সম্পদের মোহ আর ক্ষোভ মানুষের হিতাহিত জ্ঞান কতটা কেড়ে নিতে পারে, তার এক ভয়ংকর ও মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে। সামান্য কয়েকটি গাছের মালিকানা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জেরে আপন বড় ভাইয়ের ছোড়া শটগানের গুলিতে প্রাণ হারালেন ছোট ভাই। বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বোয়ালমারী পৌর সদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের চতুল উত্তরপাড়া এলাকায় এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম হুমায়ুন কবির মিন্টু, যার বয়স ৫৫ বছর। আর এই হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্ত মূল হোতা তারই আপন বড় ভাই ডা. গোলাম কবীর, যিনি সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এবং বর্তমানে জেলা কৃষক লীগের সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই রক্তপাতের নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের পুরনো এক পারিবারিক জমির বিরোধ। পৌরসভার চতুল উত্তরপাড়া গ্রামের কাওছার শেখের বাড়ির পাশে তাদের প্রায় ৪০ শতাংশ পৈতৃক জমি রয়েছে। এই জমির বাঁটোয়ারা নিয়েই দুই ভাই গোলাম কবীর ও মিন্টুর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। পারিবারিক সমঝোতার একপর্যায়ে ওই জমির মধ্য থেকে ৭ শতাংশ তাদের আরেক ভাই কাওছার শেখের নামে লিখে দেওয়া হয়। কিন্তু বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় বাকি জমিতে লাগানো গাছগুলো। অভিযোগ রয়েছে, ছোট ভাইদের কোনো রকম তোয়াক্কা না করেই বড় ভাই ডা. গোলাম কবীর সম্পূর্ণ একক সিদ্ধান্তে প্রায় ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে ওই জমির সব গাছ বিক্রি করে দেন।
বুধবার সকালে সেই বিক্রি করা গাছগুলো কাটতে লোকজন এলে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। ছোট ভাই হুমায়ুন কবির মিন্টু নিজের অধিকার দাবি করে গাছ কাটতে সরাসরি বাধা প্রদান করেন। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে তীব্র বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। কথার একপর্যায়ে ক্ষোভে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন ডা. গোলাম কবীর। তিনি দ্রুত নিজের বাড়িতে ছুটে যান এবং একটি শটগান এনে ছোট ভাইকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করেন। মুহুর্মুহু এই গুলিবর্ষণে মিন্টুর বুক ও কোমরে গুলি বিদ্ধ হয় এবং তিনি রক্তপাতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বোয়ালমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক আন্না সুলতানা জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মিন্টুর মৃত্যু হয়েছে। তার শরীরে বুক এবং কোমরের অংশে গুলির স্পষ্ট ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে। এই চাঞ্চল্যকর ও মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি চোখের সামনে ঘটতে দেখেছেন তাদের আরেক ভাই আলমগীর কবীর। চরম শোকাহত ও হতবাক আলমগীর আক্ষেপ করে বলেন, সামান্য কিছু গাছের জন্য বড় ভাই যে ছোট ভাইকে এভাবে নিজের হাতে গুলি করে হত্যা করতে পারেন, তা তাদের কল্পনারও অতীত ছিল। এদিকে, প্রত্যক্ষদর্শী বিলায়েত হোসেন মৃধা জানান, গুলির বিকট শব্দ শুনে তিনিসহ আশপাশের লোকজন দৌড়ে বাইরে আসেন। তখন তারা দেখতে পান যে ছোট ভাইকে গুলি করার পর ডা. গোলাম কবীর সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে ধাওয়া করে আটকে ফেলে এবং পরে পুলিশের হাতে সোপর্দ করে।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ বিষয়ে ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (মধুখালী-বোয়ালমারী-আলফাডাঙ্গা সার্কেল) আজম খান গণমাধ্যমকে জানান, পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং প্রাথমিক তদন্তে গাছ কাটাকে কেন্দ্র করেই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযুক্ত ডা. গোলাম কবীরকে আটক করেছে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত শটগানটিও জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। পুনরায় যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে জন্য ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানান তিনি।