• বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০২ অপরাহ্ন
Headline
ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে নীতিগত রূপান্তরের তাগিদ হামের উপসর্গে আরো ছয় শিশুর মৃত্যু প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে: আইনমন্ত্রী তিনি একদম ঠিক আছেন: ইউনূস সেন্টার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু ইরানি নেতাদের হত্যা করার ক্ষেত্রে আমরা হয়তো অনেকদূর চলে গেছি: ট্রাম্প জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে: এলজিআরডি মন্ত্রী রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা: আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তদন্ত করছে সৌদি আরব প্লাস্টিক দূষণ রোধে সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই : পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় তথ্যচিত্রে মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ৯০ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস অন্তর্ভুক্তে গুরুত্বারোপ

সুনীল অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

Reporter Name / ৬৯ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এবং সামুদ্রিক সম্পদের বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বর্তমান সরকার একটি যুগান্তকারী মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও গবেষণার জন্য প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশাল ও অত্যাধুনিক গবেষণা জাহাজ নির্মাণের ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি) একটি ভাসমান গবেষণাগার পেতে যাচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এক নতুন শক্তির জোগান দেবে। এতদিন পর্যন্ত গভীর সমুদ্রের তলদেশে বৈজ্ঞানিক উপায়ে অনুসন্ধান চালানোর মতো নিজস্ব কোনো সক্ষমতা আমাদের বিজ্ঞানীদের ছিল না, তবে এই বিশেষায়িত নৌযানটি যুক্ত হওয়ার পর সেই দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক নকশা ও বৈশ্বিক প্রযুক্তির সমন্বয়

সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে তৈরি হতে যাওয়া এই অত্যাধুনিক জাহাজটি নির্মাণের গুরুদায়িত্ব পেয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড। প্রকল্পটির প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা। জাহাজটির কাঠামো ও অভ্যন্তরীণ কারিগরি নকশা প্রস্তুত করেছে সামুদ্রিক জাহাজ নির্মাণ খাতের বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ‘কিল মেরিন’। কুয়েত এনভায়রনমেন্টাল এজেন্সির সফলভাবে ব্যবহৃত একটি পরীক্ষিত ও আধুনিক গবেষণা জাহাজের মূল কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের জন্য এই নতুন নকশাটি তৈরি করা হয়েছে।

শুধু নকশায় নয়, জাহাজের ভেতরের উচ্চপ্রযুক্তির বৈজ্ঞানিক ল্যাব ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত বিভিন্ন দেশ, চীন, তুরস্ক এবং সিঙ্গাপুরের মতো প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত বিশ্ব থেকে এসব বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম আমদানি করা হচ্ছে। বোরি এবং খুলনা শিপইয়ার্ডের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের জুন মাসের মধ্যে এই ভাসমান গবেষণাগারটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে বোরির গবেষণা বহরে যুক্ত করার আইনি সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সাধারণ ট্রলার থেকে গভীর সমুদ্রের স্বাধীনতায় বোরি

২০১৬ সালে সমুদ্রবিদ্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিজ্ঞানসম্মত ছয়টি ভিন্ন বিভাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট (বোরি)। তবে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিজস্ব আধুনিক নৌযানের অভাবে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীদের সমুদ্রের নমুনা সংগ্রহ ও মৌলিক গবেষণার জন্য সাধারণ মাছ ধরার ট্রলার কিংবা মাঝেমধ্যে বিদেশি জাহাজের সহযোগিতা বা করুণার ওপর নির্ভর করতে হতো। প্রচলিত দেশীয় সাধারণ নৌযানের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিজ্ঞানীদের পক্ষে গভীর সমুদ্র বা সমুদ্রের তলদেশ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট কোনো পরিবেশগত গবেষণা চালানো সম্ভব ছিল না।

বোরির পরিবেশ ওশানোগ্রাফি ও জলবায়ু বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবু শরীফ মো. মাহবুব-ই-কিবরিয়া এই বিষয়ে জানান যে, বর্তমান দেশীয় নৌযানের সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের সামুদ্রিক পরিবেশগত গবেষণাগুলো মূলত সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি এবং অগভীর পানিতেই সীমাবদ্ধ রাখতে হয়। সময়ের দিক থেকেও এগুলো খুব স্বল্প পরিসরে করতে হয়, যার ফলে সাগরের ওপরের স্তরের তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, প্ল্যাংকটনের উপস্থিতি কিংবা কেবল দৃশ্যমান দূষণ পর্যবেক্ষণের বাইরে বড় ও গভীর কোনো অনুসন্ধান চালানো এতদিন সম্ভব হয়নি। নতুন এই আধুনিক গবেষণা জাহাজের মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো গভীর সমুদ্র, সমুদ্রতল এবং সাগরের বিভিন্ন গভীরতার পানির স্তরে নিখুঁত ও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা চালাতে পারবেন।

