পবিত্র রমজান মাসকে সামনে রেখে নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল করার এক অভিনব কৌশলের অভিযোগ উঠেছে দেশের শীর্ষ আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে। স্থলভাগের গুদামের পরিবর্তে এখন গভীর সাগরকে বেছে নেওয়া হয়েছে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে। অভিযোগ রয়েছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অদূরে গভীর সাগরে ভাসিয়ে রাখা হয়েছে প্রায় ৭০০ জাহাজ, যার মধ্যে রয়েছে ১০ লাখ টনেরও বেশি সার ও ভোগ্যপণ্য।
ভাসমান গুদাম: সিন্ডিকেটের নতুন কৌশল
এক সময় আমদানিকারকরা পণ্য খালাস করে নিজস্ব গুদামে মজুদ করতেন। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার নজরদারি এড়াতে গত ৫-৬ বছর ধরে লাইটার জাহাজগুলোকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। স্বাভাবিক অবস্থায় একটি লাইটার জাহাজ ১৫ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করে পরবর্তী ট্রিপের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে এসব জাহাজ ৩০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত সাগরে অলস বসিয়ে রাখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই বিলম্ব ইচ্ছাকৃত। রমজানের আগে বাজারে পণ্যের সরবরাহ কমিয়ে দাম বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি করা হয়েছে।
সাগরে কী ভাসছে?
বর্তমানে গভীর সাগরে ১৭৬টি মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) নোঙর করা আছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক জাহাজে রয়েছে গম, ভুট্টা, ছোলা, চিনি, তেল ও সয়াবিনের মতো জরুরি খাদ্যপণ্য, যা রমজানে অত্যধিক চাহিদাসম্পন্ন। অথচ এই পণ্যগুলো সময়মতো বাজারে প্রবেশ না করায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আমদানিকারকদের অজুহাত
পণ্য খালাসে ধীরগতির বিষয়ে আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে ভিন্ন যুক্তি দেখানো হচ্ছে। মিউচুয়াল শিপিং লিমিটেডের পরিচালক জোনায়েদ আহমেদ রাহাত দাবি করেন, সাইলো বা গুদামের ধারণক্ষমতার তুলনায় রমজানের আগে হঠাৎ আমদানি বেড়ে যাওয়ায় এই জট তৈরি হয়েছে। এছাড়া আনলোডিং বা খালাস প্রক্রিয়া আধুনিক না হওয়ায় সময় বেশি লাগছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পর্যাপ্ত লাইটার জাহাজের সংকটকেও তারা কারণ হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
প্রশাসনের আল্টিমেটাম ও অভিযান
রমজানে বাজার স্বাভাবিক রাখতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। নৌ-বাণিজ্য দপ্তরের প্রিন্সিপাল অফিসার ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ জানান, সাগরে ভাসমান জাহাজগুলোকে পণ্য খালাসের জন্য ৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা ফিজিক্যালি জাহাজগুলোতে গিয়ে পরিদর্শন করছেন এবং দ্রুত পণ্য খালাসের নির্দেশ দিচ্ছেন।
তবুও শঙ্কা কাটছে না। সাগর পথের এই ‘ভাসমান গুদাম’ কৌশল যদি কঠোর হাতে দমন করা না যায়, তবে আসন্ন রমজানে সাধারণ মানুষকে চড়া দামে পণ্য কিনতে হতে পারে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।