আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর ঝলমলে স্বর্ণালংকার—এই দুই ভিন্ন খাতের ওপর কর আহরণের বিশেষ নজরদারি বাড়াতে যাচ্ছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, তামাক খাত থেকে কর ফাঁকি রোধে এবার নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে; অর্থাৎ সিগারেটে সরাসরি শুল্ক-কর না বাড়িয়ে প্যাকেটের মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হবে। অন্যদিকে, দেশের জুয়েলারি বা স্বর্ণ খাতের জন্য তৈরি হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন কর কাঠামো। প্রথমবারের মতো সাধারণ করদাতাদের নিজস্ব ফাইলে থাকা পুরোনো স্বর্ণালংকার বিক্রির মাধ্যমে অর্জিত লাভের ওপর ১৫ শতাংশ ‘গেইন ট্যাক্স’ বা লাভকর বসানোর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তামাক খাত থেকে করের হার না বাড়িয়েও কেবল মূল্যবৃদ্ধির এই বিশেষ উদ্যোগ এবং অন্যান্য কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে আগামী অর্থবছরে অতিরিক্ত প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের মহাপরিকল্পনা করছে এনবিআর। এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে তামাক খাতে সর্বোচ্চ ৮৩ শতাংশ কর চালু রয়েছে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। তাই আসন্ন বাজেটে সিগারেটের ওপর নতুন করে শুল্ক না বাড়িয়ে প্যাকেট প্রতি ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে দেওয়া হতে পারে। শুধু দাম বাড়ানোই নয়, এই খাত থেকে শতভাগ রাজস্ব নিশ্চিত করতে এবং অবৈধ বা নকল সিগারেটের বাজার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে বাজেটে প্রথমবারের মতো একটি সমন্বিত ও কঠোর নীতিমালা আনা হচ্ছে।
বাজারে দেশি ও বহুজাতিক বিভিন্ন কোম্পানির বিরুদ্ধে জাল বা নকল ট্যাক্স স্ট্যাম্প ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এই জاليةতি রুখতে আসন্ন বাজেটে ভ্যাট আইন সংশোধন করে তামাক খাতে সর্বাধুনিক ‘ট্রেস অ্যান্ড ট্র্যাক’ প্রযুক্তি ও ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে। নকল বা অবৈধ cigarette বাজারজাতকরণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে এখন থেকে সিগারেটের প্যাকেটের মূল স্ট্যাম্পে বিশেষ এয়ার ও কিউআর কোড ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি উৎপাদন থেকে শুরু করে বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া তদারকির জন্য প্রতিটি সিগারেট ফ্যাক্টরিতে বিশেষ সিসি ক্যামেরা বসানো হবে, যার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি এনবিআর কার্যালয়ের সাথে যুক্ত থাকবে। কোনো প্রকার ভ্যাট নিবন্ধন না নিয়ে যারা অবৈধভাবে বিদেশি ও দেশি ব্যান্ডের নকল cigarette তৈরি করছে, তাদের রুখতে সিগারেট পেপার আমদানিতে কঠোর নিয়ম আনা হচ্ছে। এখন থেকে ভ্যাট নিবন্ধিত সিগারেট কোম্পানি ছাড়া অন্য কেউ এই পেপার আমদানি করতে পারবে না। একই সাথে সিগারেট পেপার আমদানির বিদ্যমান মোট শুল্ককর ৫৮.৬০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে আগামী বাজেটে দ্বিগুণ করার পাশাপাশি মেকানিজম বা ভারী যন্ত্রপাতি আমদানিতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হবে।
আয়করদাতারা সাধারণত নিজেদের করফাইল ভারী দেখানোর জন্য উত্তরাধিকার সূত্রে, উপহার হিসেবে কিংবা ক্রয় সূত্রে পাওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার ফাইলে প্রদর্শন করে থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে করদাতার প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি স্বর্ণও ফাইলে দেখানো হয়। এতদিন এই পুরোনো স্বর্ণ বিক্রি থেকে অর্জিত লাভের ওপর সরকার কোনো কর পেত না। আসন্ন বাজেটে এই ফাঁকফোকর বন্ধ করতে প্রথমবারের মতো ১৫ শতাংশ গেইন ট্যাক্স বা লাভকর প্রবর্তন করা হচ্ছে। এর ফলে একজন করদাতা যেদিন তাঁর আয়কর ফাইল খুলেছিলেন বা স্বর্ণের যে দাম ঘোষণা করেছিলেন, পরবর্তীতে বিক্রির সময় বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে তার যে ব্যবধান বা বাড়তি আর্থিক লাভ তৈরি হবে, সেই লভ্যাংশের ওপর সরাসরি ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।
ঘাটতির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে এনবিআর কর আদায়ের জন্য কঠোর হলেও, ব্যবসা সহজ করতে ও দেশীয় বিনিয়োগ বাড়াতে আসন্ন বাজেটে ১৬ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় ধরনের সুখবর ও করছাড়ের ঘোষণা আসছে। নতুন, তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্থানীয় বিনিয়োগে বিশেষ করছাড়ের ব্যবস্থা থাকছে। পাশাপাশি স্থানীয় মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত ২২ ধরনের উপকরণের অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হচ্ছে এবং কম্পিউটারের বিভিন্ন অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এআইটি ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হবে। বর্জ্য পুনর্ব্যবহার বা রিসাইকেল ইন্ডাস্ট্রিকে উৎসাহিত করতে এ খাতের কাঁচামাল সরবরাহের ট্যাক্স ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারীদের জন্য টানা ১০ বছরের কর অব্যাহতি বা ‘ট্যাক্স হলিডে’ সুবিধা আসছে। দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট বিবেচনায় নিয়ে পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) আমদানি এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন স্থাপনের যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫ শতাংশ এআইটি পুরোপুরি প্রত্যাহার বা মওকুফ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই সাথে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করতে সরকারি নগদ প্রণোদনার ওপর বিদ্যমান উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে এক লাফে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে।