• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৩:৪৪ অপরাহ্ন
Headline
কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য ‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা জ্বালানি মজুতে স্বস্তি, ডিসেম্বরেই খুলছে তৃতীয় টার্মিনাল: তথ্যমন্ত্রীর অভয়বাণী জিলহজের পুণ্যময় দিনগুলো: অফুরন্ত রহমত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ ২৬ হাজার কারখানায় এপ্রিলের বেতন বকেয়া: ঈদের আগে উৎকণ্ঠায় শ্রমিকরা পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ও পুরোহিতদের সরকারি ভাতা বাতিল নতুন পে স্কেলে কার কত লাভ? একনজরে দেখে নিন গ্রেড ও ভাতার চমক কোরবানির আগে পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে হাহাকার, বিপাকে হিন্দু খামারিরা মিত্রদের চাপে ইরানে হামলা স্থগিত ট্রাম্পের

২৬ হাজার কারখানায় এপ্রিলের বেতন বকেয়া: ঈদের আগে উৎকণ্ঠায় শ্রমিকরা

Reporter Name / ১ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ত্যাগের মহিমা ও ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ নিয়ে আর কয়েকদিন পরই মুসলিম উম্মাহর দুয়ারে কড়া নাড়বে পবিত্র ঈদুল আজহা। এই উৎসবকে ঘিরে দেশের প্রতিটি স্তরের মানুষের মাঝেই থাকে এক ধরনের আলাদা উন্মাদনা ও প্রস্তুতি। নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা, পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড় কেনা এবং কোরবানির পশু কেনার আনন্দ—সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করার কথা চারদিকে। কিন্তু এই উৎসবের আনন্দ যেন দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেই ঘাম ঝরানো পোশাক ও শিল্পশ্রমিকদের কাছে এক অধরা স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। উৎসবের ঠিক আগমুহূর্তে দেশের শিল্প অধ্যুষিত আটটি প্রধান এলাকার হাজার হাজার কারখানায় শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। শিল্প পুলিশের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট কারখানার এক-চতুর্থাংশের বেশি, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ কারখানায় এখনও শ্রমিকদের ঘামের দাম বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। দ্রব্যমূল্যের চরম ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে যখন সংসার চালানোই দায়, তখন ঈদের আগে খালি পকেটে বাড়ি ফেরার আশঙ্কায় বিনিদ্র রজনী পার করছেন হাজার হাজার প্রান্তিক শ্রমিক পরিবার।

শিল্প পুলিশের দেওয়া তথ্যের গভীরে দৃষ্টিপাত করলে দেশের শিল্পখাতের এই নাজুক ও অমানবিক চিত্রটি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। তাদের পরিসংখ্যান বলছে, আশুলিয়া, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, খুলনা, কুমিল্লা ও সিলেট—এই আটটি শিল্প অধ্যুষিত এলাকায় মোট কারখানার সংখ্যা ১০ হাজার ২৩৮টি। এর মধ্যে গতকাল বিকাল ৪টা পর্যন্ত মাত্র ৭ হাজার ৫৪০টি কারখানায় এপ্রিল মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। অর্থাৎ, এখনও ২ হাজার ৬৯৮টি কারখানার মালিক তাদের শ্রমিকদের পাওনা বুঝিয়ে দেননি। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক অবস্থা বিরাজ করছে ঐতিহ্যবাহী শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে। সেখানে অবস্থিত মোট ১ হাজার ৯৬০টি কারখানার মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় ৫৭ দশমিক ৩০ শতাংশ কারখানায় এখনও বেতন বকেয়া রয়েছে। এর অর্থ হলো নারায়ণগঞ্জের লাখ লাখ শ্রমিক জানেন না যে তারা আদৌ ঈদের আগে বেতন পাবেন কি না। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে সিলেট অঞ্চল, যেখানে ৯৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ কারখানায় এরই মধ্যে বেতন পরিশোধ সম্পন্ন হয়েছে।

দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠনগুলোর দিকে তাকালেও হতাশার চিত্রই চোখে পড়ে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) আওতাভুক্ত ১ হাজার ৭৯০টি সদস্য কারখানার মধ্যে এখনও ৩৯৫টি কারখানায় (প্রায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ) এপ্রিল মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের সদস্য ৭০৮টি কারখানার মধ্যে ২২৫টিতেই (৩১ দশমিক ৭৮ শতাংশ) শ্রমিকরা এখনও তাদের ন্যায্য পাওনা পাননি। আর সুতা ও কাপড় উৎপাদনকারী বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর সদস্য ৩৮২টি কারখানার মধ্যে ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ কারখানায় বেতন পরিশোধ করা হয়নি। তবে এর মধ্যে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা)। তাদের আওতাধীন ৩৯০টি কারখানার মধ্যে মাত্র আটটি কারখানা (২ দশমিক ৫ শতাংশ) বাদে বাকি সবাই বেতন পরিশোধ করেছে। মূলত ইপিজেডগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ বেশি থাকায় এবং সেখানে কমপ্লায়েন্স বা আইনি বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে মনিটরিং করা হয় বলেই মালিকরা বাধ্য হয়ে সঠিক সময়ে বেতন পরিশোধ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, সরকারের তদারকি সংস্থাগুলো কঠোর হলে মালিকরা শ্রমিকদের পাওনা আটকে রাখতে পারেন না।

তবে সবচেয়ে বড় বিপদে আছেন সেসব কারখানার শ্রমিকরা, যেসব কারখানা নির্দিষ্ট কোনো সংগঠনের আওতাভুক্ত নয়। শিল্প পুলিশের তথ্যমতে, আটটি এলাকায় এমন সাব-কন্ট্রাক্টে চলা বা অনিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার ৮৯২টি, যার মধ্যে ১ হাজার ৯৪০টিতে (২৮ দশমিক ১৫ শতাংশ) বেতন বকেয়া রয়েছে। এসব কারখানায় সাধারণত বড় কারখানাগুলোর উচ্ছিষ্ট বা উপচে পড়া কাজের অর্ডারগুলো সম্পন্ন করা হয়। এখানে কাজের কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নেই, নেই কোনো নিয়োগপত্র বা শ্রমিক অধিকারের ন্যূনতম নিশ্চয়তা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার বলে আসছে যে, এই ধরনের ‘ডার্ক ফ্যাক্টরি’ বা অঘোষিত কারখানাগুলোতে শ্রমিক শোষণ সবচেয়ে বেশি হয়। ঈদের আগে এই কারখানাগুলোর মালিকরা অনেক সময় কারখানায় তালা ঝুলিয়ে গা ঢাকা দেন, যার ফলে শ্রমিকদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।

পোশাক শিল্পের মালিকপক্ষ এই সংকটের পেছনে বৈশ্বিক এবং দেশীয় অর্থনীতির নানামুখী চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরছেন। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে পোশাকের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি, গত কয়েক বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম কয়েক দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে উৎপাদন খরচ বা ‘কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস’ অনেক বেড়ে গেছে। অনেক বিদেশি ক্রেতা সময়মতো পেমেন্ট ক্লিয়ার করছেন না বা পণ্যের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কারখানাগুলোর নগদ অর্থ প্রবাহের ওপর। কিন্তু অর্থনীতিবিদ এবং শ্রমিক অধিকার কর্মীরা মালিকদের এই অজুহাত পুরোপুরি মেনে নিতে নারাজ। তাদের যুক্তি হলো, ব্যবসায়ে লাভ-লোকসান থাকবেই, কিন্তু তার দায়ভার কেন সব সময় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশ, অর্থাৎ শ্রমিকদের ওপর চাপানো হবে? বছরের পর বছর ধরে এই শ্রমিকদের রক্ত জল করা পরিশ্রমের ওপর ভর করেই মালিকরা সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাই সংকটকালীন সময়ে নিজস্ব তহবিল থেকে হলেও শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা তাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা এবং সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের কথা মাথায় রেখে সরকার অবশ্য নড়েচড়ে বসেছে। আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সব কারখানায় শ্রমিকদের ঈদ বোনাস এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাসিক বেতন পরিশোধের জন্য ২১ মে পর্যন্ত চূড়ান্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের (টিসিসি) ৯৫তম এবং আরএমজি বিষয়ক ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের ২৪তম সভায় তিনি এই কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। এই ত্রিপক্ষীয় সভায় সরকার, মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শ্রমমন্ত্রীর এই নির্দেশনা যদি মালিকরা অমান্য করেন, তবে ঈদের আগে দেশের শিল্প এলাকাগুলোতে বড় ধরনের অরাজকতা তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

