• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৫০ পূর্বাহ্ন

২৩৫ কোটির স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট: উদ্বোধনের আড়াই বছর পরও প্রশিক্ষণের মুখ দেখেনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউট

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

দেশের চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মান উঁচুতে তোলার মহৎ উদ্দেশ্যে আড়াইশো কোটি টাকারও বেশি অর্থ ব্যয় করে নির্মিত হয়েছিল বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট বা বিআইএইচএম। সাভারের নিভৃত প্রাঙ্গণে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুবিশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটির ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদ্বোধন করা হলেও বাস্তবে গত আড়াই বছরে একজন চিকিৎসকও সেখান থেকে কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করতে পারেননি। সুদৃশ্য অট্টালিকা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডরমিটরি এবং অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধার বিশাল এই আয়োজন আজ কেবল অবহেলা, অযত্ন আর দাপ্তরিক উদাসীনতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যখন জাতীয় পর্যায়ে চিকিৎসক ও মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের তীব্র আকাল চলছে, ঠিক তখনই কোটি কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা এমন একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রতিষ্ঠান ভুয়া পরিকল্পনা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার বেড়াজালে পড়ে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে রয়েছে।
২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে ভার্চুয়ালি এই প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করা হয়েছিল। অথচ দীর্ঘ আড়াই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও এর কোনো স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো বা জনবল কাঠামো তথা অর্গানোগ্রাম আজও চূড়ান্ত রূপ লাভ করেনি। সাভারের মূল প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ১৪ তলা প্রধান ভবনসহ ৯ তলা, ৮ তলা এবং জোড়া ৫ তলা ডরমিটরি ভবনগুলো ঘিরে কেবল সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে। নেই কোনো প্রকল্প পরিচালক কিংবা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। বিশাল এই রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন মাত্র তিনজন অসহায় কেয়ারটেকার, যাদের পক্ষে সাভারের এই প্রান্তিক এলাকায় এত বড় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বিধান করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছুদিনের জন্য সেখানে সেনাক্যাম্প স্থাপন করা হলেও গত জুন মাসে সেনা সদস্যরা চলে যাওয়ার পর থেকে কমপ্লেক্সটি আবার অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নামলেই বখাটে ও মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও মারাত্মক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির এই চরম ব্যর্থতা ও স্থবিরতার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশাসনিক দুর্বলতা কাজ করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিআইএইচএমের বর্তমান পরিচালক শফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, মূলত কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা প্রস্তুতি ছাড়াই রাজনৈতিক বাহবা পাওয়ার জন্য ২০২৩ সালে এই প্রকল্পটির তড়িঘড়ি উদ্বোধন করা হয়েছিল। গত এক বছর ধরে তিনি এই পদে দায়িত্ব পালন করলেও ভবনগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝে না পাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় জনবল বা লজিস্টিক সাপোর্ট না থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বারান্দায় বসে দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি রাজস্ব খাতে টিকিয়ে রাখার জন্য শুরুতে ১৩৮টি পদের একটি বড় প্রস্তাব দেওয়া হলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ৮৫টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে এবং সেই সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত এই দাপ্তরিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্য শেষ না হবে, ততদিন কোটি টাকার এই প্রজেক্ট থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাত এক ফোঁটাও উপকৃত হবে না বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশারদরা।
একদিকে যখন প্রধান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি তালাবদ্ধ ও জনশূন্য অবস্থায় পড়ে আছে, অন্যদিকে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্যখাতে প্রশিক্ষণের করুণ চিত্র উঠে এসেছে এক সাম্প্রতিক গবেষণায়। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার বা পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সার্বিক নির্দেশনায় দেশের আটটি বিভাগের বাইশটি সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে চালিত ওই গবেষণায় দেখা যায় যে, গত দুই বছরের মধ্যে প্রায় সতেরো শতাংশ চিকিৎসক কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণই পাননি। আর সাধারণ স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের এই ঘাটতির হার আরও অনেক বেশি, যা পঞ্চাশ থেকে বাষ্পান্ন শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। এমনকি যারা ভাগ্যক্রমে কোনো প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, প্রশাসনিক জটিলতা, প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব এবং লজিস্টিক সহায়তার ঘাটতির কারণে তারা সেই অর্জিত জ্ঞান কর্মক্ষেত্রে বা চিকিৎসালয়ে পুরোপুরি প্রয়োগ করতে পারছেন না। গবেষণায় অংশ নেওয়া চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ জানিয়েছেন যে, তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জিত হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত বাজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মারাত্মক অভাব রয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের এই বহুমুখী সংকটের কথা স্বীকার করে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত সম্প্রতি একটি জরুরি বৈঠকে জানিয়েছেন যে, সাভারের এই হেলথ ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করার জন্য মন্ত্রণালয় থেকে জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য প্রশাসকদের ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা ও গুণগত মান বৃদ্ধি করতে এই প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন। তবে সাধারণ মানুষ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জোরালো দাবি, কেবল আশ্বাস বা কাগুজে বৈঠকে সীমাবদ্ধ না থেকে অবিলম্বে বিআইএইচএমের অর্গানোগ্রাম অনুমোদন করতে হবে এবং পেশাদার জনবল নিয়োগ দিয়ে এটিকে একটি জীবন্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করতে হবে। অন্যথায় জনগণের ট্যাক্সের টাকায় গড়ে ওঠা এই বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ সম্পূর্ণ মাটি হয়ে যাবে এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category