যানজট আর যান্ত্রিক কোলাহলে মুখর রাজধানী ঢাকা হঠাৎ করেই যেন এক স্থবিরতার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। শহরের স্বাভাবিক ছন্দপতন ঘটিয়ে গাড়ির চাকা এখন থমকে আছে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোর সামনে। বুধবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব ও চরম ভোগান্তির চিত্র। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য অপেক্ষমাণ যানবাহনের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি। তেলের তীব্র সরবরাহ সংকটের কারণে চালক ও সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে চরম হতাশা এবং ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, রাজধানীর বেশিরভাগ ফিলিং স্টেশন ইতিমধ্যে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। যেসব পাম্প খোলা রয়েছে, সেগুলোতেও প্রয়োজনের তুলনায় তেলের সরবরাহ একেবারেই নগণ্য। ডিপো থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল না আসায় পাম্প কর্তৃপক্ষ গ্রাহকদের ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে যখন একজন চালক জানতে পারছেন যে পাম্পে তেল নেই, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। গ্রাহকদের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ থেকে যেন কোনো ধরনের ভাঙচুর বা অপ্রীতিকর ঘটনার সৃষ্টি না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখছে প্রশাসন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিশৃঙ্খলা এড়াতে রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফিলিং স্টেশনে ইতিমধ্যেই পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
তেলের আশায় পাম্পে আসা চালকদের চোখেমুখে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা আর ক্লান্তির ছাপ। কেউ কেউ হতাশ হয়ে শূন্য ট্যাঙ্ক নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন, আবার অনেকেই এই আশায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন যে হয়তো কিছুক্ষণ পরই তেলের গাড়ি এসে পৌঁছাবে। সকালে তেলের খোঁজে বের হওয়া এক প্রাইভেটকার চালক আক্ষেপের সুরে জানান, তিনি সকাল থেকে শহরের অন্তত তিনটি পাম্পে ঘুরেছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো একটি পাম্প থেকেও এক ফোঁটা তেল সংগ্রহ করতে পারেননি।
একই রকম চরম হতাশার কথা জানিয়েছেন দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা এক মোটরসাইকেল চালক। তার ভাষ্যমতে, তিনি প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে একটি পাম্পের সামনে অপেক্ষা করছেন। তার সামনে থাকা বিশাল লাইন কখন শেষ হবে এবং তিনি আদৌ তেল পাবেন কি না, তা নিয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছেন। ক্ষুব্ধ এই চালক বলেন, সরকারি পর্যায় থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পাম্পে এসে তারা তেলের কোনো দেখাই পাচ্ছেন না। সাধারণ মানুষের মনে তাই প্রশ্ন জেগেছে, মজুত যদি থেকেই থাকে, তবে পাম্পগুলো কেন শূন্য?
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষের দাবি, এই সংকটের পেছনে তাদের কোনো হাত নেই। মূল সমস্যাটি তৈরি হয়েছে তেলের ডিপোগুলো থেকে। সেখান থেকে পাম্পগুলোতে নিয়মিত তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না বলেই এই হাহাকার শুরু হয়েছে। ঢাকার পরিচিত ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সহকারী পরিচালক মেজর (অব.) মো. আমজাদ হোসাইনের কথায়ও এই অসহায়ত্বের সুর শোনা যায়। তিনি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, বর্তমানের এই তীব্র সংকটের সময়ে সাধারণ মানুষ যখন দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও তেল পান না, তখন তারা স্বাভাবিকভাবেই বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। ক্ষুব্ধ জনতা অনেক সময়ই বুঝতে চান না যে পাম্প কর্তৃপক্ষের কাছে আসলেই বিক্রির মতো কোনো তেল মজুত নেই। এই ভুল বোঝাবুঝি থেকে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, মূলত সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই পাম্পে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি প্রয়োজন হয়েছে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশেরও সার্বিক সহযোগিতা নিচ্ছেন তারা।
জ্বালানি তেলের এই আকস্মিক ও তীব্র সংকটের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সমগ্র রাজধানীর গণপরিবহন খাতে। বাস, মিনিবাস ও অন্যান্য ভাড়ায় চালিত যানবাহনগুলো জ্বালানির অভাবে রাস্তায় নামতে পারছে না। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ অফিসগামী ও কর্মজীবী মানুষ। পাম্প মালিক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ডিপো থেকে জ্বালানি তেলের এই সরবরাহ ব্যবস্থা যদি অতি দ্রুত স্বাভাবিক করা না হয়, তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে এবং গোটা রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ার মতো শঙ্কা তৈরি হবে।