• শনিবার, ২৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৩ পূর্বাহ্ন
Headline
যৌন কেলেঙ্কারির ক্ষতিপূরণ দাবি ৯৮ কোটি, অভিনেত্রী পেলেন ৫ কোটি ছাদের অব্যবহৃত পরিসরে বছরে ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের মেগা পরিকল্পনা আলোচনায় ইউনাইটেড এর যুবদলে খেলা বাংলাদেশী বংশদ্ভূত মোহাম্মদ নেহাল ৩ মিনিটের যে ব্যায়াম ৯০ মিনিটের ওয়ার্কআউটের চেয়েও বেশি কার্যকর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মস্তিষ্কে মিথ্যা তথ্যের বিষবাষ্প: শত কোটি ডলারের গোপন ইসরায়েলি প্রচার অভিযান হিমালয়ের চূড়ায় গলিত বরফের তাণ্ডব: উজানের আকস্মিক ঢল কি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদের পদধ্বনি? সৈকতের বালিয়াড়ি কেটে সড়ক নির্মাণ: পরিবেশের ঝুঁকি ও আইনি নোটিশের মুখে কাজ স্থগিত ছয় মাসের যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কী পেল, কী হারাল? নারীদের উন্নয়ন হলে দেশ এগিয়ে যাবে : সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সরকারি খাতে কোথায় কত ঘুষ: ৮০৪টি অভিযোগে ১৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার দাবি

হিমালয়ের চূড়ায় গলিত বরফের তাণ্ডব: উজানের আকস্মিক ঢল কি বাংলাদেশের জন্য মহাবিপদের পদধ্বনি?

Reporter Name / ০ Time View
Update : শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬

উত্তরের সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের সমতল ভূখণ্ড থেকে শত শত মাইল দূরে অবস্থিত হলেও তার ভৌগোলিক অভিঘাত ও পরিবেশগত বিপর্যয় সমতলের জন্য কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল চীন-নেপাল সীমান্তের সাম্প্রতিকতম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গত ২৬ আগস্ট নেপালের রসুয়া ও নোয়াকোট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পাহাড়ি নদীগুলোতে কোনো ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত ছাড়াই নেমে আসে স্মরণকালের অন্যতম বিধ্বংসী কাদার ঢল। মুহূর্তের মধ্যে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যায় একের পর এক পাহাড়ি জনপদ, বাসস্থান, রিসোর্ট এবং প্রায় ৪৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। শত শত দেশি-বিদেশি পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের প্রাণহানি এবং নিখোঁজ হওয়ার এই ঘটনা কেবল একটি পাহাড়ি জনপদের স্থানীয় বিপর্যয় নয়, বরং অভিন্ন নদী অববাহিকায় অবস্থিত সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভাটি অঞ্চলের জন্য এক চরম ভূ-প্রাকৃতিক সতর্কবার্তা।
সাধারণত অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট পাহাড়ি ঢলের সাথে এই আকস্মিক বন্যার কোনো মিল ছিল না। ভূ-বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ ছিল সুউচ্চ পর্বতচূড়ায় জমাট বাঁধা বিশাল এক হিমবাহী শিলা ও তুষারস্তূপের আকস্মিক ধস। তিব্বত ভূখণ্ডে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার মৃদু ভূকম্পনের তরঙ্গের সাথে সাথে পাহাড়ের আলগা হয়ে থাকা লাখ লাখ টন ওজনের পাথুরে বরফের স্তূপ সরাসরি নিচে আছড়ে পড়ে। এতে সীমান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া লেন্ধে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে কৃত্রিম জলাধারের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পানির প্রবল চাপে সেই জমে থাকা পাথুরে কাদার বাঁধ ভেঙে গিয়ে নিচে অবস্থিত নদী অববাহিকায় প্রলয়ংকরী রূপ ধারণ করে নেমে আসে। এই ঘটনা নেপালের জন্য প্রথম নয়; এর আগেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভুটকোশী নদীর অববাহিকায় অনুরূপ ঢল নেমেছিল এবং এক দশক আগে ভারতের কেদারনাথে একই ধরনের বিপর্যয়ে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ছয় হাজার নিরীহ মানুষ।
হিমালয় অঞ্চলের এই ভঙ্গুর পরিস্থিতির বিষয়ে আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক যুগান্তকারী গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ চার দশক ধরে হিমালয় পর্বতমালার চার ভাগের এক ভাগ বরফ সম্পূর্ণ গলে নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভারত, চীন, নেপাল ও তিব্বত জুড়ে দীর্ঘ ৪০ বছরের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জোশুয়া মরারের নেতৃত্বাধীন বিজ্ঞানীদের দল প্রমাণ করেছিলেন যে, ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের তুলনায় ২০০০ সালের পর থেকে হিমবাহ গলার গতি দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতি বছর গড়ে দেড় ফুটের বেশি পুরুত্বের বরফ গলে তরল হয়ে যাচ্ছে, যা পর্বতের স্থিতিশীলতাকে ভেতরে ভেতরে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই মহাদুর্যোগের জন্য কেবল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দায়ী নয়, বরং তথাকথিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের নামে মানুষের অপরিমিত লোভ ও বেপরোয়া হস্তক্ষেপও সমভাবে দায়ী। হিমালয় মূলত ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটের সার্বক্ষণিক সংঘর্ষস্থলে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম সিসমিক বা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। এমন একটি সংবেদনশীল ভঙ্গুর ভূতাত্ত্বিক বলয়ে নির্বিচারে বনাঞ্চল উজাড় করা, বড় বড় কংক্রিটের পাঁচতারকা হোটেল ও রিসোর্ট গড়ে তোলা এবং জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে বিস্ফোরক ব্যবহার করার ফলে পাহাড়ের মূল ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সামান্য ঝাঁকুনিতেই আস্ত পাহাড়ের খণ্ড নদীতে আছড়ে পড়ে নদীর বুক আটকে দিচ্ছে, যা পরবর্তীতে নিচের জনপদের দিকে মৃত্যুদূত হয়ে ধেয়ে আসছে।
এই পাহাড়ি বিপর্যয়ের চূড়ান্ত মাশুল গুনতে হতে পারে বাংলাদেশকেই। নদীমাতৃক বাংলাদেশের তিন প্রধান নদী—গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার মূল উৎসধারা হিমালয়ের বরফগলা পানি থেকেই উৎসারিত। উজানের পাহাড়ি ঢল, কাদা ও অতিরিক্ত জলরাশি ভারত হয়ে বাংলাদেশের বুক চিরে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পতিত হয়। জাতিসংঘের এক আন্তর্জাতিক পরিবেশ প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার ফলে আগামী দশকগুলোতে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যার তীব্রতা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং গঙ্গা অববাহিকায় ১০৮ শতাংশ পর্যন্ত বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেতে পারে। চীন বা নেপালের পাহাড়ি নদীতে বরফধস বা লেক ফেটে সৃষ্ট কাদার ঢল যদি ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা দিয়ে বাংলাদেশের দিকে ধেয়ে আসে, তবে কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই দেশের উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের উর্বর ফসলি জমি, চরাঞ্চল ও কোটি মানুষের বসতি চোখের পলকে পলি ও কাদার নিচে ঢাকা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতি আরও বেশি ভীতিকর কারণ চীন-নেপাল সীমান্তের উজানের নদীগুলোতে এখনো বিপুল পরিমাণ পাথুরে কাদা ও পাহাড়ভাঙা আবর্জনার বিশালাকার বাঁধ জমে আছে। যেকোনো সময় সামান্য বৃষ্টি বা পাহাড়ি নড়াচড়ায় দ্বিতীয় দফায় আরও ভয়ংকর পানির স্রোত নেমে আসার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। অথচ ভাটির দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের কাছে এই ধরনের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহী লেক বিস্ফোরণ বা আকস্মিক ধসের কোনো আগাম স্যাটেলাইট তথ্য কিংবা সরাসরি সংকেত পৌঁছানোর সমন্বিত কাঠামো নেই।
আন্তর্জাতিক দুর্যোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই চীন, ভারত, নেপাল এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি বহুপক্ষীয় ও রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা কার্যকর করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পাহাড়ে কখন বরফের দেয়াল ধসে নদী আটকে যাচ্ছে বা লেক ফেটে যাচ্ছে, সেই খবর যদি বাংলাদেশ মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও না পায়, তবে দেশের উত্তরবঙ্গের এক বিশাল মানচিত্র রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। হিমালয়ের সাম্প্রতিক এই ধ্বংসযজ্ঞ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর মানুষের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শেষ সতর্কবার্তা। পরিবেশের এই অশনিসংকেত আমলে নিয়ে অবিলম্বে আঞ্চলিক সহযোগিতার কার্যকর বলয় গড়ে তোলা না হলে সমতলের ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশকে এক শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category