বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারের তীব্র অস্থিরতা এবং ক্রমবর্ধমান আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এই সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে সৌরবিদ্যুতের প্রসার এখন সময়ের দাবি। বর্তমান সরকারও দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নেযোগ্য এই উৎসের ওপর বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে যখন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য নানামুখী প্রচার-প্রচারণা ও রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা জারি করা হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক তখনই এই খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নিত্যনতুন যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বসানো হয়েছে উচ্চ শুল্কের বিশাল প্রাচীর। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এই স্ববিরোধী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক বা রুফটপ সৌরবিদ্যুৎ খাতের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তা এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
can বাংলাদেশের নবায়নেযোগ্য জ্বালানি খাতের বিকাশে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর বর্তমান বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামো। নীতিগত জায়গায় বড় আকারের গ্রিডভিত্তিক বা ইউটিলিটি স্কেলের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোকে সরকার সব ধরনের আমদানি শুল্ক থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি দিয়েছে। অথচ, সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা ছাদভিত্তিক বা ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেমের ক্ষেত্রে এই করছাড়ের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না। ফলে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভবন বা কলকারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের প্রাথমিক খরচ সাধারণ উদ্যোক্তাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
একটি সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেম চালু করতে যেসব গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়, সেগুলোর ওপর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) উচ্চ হারের শুল্ক বহাল রেখেছে। যেমন:
লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি: সোলার সিস্টেমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ধরে রাখার জন্য অপরিহার্য এই উপাদানের ওপর কার্যকর আমদানি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ।
সোলার প্যানেল ও ইনভার্টার: মূল প্যানেল এবং ইনভার্টারের ওপর শুল্কের পরিমাণ ২৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
সোলার চার্জ কন্ট্রোলার: বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রক এই ডিভাইসের ওপর শুল্ক রয়েছে ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
মাউন্টিং স্ট্রাকচার ও ডিসি কেবল: প্যানেল ধরে রাখার কাঠামো এবং বিদ্যুৎ পরিবহনের বিশেষ কেবলের ওপর সর্বোচ্চ ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক চাপানো হয়েছে।
এই উচ্চ শুল্কের কারণে একটি ছাদভিত্তিক সৌর প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের বিশাল অঙ্কের বাড়তি মূলধন বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, যা এই খাতের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণকে ব্যাপকভাবে ধীরগতির করে দিচ্ছে।
সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে কাস্টমস বা শুল্ক কর্তৃপক্ষের অদ্ভুত মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এ খাতের আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিনিয়ত সোলার প্যানেল ও এর সহযোগী যন্ত্রাংশের দাম কমলেও দেশের কাস্টমস হাউজগুলোতে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক নির্ধারণ করা হচ্ছে ওজনভিত্তিক বা কেজি দরে। গত ২১ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট আলোচনায় এ খাতের ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বিশ্ববাজারে প্রতি কেজি সোলার প্যানেলের প্রকৃত দাম যখন প্রায় ১ ডলারের কাছাকাছি, তখন বাংলাদেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সেটিকে ৩ ডলার হিসেবে মূল্যায়ন করছে। এই কাল্পনিক ও অতিরিক্ত মূল্যমানের ওপর ভিত্তি করে ডিউটি এবং অন্যান্য ট্যাক্স হিসাব করায় আমদানিকারকদের প্রকৃত খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
এ খাতের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এইচএনবিসি industrieস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান মাহমুদ খান এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জানান, সরকার সোলার প্যানেল আমদানিতে কিছুটা ছাড় দেওয়ার কথা বললেও একটি পুরো সিস্টেম সচল করার অন্য উপাদানগুলোর ওপর ভারী শুল্ক চাপিয়ে রেখেছে। একটি কার্যকর সোলার সিস্টেম কেবল প্যানেলের ওপর নির্ভর করে না; এর সাথে ইনভার্টার, কেবল, চার্জ কন্ট্রোলারসহ বহুবিধ যন্ত্রাংশ জড়িত থাকে। যদি প্যানেলের মতো এই সহযোগী ডিভাইসগুলোর ওপর থেকেও শুল্ক প্রত্যাহার বা উল্লেখযোগ্য হারে কমানো যেত, তবে সৌরপ্রযুক্তির সামগ্রিক খরচ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসত। আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য না রেখে কাস্টমসের এই কেজি দরে শুল্ক আদায়ের বৈরী নিয়মের কারণে স্থানীয় বাজারে সৌরবিদ্যুতের প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের দাম সাধারণ ভোক্তার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে নবনির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে আসছে। সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সামগ্রিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেশের সমস্ত সরকারি দপ্তরের ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের আওতায় আনার একটি বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত মে মাসে সরকারের জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশের প্রতিটি জেলার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কাছে একটি সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশনা পাঠিয়েছেন। এই নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রত্যেকটি সরকারি অফিসের ছাদে বাধ্যতামূলকভাবে সোলার প্যানেল স্থাপন করতে হবে। সরকারের এই পরিবেশবান্ধব ও সবুজ জ্বালানি নীতির অংশ হিসেবে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদ ভবনের ছাদে ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি দৃষ্টিনন্দন ও বৃহৎ সোলার প্যানেল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। সরকারের এই দূরদর্শী রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, শুল্ক বিভাগের বিপরীতমুখী নীতির কারণে বেসরকারি ও শিল্প খাতে এর সুফল পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানি विशेषज्ञोंর মতে, সরকারের ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের যে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা পূরণ করতে হলে বর্তমান শুল্ক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন অপরিহার্য। বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সমীকরণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, ছাদভিত্তিক বা ডিস্ট্রিবিউটেড সোলার সিস্টেমকে এভাবে উচ্চ শুল্কের যাঁতাকলে পিষ্ট করে রাখলে দেশের সামগ্রিক শিল্প খাত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। গ্রিডভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলো সব সুবিধা পাবে আর ক্ষুদ্র ও মাঝারি ছাদভিত্তিক প্রকল্পগুলো বৈষম্যের শিকার হবে—এমন নীতি কোনোভাবেই টেকসই হতে পারে না।
শফিকুল আলম আরও বলেন:
“১ মেগাওয়াট সক্ষমতার সোলার যন্ত্রপাতি আমদানির সময় সরকার হয়তো সাময়িকভাবে একবারের জন্য কিছু শুল্ক বা রাজস্ব আয় করছে। কিন্তু এই ১ মেগাওয়াট সোলার প্যানেল তার ২৫ থেকে ৩০ বছরের দীর্ঘ জীবনচক্রে (Life Cycle) যে পরিমাণ পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে, তা দেশের রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ গুণ বেশি মূল্যের আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি (যেমন তেল, গ্যাস ও কয়লা) সাশ্রয় করবে।”
ফলে সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি শুল্ক আদায়ের লোভ ত্যাগ করে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেওয়া। তিনি পরামর্শ দেন, সরকার যদি আগামী পাঁচ বছরের জন্য সৌরবিদ্যুতের সমস্ত যন্ত্রাংশের ওপর থেকে পুরোপুরি শুল্ক প্রত্যাহার করে একটি ‘ট্যাক্স হলিডে’ ঘোষণা করে, তবে দেশে দ্রুত সোলার ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে। এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে লক্ষণীয় সক্ষমতা তৈরি হওয়ার পর সরকার চাইলে পুনরায় নিয়মতান্ত্রিক শুল্ক আরোপ করতে পারে। একই সাথে ওজন মেপে শুল্ক নির্ধারণের মতো প্রাচীন ও জটিল পদ্ধতি পুরোপুরি পরিহার করে আধুনিক ও ব্যবসাবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা জরুরি।
বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং ডলার সাশ্রয়ের জন্য সৌরবিদ্যুতের চেয়ে উত্তম ও নিরাপদ বিকল্প আর কিছু নেই। সরকারি দপ্তরের পাশাপাশি দেশের কলকারখানা এবং ব্যক্তিগত আবাসন খাতের ছাদগুলোকে যদি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়, তবে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও ব্যবসাবান্ধব নীতি। একদিকে সবুজ জ্বালানির প্রচার এবং অন্যদিকে উচ্চ করের বোঝা—এমন বিপরীতমুখী অবস্থান থেকে রাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসতে হবে। শুল্ক ব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার এবং আমদানির জটিলতা দূর করার মাধ্যমেই কেবল সৌরবিদ্যুৎকে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