সাগরের বুকে ভাসমান আধুনিক বিজ্ঞানাগার

নতুন এই আধুনিক ভাসমান গবেষণাগারটিতে বিজ্ঞানীদের সুবিধার্থে তিনটি সম্পূর্ণ আলাদা ও বিশেষায়িত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়েট ল্যাব, ড্রাই ল্যাব এবং একটি ডেটা বিশ্লেষণ ল্যাব। এই বিশেষায়িত ল্যাবগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সমুদ্র থেকে তাৎক্ষণিকভাবে সংগৃহীত যেকোনো রাসায়নিক বা জৈবিক নমুনা মাঝসাগরে অবস্থান করেই সরাসরি পরীক্ষা করা যাবে। এর জন্য বিজ্ঞানীদের আর তীরে ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে না।

শুধু তাই নয়, আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে মাঝসাগরে বসে প্রাপ্ত গবেষণার সমস্ত তথ্য ও উপাত্ত সরাসরি বোরির মূল ডেটা সেন্টারে রিয়েল-টাইমে পাঠানো সম্ভব হবে। জাহাজটির আবাসন ও ধারণক্ষমতাও অত্যন্ত চমৎকারভাবে সাজানো হয়েছে। এই জাহাজে একসঙ্গে ২৩ জন বিজ্ঞানী এবং ক্রু সদস্য অবস্থান করতে পারবেন এবং তারা মূল ভূখণ্ড থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থেকে টানা ৮ থেকে ১০ দিন সমুদ্রে দিনরাত ২৪ ঘণ্টা নিরবিচ্ছিন্ন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করার সক্ষমতা পাবেন।

সমুদ্রতলের গোপন খনিজ ও জ্বালানির সন্ধান

can বাংলাদেশের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন বা নিজস্ব অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যাপ্তি প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এই বিশাল জলসীমার তলদেশে জমে থাকা খনিজ সম্পদ, জ্বালানি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, যা এতদিন আমাদের অধরাই রয়ে গেছে। নতুন এই জাহাজে যুক্ত হতে যাওয়া সাব-বটম প্রোফাইলার, মাল্টি-বিম ইকো সাউন্ডার এবং সাইড-স্ক্যান সোনারের মতো সর্বোচ্চ প্রযুক্তির যন্ত্রপাতির সাহায্যে সমুদ্রতলের নিচের স্তরের নিখুঁত ছবি ও ভূ-তাত্ত্বিক গঠন সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা যাবে।

এই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সাগরের নিচে জমে থাকা পলি, ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক এবং ভারী ধাতুর অতি সূক্ষ্ম নমুনা বিশ্লেষণ করে অতীতের জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস এবং সমুদ্রের কার্বন সংরক্ষণের আসল সক্ষমতা নিয়ে অত্যন্ত উচ্চমানের গবেষণা করা সম্ভব হবে। একই সাথে এই প্রযুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় এক ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে, কারণ এর মাধ্যমে সমুদ্রের তলদেশের গ্যাস হাইড্রেট এবং অন্যান্য মূল্যবান খনিজ সম্পদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও পরিমাণ সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্ভুল তথ্য পাওয়া যাবে।

অবকাঠামোগত প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার

এই বিশাল ভাসমান গবেষণাগারটিকে সচল, নিরাপদ এবং কার্যকর রাখতে কক্সবাজার শহরের অদূরে খরুশকূলে মহেশখালী চ্যানেল এলাকায় বিশেষায়িত পন্টুন, জেটি এবং গ্যাংওয়ে নির্মাণের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এর পাশাপাশি সমুদ্রের অগভীর উপকূলীয় এলাকা ও নদীমোহনাগুলোতে দ্রুত যাতায়াত এবং যোগাযোগের জন্য তৈরি করা হচ্ছে দুটি ২৫ ফুট দৈর্ঘ্যের উচ্চগতির স্পিডবোট, যা আগামী এক বছরের মধ্যে বোরির হাতে হস্তান্তর করা হবে। এই সহযোগী জলযান বা স্পিডবোট দুটি মূল গবেষণা জাহাজে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ, জরুরি উদ্ধারকাজ পরিচালনা এবং সমুদ্র চ্যানেলে দ্রুত নমুনা সংগ্রহের কাজে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করবে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি দল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে সুনীল অর্থনীতি ও সমুদ্র সম্পদ রক্ষার টেকসই পরিকল্পনা অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান পেয়েছিল। সম্প্রতি কক্সবাজার সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সুধীসমাজে সমুদ্র অর্থনীতিকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে তাঁর প্রশাসনের দৃঢ় ও অনড় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত খুলনা শিপইয়ার্ডে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পন্ন করেছেন। এই বিশাল উদ্যোগকে দেশের সমুদ্র সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই ব্যবহারের একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন দেশের বিজ্ঞানী ও নাগরিক সমাজ, যা শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জনে এক নতুন শক্তির জোগান দেবে।

তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category