• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৬:০৯ পূর্বাহ্ন
Headline
মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো শিরোনাম: আসিফ মাহমুদকে কটাক্ষ করে নীলার স্ট্যাটাস: ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’ ‘ইরান চুক্তি চায়, তবে আমি সন্তুষ্ট নই’—ট্রাম্প; অন্যদিকে হুমকি বন্ধের শর্তে কূটনীতিতে আগ্রহী তেহরান বাংলাদেশে হামে মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা: অব্যবস্থাপনা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতিকে দুষছেন বিশেষজ্ঞরা

সিগারেটে ভর করে চলছে অর্থনীতি

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

একটি দেশের কর কাঠামো কেমন হওয়া উচিত? অর্থনীতির সাধারণ সূত্র বলে, যারা উচ্চ আয়ের মানুষ তারা বেশি কর দেবেন, আর নিম্ন আয়ের মানুষদের ওপর করের চাপ থাকবে সবচেয়ে কম। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্রটি যেন উল্টো রথের খেলা! পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের একজন নিম্ন আয়ের মানুষ তার মোট আয়ের প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ সরকারকে ট্যাক্স হিসেবে দেন, অথচ একজন উচ্চ আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই হার ৫ শতাংশেরও কম। দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষটিও যখন এক টাকা দিয়ে একটি দেশলাই কেনেন, তাকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়।

এই চরম বৈষম্যমূলক কর ব্যবস্থার নেপথ্যে রয়েছে সরকারের পরোক্ষ কর (ভ্যাট) নির্ভরতা এবং একটি বিশেষ অনুৎপাদনশীল খাতের ওপর চরম নির্ভরশীলতা। খাতটি হলো তামাক ও সিগারেট। অবাক করার বিষয় হলেও সত্যি, চা, চিনি বা তৈরি পোশাক শিল্প নয়, বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের কোষাগারে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব জমা হয় সিগারেট বিক্রি থেকে।

রাজস্ব আয়ের চূড়ায় সিগারেট

গত অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তামাকজাত পণ্য থেকে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে, যা দেশের একক বৃহত্তম কর আহরণকারী খাত। ব্যবসায়ীদের দাবি, অবৈধ সিগারেট ও নকল ব্যান্ডরোল বাজার থেকে হটাতে পারলে এই খাত থেকে বছরে আরও অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব।

জানা গেছে, বর্তমান ইউনুস সরকার নিম্নস্তরের সিগারেটের ওপর কর বাড়ানোর ফলে এর বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায়। কর না বাড়ালে সরকার হয়তো আরও ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেত। মূলত এই হিসাবনিকাশ থেকেই এ বছর সিগারেটের ওপর আর নতুন করে কর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ক্যাপটিভ মার্কেট ও কর্মসংস্থানের হিসাব

তৈরি পোশাক শিল্পের মতো উৎপাদনশীল খাত দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান করেছে এবং বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আনছে। ফলে সরকার এই খাতে করের বোঝা কম রাখে। অন্যদিকে, তামাক খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ যুক্ত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সিগারেটের খুচরা মূল্যের ওপর ৭০-৭৫ শতাংশ শুল্ক থাকলেও, মোট রাজস্বে তাদের তামাকের অবদান বাংলাদেশের তুলনায় নগণ্য। কারণ উন্নত বিশ্ব কর্পোরেট ট্যাক্স ও ব্যক্তি আয়করের ওপর নির্ভরশীল।

সিগারেটে সর্বোচ্চ কর থাকা সত্ত্বেও বিক্রি না কমার কারণ হলো এটি একটি ‘ক্যাপটিভ মার্কেট’। দাম বাড়লেও ধূমপায়ীরা সহজে এই নেশা ছাড়তে পারেন না। আর বাংলাদেশ সরকার কর্পোরেট ও ধনীদের কাছ থেকে সঠিক আয়কর আদায়ে ব্যর্থ হয়ে এই দুর্বলতারই সুযোগ নিচ্ছে।

