লাইসেন্সমুক্ত ওয়াই-ফাই ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্যে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ঊর্ধ্বাংশের মূল্যবান ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ উন্মুক্ত না করার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে এই ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ উন্মুক্ত করে দেওয়ার আইনি ও বাণিজ্যিক শর্ত রাখা হয়েছিল। কিন্তু দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও আন্তর্জাতিক মোবাইল টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার সার্বিক চাহিদা বিবেচনা করে বিটিআরসি জানিয়েছে যে, সাধারণ ওয়াই-ফাই সেবার জন্য অতিরিক্ত এই স্পেকট্রাম বরাদ্দের কোনো বাস্তব যৌক্তিকতা বা প্রয়োজন আপাতত নেই। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রেরিত সাম্প্রতিক এক দাপ্তরিক চিঠিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এই টেকনিক্যাল মতামত ব্যক্ত করেছে।
চিঠিতে বিটিআরসির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানানো হয়েছে যে, বাংলাদেশে ইতিপূর্বে লাইসেন্সবিহীন বা উন্মুক্ত প্রযুক্তির জন্য বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ৭৩৩ মেগাহার্টজ তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া রয়েছে। এর মধ্যে অতীতে ব্যবহৃত ২৩৩ মেগাহার্টজের পাশাপাশি ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের নিচের দিকের (৫৯২৫-৬৪২৫ মেগাহার্টজ) প্রায় ৫০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ইতিমধ্যেই ওয়াই-ফাই ও সাধারণ ইনডোর ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। এটি দেশের বর্তমান এবং নিকট ভবিষ্যতের সাধারণ ইন্টারনেট চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণ সক্ষম। বিপরীতে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের ওপরের স্তরের ৭০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গটি মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটরদের উচ্চগতির ফাইভজি, সিক্সজি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক মোবাইল টেলিযোগাযোগ (আইএমটি) সেবা প্রদানের জন্য অত্যন্ত কৌশলগত সম্পদ। চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত না নেওয়ায় এবং চুক্তির শর্তানুসারে এটি ওয়াই-ফাইয়ের জন্য ছেড়ে দিলে ভবিষ্যতে দেশে উন্নত মোবাইল সেবার তরঙ্গের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
কারিগরি দৃষ্টিকোণ থেকে ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডটি মূলত দুটি বৃহৎ ভাগে বিভক্ত। প্রথমত, নিচের স্তরের ৫০০ মেগাহার্টজ উন্মুক্ত অবস্থায় গৃহস্থালি ও ইনডোর ইন্টারনেটে ব্যবহৃত হচ্ছে। আর দ্বিতীয়ত, ওপরের স্তরের প্রায় ৭০০ মেগাহার্টজ আন্তর্জাতিকভাবে মোবাইল নেটওয়ার্কের উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড সেবার জন্য সংরক্ষিত থাকে, যা থেকে সরকার নির্দিষ্ট ফি বা রাজস্ব আয় করে থাকে। বিটিআরসির প্রধান আশঙ্কা হলো, ৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের পুরো ১২০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম যদি একতরফাভাবে ওয়াই-ফাইয়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের ফাইভজি ও সিক্সজি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় দুই হাজার মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে। দেশের অধিকাংশ নাগরিক যেখানে সরাসরি মোবাইল ডাটার ওপর নির্ভরশীল, সেখানে রাষ্ট্রীয় এই মূল্যবান সম্পদ ওয়াই-ফাইয়ে অপচয় করা সমীচীন হবে না।
টেলিযোগাযোগ খাতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নীতি ও আন্তর্জাতিক টেলিকম ইউনিয়নের (আইটিইউ) সিদ্ধান্তকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ এককভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আঞ্চলিক তরঙ্গ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দেবে। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে সংকেত বা সিগন্যালের তীব্র ইন্টারফেয়ারেন্স (উৎস ব্যতিচার) সৃষ্টি হতে পারে। বিগত ২০২৩ সালের ওয়ার্ল্ড রেডিওকমিউনিকেশন কনফারেন্সে (ডব্লিউআরসি) বাংলাদেশ নিজেই ৬ গিগাহার্টজের ঊর্ধ্বাংশ মোবাইল সেবার জন্য সংরক্ষণ করার বৈশ্বিক প্রস্তাব সমর্থন করেছিল। পার্শ্ববর্তী ভারত, চীন, মালদ্বীপ, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো আইটিইউ ‘রিজিয়ন-৩’-এর সিংহভাগ দেশ এই তরঙ্গকে আন্তর্জাতিক মোবাইল সার্ভিসের জন্য সংরক্ষিত রাখার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ডিভাইসের সমজাতীয়তা (হারমোনাইজেশন) থেকে বিচ্যুত হয়, তবে পার্শ্ববর্তী দেশের গড়া ডিভাইস ইকোসিস্টেম থেকে দেশের মোবাইল গ্রাহকরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বেন।
তবে ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন আইএসপিএবি (ISPAB)-র পক্ষ থেকে এই সিদ্ধান্তকে ভিন্ন আঙ্গিকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তাদের দাবি, বাসাবাড়ি ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে দিন দিন ওয়াই-ফাই চালিত স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে বর্তমান কম ব্যান্ডউইডথে ঘনঘন সিগন্যাল জট ও ধীরগতির ইন্টারনেট পরিষেবা তৈরি হচ্ছে। ৬ গিগাহার্টজের ওপরের স্তরটি উন্মুক্ত করা হলে দেশে ব্রডব্যান্ডের গুণগত মান বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন। একইভাবে কিছু প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কারিগরি গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত যে, ওয়াই-ফাই নাকি মোবাইল ডাটা—কোন খাতে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেশের অর্থনীতিতে সর্বাধিক উপযোগিতা তৈরি করতে পারবে।
সমগ্র বিষয়টি পর্যালোচনা করে বিটিআরসির দায়িত্বশীল মহল জানিয়েছে যে, সরকারের কাছে চুক্তির শর্ত ও সম্ভাব্য প্রযুক্তিগত সংকটগুলোর কারিগরি বিশ্লেষণ জমা দেওয়া হয়েছে। দেশের ভবিষ্যতের ফাইভজি বা সিক্সজি নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অকার্যকর না হলেও, তরঙ্গ সংকট তৈরি হলে গুণগত মোবাইল সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। সর্বোপরি, বিষয়টিকে একটি বড় ধরণের সরকারি ও নীতিগত সিদ্ধান্ত উল্লেখ করে বিটিআরসি জানিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক চুক্তি বাস্তবায়নে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেই অনুযায়ী ইন্টারফেয়ারেন্স মূল্যায়নের মতো পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা