• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৬:১৩ অপরাহ্ন
Headline
সত্তরে স্বাস্থ্য রক্ষা— শুরু করতে হয় ত্রিশে: সাতটি পরামর্শ টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ে শ্রীলঙ্কাকে পেছনে ফেলল বাংলাদেশ কমিশনের লোভে বলি ৩১১ শিশু: হামের প্রকোপে অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা ও বর্তমান সরকারের দায় তৃণমূলের ‘খেলা হবে’ থেকে ‘খেলা শেষ’ রূপোলি পর্দার কমান্ডার কি তামিলনাড়ুর মসনদে? ট্রাম্পের নতুন ব্যবসা: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তপাতে আমেরিকার অস্ত্র, তেল ও ‘জলদস্যুতা’ বিএনপি-জামায়াতের টেন্ডার-লড়াই ও ক্ষমতার নতুন সমীকরণ ‘সালমানি’ কায়দায় নাবিল গ্রুপের উত্থান ও জব্দের জালে সাম্রাজ্য ‘বিকল্প শক্তি’ হতে আটঘাট বাঁধছে এনসিপি হাম পরীক্ষার কিট অবশিষ্ট আর মাত্র ৭টি: এরপর কী?

‘সালমানি’ কায়দায় নাবিল গ্রুপের উত্থান ও জব্দের জালে সাম্রাজ্য

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং খাত। কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে এই ব্যাংকিং খাত পরিণত হয়েছিল মুষ্টিমেয় কয়েকজন অসাধু ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত সিন্ধুকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দেশের ব্যাংক খাতে যে নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে, তা রীতিমতো রূপকথার গল্পকেও হার মানায়। বিশেষ করে ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আনকোরা এক ‘নাবিল গ্রুপ’-এর সম্মিলিত থাবায় দেশের অন্তত ২৮টি ব্যাংক আজ খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। নামে-বেনামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর এই ভয়াবহ আর্থিক কেলেঙ্কারির চিত্র যখন একে একে সামনে আসছে, তখন দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আইনি পদক্ষেপ। ব্যাংক পাড়ার মাফিয়াদের সম্পদ জব্দের পাশাপাশি বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে শুরু হয়েছে বহুমুখী আন্তর্জাতিক তৎপরতা।

ছয় রাঘববোয়ালের থাবায় ২৮ ব্যাংকের রক্তক্ষরণ

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংক খাতের আসল ক্ষতগুলো উন্মুক্ত হতে শুরু করে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যৌথ তদন্তে উঠে এসেছে, কেবল ছয়টি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারণেই দেশের অন্তত ২৮টি ব্যাংক চরম আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এই ছয়টি গ্রুপ হলো—বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলমের এস আলম গ্রুপ, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট, মরহুম জয়নুল হক সিকদারে সিকদার গ্রুপ, সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো, ওরিয়ন গ্রুপ ও নাসা গ্রুপ।

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই ছয়টি গ্রুপ মোট খেলাপি ঋণের ৭৭ শতাংশই কুক্ষিগত করে রেখেছে। এর মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ দেখিয়েছে এস আলম গ্রুপ। বিএফআইইউর তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা। এই গ্রুপের সর্বগ্রাসী থাবায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম, গ্লোবাল ইসলামী, ইউনিয়ন, জনতা, রূপালী, ইউসিবি, সাউথইস্ট, প্রিমিয়ার, মার্কেন্টাইল এবং বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক।

ব্যাংক খাতের আরেক মাফিয়া ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তার বেক্সিমকো গ্রুপের কারণে জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, সোনালী, এবি, অগ্রণীসহ অন্তত ১৪টি ব্যাংক আজ ধুঁকছে। এসব ব্যাংক থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের নেওয়া ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল জনতা ব্যাংকেরই রয়েছে ২৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যার পুরোটাই এখন খেলাপি।

এছাড়া সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপের কারণে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউসিবিসহ ৯টি ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যাদের খেলাপির পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবির সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নাসা গ্রুপের কারণে ফার্স্ট সিকিউরিটি, এক্সিম, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ ১১টি ব্যাংক সংকটে পড়েছে। নাসা গ্রুপ প্রায় সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিলেও ক্ষমতার দাপটে এতদিন তা খেলাপি হয়নি, তবে এখন সব ঋণ খেলাপির খাতায়। সিকদার গ্রুপের কারণে ১১টি এবং ওরিয়ন গ্রুপের কারণে ১২টি ব্যাংক (যাদের ঋণের পরিমাণ ১০ হাজার ১২ কোটি টাকা) চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে।

এই বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত পুনর্গঠিত টাস্কফোর্স বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একাধিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) বা গোপনীয়তা চুক্তি সই করেছে। জনতা, ইসলামী ব্যাংক, ইউসিবি, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ খোঁজার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

বেক্সিমকোর কায়দায় নাবিল গ্রুপের অবিশ্বাস্য উত্থান

বড় বড় রাঘববোয়ালদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ আমলে রাজশাহীভিত্তিক ‘নাবিল গ্রুপ’ যেভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতে লুটপাট চালিয়েছে, তা অনেককেই হতবাক করেছে। সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপের প্রিয় একটি কাজ ছিল—নতুন ঋণের টাকায় পুরোনো ঋণের কিস্তি শোধ করা। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কৈয়ের তেলে কৈ ভাজার এই অভিনব ‘সালমানি’ কায়দাতেই অবতীর্ণ হয়েছেন নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিনুল ইসলাম স্বপন। বড় কোনো উৎপাদনমুখী শিল্প বা জামানত দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ না থাকলেও তিনি ব্যাংক থেকে দেদার ঋণ পেয়েছেন।

রাজশাহীভিত্তিক ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের ইসলামী ব্যাংকে নামে-বেনামে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৬৪৫ কোটি টাকা! এই ঋণের প্রায় পুরোটাই দেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে, বিশেষত ২০২২ সালের পর থেকে। ২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের রাজশাহী শাখায় নাবিল গ্রুপের ঋণ ছিল ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। কিন্তু ওই বছর শেষে এসে ইসলামী ব্যাংকের ঢাকা ও রাজশাহীর ছয়টি শাখায় বেনামিসহ তাদের ঋণের পরিমাণ এক লাফে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকায়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার পরিবার এবং ১০টি ব্যবসায়ী গ্রুপের ব্যাংক জালিয়াতি তদন্তে যে ১১টি কমিটি করা হয়, সেখানে এস আলম, বেক্সিমকো, সামিট, বসুন্ধরার মতো জায়ান্টদের সঙ্গে নাবিল গ্রুপের নামও উঠে আসে। বর্তমান সরকারের সময়ে গ্রুপটি দেশের চতুর্থ বৃহত্তম ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক হয়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী স্বপনের শক্তির উৎস খুঁজতে গিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি রাজশাহীতে জামায়াতে ইসলামীর সম্মেলন মঞ্চে তাকে দেখা গেলেও, স্থানীয় জামায়াত নেতারা জানিয়েছেন তিনি তাদের কেউ নন; বরং অজ্ঞাতসারেই তিনি মঞ্চে উঠে পড়েছিলেন।

বেনামি ঋণের গোলকধাঁধা এবং ১৪ কর্মচারীর নামে ৯ হাজার কোটি টাকা!

নাবিল গ্রুপের ঋণ নেওয়ার ধরনটি ছিল একেবারেই অভিনব এবং জালিয়াতিতে ভরপুর। অভিনব কৌশলে জালিয়াতির মাধ্যমে তারা ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার বেশির ভাগই বেনামি। সাধারণত ব্যাংকে আগে জামানত দেওয়ার পর ঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু নাবিল গ্রুপের ক্ষেত্রে আগে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তারপর সেই ঋণের টাকায় খোলা এফডিআর ওই ঋণের জামানত হিসেবে বন্ধক রাখা হয়েছে! ঋণখেলাপি হলে এফডিআর ভেঙে ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে তা আবার নবায়ন করা হয়েছে। এতে সহায়তা করেছেন ব্যাংকেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা।

সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, নাবিল গ্রুপের মাত্র ১৪ জন সাধারণ কর্মী ও সুবিধাভোগীর নামে খোলা ৯টি কাগুজে কোম্পানিকে ৯ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এই ১৪ জনের সবাই নাবিল গ্রুপ থেকে প্রতি মাসে বেতনভুক্ত কর্মচারী। এর মধ্যে ‘নাবিল গ্রেইন ক্রপস’ নামে একটি কোম্পানির মালিক দেখানো হয়েছে গ্রুপটির কর্মী শাকিল হোসেন ও রায়হানুল ইসলামকে। এই একটি কোম্পানিকেই ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে ইসলামী ব্যাংক। নাবিল গ্রুপের নিজস্ব ওয়েবসাইটে তাদের ১৫টি মূল প্রতিষ্ঠানের (নাবিল ট্রেডিং, নাবিল ফিড মিলস, নাবিল অটো রাইস মিলস ইত্যাদি) নাম থাকলেও, কর্মচারীদের নামে খোলা এই ৯টি বেনামি কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব সেখানে নেই।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী একটি ব্যাংক তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ একক ব্যক্তি বা গ্রুপকে ঋণ দিতে পারে (যার মধ্যে সরাসরি বা ফান্ডেড ঋণ ১৫ শতাংশ)। ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার কোটি টাকা মূলধন থাকার সময়েও একক গ্রাহককে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুযোগ ছিল। অথচ নাবিল গ্রুপকে নামে-বেনামে এর ৫ গুণের বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ইসলামী ব্যাংক আজ মূলধন ঘাটতিতে ধুঁকছে।

অভিযোগ রয়েছে, তিনটি ব্যাংক থেকে নেওয়া এসব ঋণের টাকা কয়েক হাত ঘুরে এস আলমের হিসাবে গেছে, যা পরে বিদেশে পাচার করা হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী ঋণের টাকায় জমি কেনা নিষিদ্ধ হলেও, নাবিল গ্রুপ ঋণ জালিয়াতির টাকায় ১ হাজার একর জমি কিনেছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর নাবিল গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক থেকে আরও ৮০০ কোটি টাকার নতুন ঋণ নিয়েছে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো অনিয়ম খুঁজে পায়নি বলে জানা গেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট চলছে, অনিয়ম প্রমাণিত হলে কেউ ছাড় পাবে না।

অবশেষে আইনি খড়্গ: নাবিলের সম্পদ ও ব্যাংক হিসাব জব্দ

পাপের ঘড়া পূর্ণ হলে পতন অনিবার্য। বিপুল এই জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বিএফআইইউ, সিআইডি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একযোগে তদন্তে নেমেছে। ফলশ্রুতিতে নাবিল গ্রুপের শীর্ষ কর্তাদের ওপর নেমে এসেছে আইনি খড়্গ।

দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম ও তাঁর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির ৭৩টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দিয়েছেন। দুদক আদালতকে জানিয়েছে, এসব ব্যাংক হিসাবে ৯৮ কোটি ৯৪ লাখ টাকা জমা রয়েছে।

এর আগে গত ২৪ মার্চ একই আদালত মানি লন্ডারিংয়ের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী ইসরাত জাহান ও তাদের চার প্রতিষ্ঠানের ১৭৮ বিঘা জমি জব্দের আদেশ দেন। রাজশাহীর পবা উপজেলার তেকাটাপাড়ায় অবস্থিত এই বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে—আমিনুল ইসলামের নামে ১৩২ বিঘা, স্ত্রী ইসরাত জাহানের নামে ২৩ বিঘা, নাবিল ফার্মা লিমিটেডের নামে ১৩ বিঘা, নাবিল গ্রেট হোমস লিমিটেডের নামে প্রায় ৯ বিঘা, আনোয়ার ফিড মিলস লিমিটেডের নামে প্রায় এক বিঘা এবং নাবিল নাবা ফুডসের নামে ৮ শতক জমি। এ ছাড়া এমডি আমিনুল ইসলামের নামে রাজশাহীর আরও ২০টি দলিলে থাকা জমিও জব্দের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

সম্পদ জব্দের পাশাপাশি সন্দেহজনক লেনদেনের কারণে গত সেপ্টেম্বরে বিএফআইইউ নাবিল গ্রুপের এমডি আমিনুল ইসলাম, তার স্ত্রী ইসরাত জাহান, পিতা ও গ্রুপের চেয়ারম্যান জাহান বক্স মণ্ডল, মা ও পরিচালক আনোয়ারা বেগম এবং দুই সন্তান এজাজ আবরার ও আফরা ইবনাথের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবও জব্দ করেছে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম চলমান রাখতে তাদের কোম্পানির ব্যাংক হিসাবগুলো সচল রাখা হয়েছে।

দুর্নীতির ইকোসিস্টেম: ডিএজির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

এই রাঘববোয়ালদের ব্যাংক লুটপাট কেবল ব্যবসায়ীদের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না; এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় আইনি ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিবাজদের সমর্থন। এর একটি জ্বলন্ত প্রমাণ হলো সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) জান্নাতুল ফেরদৌসীর ঘটনা। ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ মো. জাকির হোসেন দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই সাবেক ডিএজির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন।

আদালতে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জান্নাতুল ফেরদৌসীর বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ করে জি কে শামীমসহ বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসী ও আসামিকে জামিন করিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এই অবৈধ অর্থের মাধ্যমে তিনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত পাহাড়সম সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদক অনুসন্ধান করছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদে বসে অর্থের বিনিময়ে অপরাধীদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সময়ে দুর্নীতি কীভাবে একটি কাঠামোগত ‘ইকোসিস্টেম’ বা চক্রে পরিণত হয়েছিল।

ব্যাংক খাতে গত দেড় দশকে যে লুটপাটের মহোৎসব চলেছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ৬টি প্রধান ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং নাবিল গ্রুপের মতো কিছু সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান দেশের সাধারণ মানুষের আমানতের টাকাকে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি বানিয়েছিল। ভুয়া প্রতিষ্ঠান, কাগুজে জামানত এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ছদ্মাবরণে তারা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার, দুদক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের যৌথ টাস্কফোর্স যে আইনি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে, তা দেশের সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা, স্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার এই প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছতা ও দৃঢ়তার সঙ্গে সম্পন্ন হয়, তবেই দেশের ব্যাংকিং খাত তার হারানো আস্থা ফিরে পাবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দুর্নীতিমুক্ত ও শক্তিশালী অর্থনীতির বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

সূত্র: প্রধম আলো, আমার দেশ, বাংলাদেশ প্রতিদিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category