আয়ের চেয়ে ক্ষতির পাল্লা ভারী: ধূমপায়ীর চিকিৎসায় অন্যের ট্যাক্স

কাগজে-কলমে ৪১ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব বেশ আকর্ষণীয় মনে হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ক্ষতি। তামাক বিরোধী সংগঠন ‘প্রজ্ঞা’-এর হিসাব অনুযায়ী, ধূমপানের ফলে সৃষ্ট রোগের চিকিৎসা ব্যয় এবং অকাল মৃত্যুর কারণে হারানো কর্মঘণ্টার আর্থিক মূল্য বছরে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যান, যার কোনো আর্থিক পরিমাপ সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক বই কিনে, রেস্টুরেন্টে খেয়ে বা পরিশ্রমের আয়ে যে ট্যাক্স সরকারকে দিচ্ছেন, সেই টাকা ব্যয় হচ্ছে ধূমপায়ীদের চিকিৎসায়। সরকারি হাসপাতালে ক্যানসার বা ফুসফুসের চিকিৎসায় সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হয়। অর্থাৎ, ধূমপায়ীরা যে পরিমাণ ট্যাক্স দেন, চিকিৎসা ও অন্যান্য ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকারের কোষাগার থেকে বেরিয়ে যায় তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ। পাশাপাশি, তামাক চাষের কারণে কৃষি জমিতে খাদ্য উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সিগারেটে মিলছে ভারী ধাতু

কেবল নিকোটিন নয়, সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের ছয়টি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সিগারেটে লেড (সীসা), ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর ‘হেভি মেটাল’ বা ভারী ধাতু পাওয়া গেছে। তামাকে প্রাকৃতিকভাবে এসব ধাতু থাকার কথা নয়। মূলত তামাক চাষে ব্যবহৃত ফসফেট সার এবং বাতাসের দূষণ থেকে এই ধাতুগুলো তামাক পাতায় জমা হয়। মানবদেহে প্রবেশ করলে এগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের কোষ ধ্বংস করে এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সরকারের দ্বিমুখী নীতি ও ‘নেগেটিভ মার্কেটিং’

ক্ষতিকর দিকগুলো স্পষ্ট হলেও এই খাতের বিষয়ে সরকারের গৃহীত কিছু পদক্ষেপ কার্যত দ্বিমুখী নীতির প্রমাণ দেয়। যেমন: কর ফাঁকি রোধ করতে সরকার এবার সিগারেটের প্যাকেটে কিউআর (QR) কোড যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই কোড স্ক্যান করে ধূমপায়ীরা পুরস্কারও জিততে পারবেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নকল কারখানা বা অবৈধ ব্যান্ডরোল উৎপাদন পর্যায়ে বন্ধ না করে ভোক্তার হাতে নকল ধরার দায়িত্ব দেওয়া সরকারের এক ধরনের দায় এড়ানো। পাশাপাশি, পুরস্কারের প্রলোভন পরোক্ষভাবে সিগারেটের ‘বিজ্ঞাপন’ বা নেগেটিভ মার্কেটিং হিসেবেই কাজ করবে।

এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি, যা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের সামনে ক্ষতিকর নেশার নতুন দরজা খুলে দেওয়া হচ্ছে।

সমাধান কোন পথে?

পুরো জটিলতার মূল উৎস হলো আমাদের অনুন্নত কর কাঠামো। রাজস্ব আদায়ের জন্য বাংলাদেশ সরকার সিগারেটকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছে। পৃথিবীর খুব কম দেশেই রাজস্ব আয়ের এক নম্বরে তামাক খাতের অবস্থান রয়েছে।

সিপিডি-এর গবেষণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, বাংলাদেশে ধনীরা কর দিতে চান না, আর সেই ঘাটতি মেটানো হয় গরিবের ওপর পরোক্ষ কর এবং সিগারেটের মতো ক্ষতিকর পণ্যের ওপর নির্ভর করে। অর্থনীতিকে সুস্থ ও টেকসই করতে হলে অবিলম্বে এই কাঠামোগত বৈষম্য দূর করতে হবে। ধনীদের কাছ থেকে সঠিকভাবে আয়কর এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠান থেকে কর্পোরেট ট্যাক্স আদায়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসম্মত উৎপাদনশীল খাত থেকে রাজস্ব বাড়াতে হবে। সরকারকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি শুধু মোটা অঙ্কের ট্যাক্স দেখে অনুৎপাদনশীল ও ক্ষতিকর সিগারেটকেই উৎসাহিত করবে, নাকি একটি সুস্থ ও জনবান্ধব কর কাঠামো গড়ে তুলবে!


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category