বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ, উপবৃত্তি প্রদানের মতো বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বহাল থাকা সত্ত্বেও দেশের শিক্ষা খাতে ঝরে পড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। প্রাথমিক স্তর থেকে শুরু করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সব ধাপেই প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে প্রতি তিনজনে একজন শিক্ষার্থী শিক্ষা জীবন শেষ করার আগেই ঝরে পড়ছে, যার মধ্যে সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে এই হার সবচেয়ে বেশি। একই সাথে প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব বলছে, ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের মধ্যে শিক্ষাঙ্গন ত্যাগ করার প্রবণতা অধিক। শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) এবং বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক তথ্য বিশ্লেষণ করে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার এই করুণ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
শিক্ষা খাতের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় ঘটছে উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি ও সমমানের স্তরে। এই স্তরে সামগ্রিকভাবে ঝরে পড়ার হার দাঁড়িয়েছে ৩৫.৯৮ শতাংশ। আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সর্বশেষ উপাত্ত অনুযায়ী, মাধ্যমিক (এসএসসি) পরীক্ষা উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ একাদশ শ্রেণিতে পা রাখার আগেই ঝরে যায়। তথ্য অনুযায়ী, ১ লাখ ৫৭ হাজার ২৫১ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করার পরও একাদশ শ্রেণিতে আর নাম নিবন্ধন করেনি। এর পরবর্তী ধাপে একাদশে ভর্তি হয়েও প্রায় ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৩০৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেনি। ফলে মাধ্যমিক পাসের পর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৫ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৫ জন শিক্ষার্থী শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে চলে গেছে।
বোর্ডভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের তুলনায় কারিগরি ও মাদ্রাসা বোর্ডে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩৯.৯৬ শতাংশ এবং মাদ্রাসা বোর্ডের আলিম শ্রেণিতে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের ৩৮.৬৪ শতাংশ ফরম পূরণ না করে ঝরে পড়েছে। অন্যদিকে সাধারণ বোর্ডগুলোতে এই হার ৩৩.০৩ শতাংশ। পরীক্ষা প্রক্রিয়ার প্রস্তুতিহীনতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে ফরম পূরণের হার কমে থাকতে পারে বলে শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধারণা করা হলেও, সামগ্রিক সূচকটি শিক্ষা খাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিটের মাধ্যমে গবেষণা কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাস্তরেও ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পাওয়া রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ডিপিই-এর বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৩.১৫ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬.২৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে ছেলেদের মধ্যে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ১৯.০২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১৪.১২ শতাংশ। অন্যদিকে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ১২.৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩.৩৬ শতাংশ হয়েছে। জীবনের প্রাথমিক ধাপেই অর্থনৈতিক চাপ ও শিশুশ্রমের মুখোমুখি হওয়ায় শিশুরা ওপরের শ্রেণিতে ওঠার আগেই বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মূল্যস্ফীতি, পরিবারের আর্থিক অনটন, অপ্রাপ্তবয়সে শ্রমবাজারে প্রবেশ এবং বাল্যবিবাহই শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। এর পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বাস্তুচ্যুতি শিক্ষা ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অন্তত ১ লাখ ২ হাজার ১৫ জন শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, যার মধ্যে ৬১.০৮ শতাংশই কন্যাশিশু। এ ছাড়া শিক্ষার গুণগত মান হ্রাস পাওয়া, যাতায়াত ব্যবস্থার অসুবিধা এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনা চালাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তর এখনো সম্পূর্ণ অবৈতনিক না হওয়ায় শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি প্রাক-প্রাপ্তবয়স্কদের ঝরে পড়ার বড় কারণ। জাতিসংঘ নির্ধারিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য উপবৃত্তির পরিমাণ মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ানো, স্কুল ফিডিং কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং পর্যায়ক্রমে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ অবৈতনিক করার সুপারিশ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যালয়বহির্ভূত শিশুদের ফিরিয়ে আনতে পোশাক ও অন্যান্য বস্তুগত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শিক্ষার এই ধারাবাহিক অপচয় রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে।