে ধীরে কমতে শুরু করবে।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category