• শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৫:৫১ অপরাহ্ন
Headline
এনআইডি সংশোধন: স্বচ্ছতা আনার যুক্তিতে সাধারণ মানুষের হয়রানি ৪৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দেওয়া যাবে মাত্র ১০ ঘণ্টায়! কী এই টেকনাফ-তেঁতুলিয়া করিডোর? মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো শিরোনাম: আসিফ মাহমুদকে কটাক্ষ করে নীলার স্ট্যাটাস: ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’

৪৮ ঘণ্টার পথ পাড়ি দেওয়া যাবে মাত্র ১০ ঘণ্টায়! কী এই টেকনাফ-তেঁতুলিয়া করিডোর?

Reporter Name / ২ Time View
Update : শনিবার, ২ মে, ২০২৬

একসময় আমাদের অবকাঠামোগত স্বপ্নগুলো ছিল অত্যন্ত সাদামাটা। স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল আমাদের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল কেবল কিছু পাকা সড়ক আর কালভার্টের মধ্যে। গত এক দশকে আমরা সাহস করেছি বড় বড় সেতু আর মেট্রোরেলের মতো প্রজেক্টের। কিন্তু ২০২৬ সালের এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যে মেগা প্রজেক্টের নীল নকশা তৈরি করছে, তার সামনে অতীতের সব অর্জন কেবল ম্লান নয়, বরং ক্ষুদ্র মনে হতে পারে।

প্রকল্পটির নাম ‘তেঁতুলিয়া-টেকনাফ ইকোনোমিক করিডোর’। বর্তমান বিএনপি (BNP) সরকারের এই মাস্টার প্ল্যান কেবল একটি গতানুগতিক রাস্তা বা রেললাইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এমন এক সুপার এশিয়ান হাইওয়ে, যা বাংলাদেশকে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ (Land Bridge) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছে। বিশাল এই পরিকল্পনা বদলে দেবে আপনার দেশ, আপনার শহর এবং আপনার পকেটের পরিস্থিতি।

মেগা প্রকল্পের রূপরেখা ও অর্থায়ন

প্রায় ৭৯ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি হবে এই সুপার এশিয়ান হাইওয়ে, হাই-স্পিড রেলওয়ে এবং উন্নত শিল্পাঞ্চল। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এখানে তিন ধাপে বিনিয়োগ করছে। প্রথম তিন বছরে ২০ বিলিয়ন এবং পরবর্তী সাত বছরে ৪৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। লক্ষ্য একটাই—টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক অত্যাধুনিক করিডোর তৈরি করা, যেখানে থাকবে হাই-স্পিড ইলেকট্রিক ট্রেন এবং সুপার হাইওয়ে।

যোগাযোগে বৈপ্লবিক গতি: সময় কমবে ৮৭%

এই করিডোরের মূল লক্ষ্য সময়কে জয় করা। কল্পনা করুন, টেকনাফ থেকে একটি কার্গো ছাড়লে বর্তমানে যেখানে ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে, এই করিডোর দিয়ে তা পৌঁছাবে মাত্র ১০ ঘণ্টায়! এটি পরিবহনের সময় কমাবে প্রায় ৮৭ শতাংশ এবং লজিস্টিক খরচ কমাবে অন্তত ৪৭ শতাংশ। এই গতি কেবল গাড়ির নয়, এই গতি আমাদের অর্থনীতির।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘ল্যান্ড ব্রিজ’

এই হাইওয়েটি উত্তরে চীন, নেপাল, ভুটান এবং ভারতকে সংযুক্ত করে সরাসরি মিয়ানমার হয়ে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের মতো আসিয়ান (ASEAN) দেশগুলোর বিশাল মার্কেটের সাথে বাংলাদেশকে যুক্ত করবে। এটি মূলত এশিয়ান হাইওয়ে-১ এবং এশিয়ান হাইওয়ে-২ এর সাথে যুক্ত হবে। সহজ কথায়, বাংলাদেশ হতে যাচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগের নাভিকেন্দ্র। এই অঞ্চলগুলোর সব পণ্য এই ল্যান্ড ব্রিজ ব্যবহার করে যাতায়াত করবে, যার ফলে ট্রানজিট ফি এবং বাণিজ্যিক সুযোগ থেকে বাংলাদেশ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করবে।

কৃষিপণ্যের ‘ভ্যালু এডিশন’ ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্প

যোগাযোগের পাশাপাশি এই করিডোর সংলগ্ন ১০০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক সব সাব-ইকোনোমিক জোন।

  • কৃষিতে বিপ্লব: উত্তরবঙ্গের কৃষিপণ্য সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে যাবে রপ্তানির জন্য। দিনাজপুরের লিচু গাছ থেকে পাড়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরে।

  • ভ্যালু এডিশন (Value Addition): উত্তরবঙ্গের আলু শুধু সবজি হিসেবে বিক্রি হবে না, বরং তা রূপান্তরিত হবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রেড অ্যালকোহল এবং স্টার্চে; যার বাজারমূল্য সাধারণ আলুর চেয়ে বহুগুণ বেশি। টমেটো থেকে উন্নত মানের সস ও পাউডার তৈরি করে সরাসরি আসিয়ান দেশগুলোতে রপ্তানি করা হবে।

  • টেক-ইন্ডাস্ট্রি: এর সাথে যোগ হবে হাই-ভ্যালু সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি। সরকারের পরিকল্পনা হলো, করিডোরের আশেপাশে ইলেকট্রনিক্স চিপ উৎপাদনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাই-স্পিড কার্গোতে করে তা মোংলা বা চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে দেওয়া।

স্মার্ট করিডোর ও সবুজ জ্বালানি (Green Energy)

হাইওয়ের পাশ দিয়ে লম্বালম্বিভাবে স্থাপন করা হবে সোলার ইলেকট্রিক প্রজেক্ট, যা থেকে প্রায় ১৫০০ থেকে ২৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এই বিপুল পরিমাণ সবুজ শক্তি ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে ‘কার্বন ক্রেডিট’ বিক্রি করে প্রতি বছর কয়েক মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে। এটি হবে একটি ‘স্মার্ট করিডোর’, যেখানে ফাইভ-জি (5G) নেটওয়ার্ক এবং আইওটি (IoT) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আধুনিকায়নের এক সম্মিলিত প্যাকেজ নিশ্চিত করা হবে।

অর্থনৈতিক আউটপুট: মাথাপিছু আয় ১২ হাজার ডলার

এডিবি বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই করিডোর অঞ্চলের সম্মিলিত অর্থনৈতিক আউটপুট ৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে বহুগুণ বেড়ে যাবে। শুধু এই একটি করিডোরই বাংলাদেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত ১.৫ থেকে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যোগ করবে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১২ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

এই ডিজিটাল যুগে কেবল সেকেলে অবকাঠামো দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। কৃষিপণ্যকে হাই-ভ্যালু ইন্ডাস্ট্রিয়াল পণ্যে রূপান্তর করার এই ভিশন নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর দুর্নীতির শক্ত দেয়াল ভেঙে, এডিবির অর্থায়ন আর সরকারের সদিচ্ছা কি সত্যিই পারবে এই সুপার হাইওয়েকে বাস্তবে রূপ দিতে?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category