উক্ত সভায় শ্রমিক নেতারা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন যে, যদি নির্ধারিত সময়ে বেতন ও বোনাস পরিশোধ করা হয়, তবে শিল্পাঞ্চলে কোনো ধরনের শ্রমিক আন্দোলন, ভাঙচুর বা অসন্তোষ সৃষ্টি হবে না। শ্রমিকরা কখনোই চান না রাস্তায় নেমে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস বা লাঠিপেটা খেতে। তারা শুধু তাদের ঘামের ন্যায্য পাওনা নিয়ে পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে চান। তাই যেসব কারখানা এখনও বকেয়া বেতন পরিশোধ করেনি, সেগুলোর বিষয়ে সরকারের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী ও কলকারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তরকে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এর পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার বিষয়টিও সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে। প্রতি বছর ঈদের আগে লাখ লাখ শ্রমিক যখন একসাথে বাড়ির পথে রওনা হন, তখন মহাসড়কে তীব্র যানজট এবং পরিবহন সংকটের সৃষ্টি হয়। এই দুর্ভোগ এড়াতে শ্রমিক নেতারা বিশেষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানিয়েছেন।

শ্রমিকদের এই দাবির প্রেক্ষিতে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, শ্রমিকদের ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সরকার বদ্ধপরিকর। সড়কে যানজট এড়াতে এবং পরিবহনের ওপর হঠাৎ চাপ কমাতে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে বা ধাপে ধাপে কারখানাগুলো ছুটি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, বেতন-বোনাস পরিশোধ নিয়ে যাতে কোনো কারখানায় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় এবং সার্বিক নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয়, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসন, জেলা পুলিশ এবং শিল্প পুলিশকে বিশেষ ও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ঝুঁকিপূর্ণ কারখানাগুলোর তালিকা তৈরি করে আগাম নজরদারি বৃদ্ধি করেছে।

একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না, যদি সেই উন্নয়নের মূল কারিগররা অন্ধকার ও অনিশ্চয়তায় নিমজ্জিত থাকেন। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত আজ বিশ্বজুড়ে যে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে, তার পেছনে রয়েছে লাখ লাখ শ্রমিকের নীরব আত্মত্যাগ। তাই ঈদের এই পবিত্র ও আনন্দঘন মুহূর্তে কোনো শ্রমিকের বাড়ির চুলা যাতে নিভে না থাকে, কোনো শ্রমিকের সন্তান যাতে নতুন জামা থেকে বঞ্চিত না হয়, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র এবং মালিকপক্ষ উভয়েরই। নির্ধারিত ২১ মে তারিখের মধ্যে যদি বকেয়া বেতন পরিশোধ করা না হয়, তবে দেশের মহাসড়কগুলো হয়তো আবারও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের পদচারণায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে, যা দেশের ভাবমূর্তি এবং অর্থনীতি—উভয়ের জন্যই হবে চরম আত্মঘাতী। এখন দেখার বিষয়, সরকারের এই হুঁশিয়ারি এবং মালিকদের শুভ বুদ্ধির উদয় শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের মুখে ঈদের হাসি ফোটাতে পারে কি না।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category