দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলার সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী বর্তমানে এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন যানবাহন সংকটের মুখোমুখি হয়েছে | মাঠপর্যায়ে পুলিশের অপারেশনাল কার্যক্রম চালাতে গিয়ে পুরনো, লক্কড়ঝক্কড় ও জরাজীর্ণ যানবাহনের কারণে প্রতিনিয়ত চরম বাধা ও বিপত্তির সৃষ্টি হচ্ছে | সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে যে, দেশের পুলিশ বাহিনীর ব্যবহৃত মোট যানবাহনের প্রায় চৌষট্টি শতাংশেরই নির্ধারিত আয়ুষ্কাল বা মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে | দীর্ঘ দশ থেকে বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই পুরোনো গাড়িগুলোর ফিটনেস, ইঞ্জিন ও যন্ত্রাংশ নিয়মিত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় অপরাধ সংঘটনের আগে বা পরে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় ধরনের ছন্দপতন ঘটছে | অপরাধী শনাক্তকরণ, টহল পরিচালনা কিংবা জরুরি উদ্ধার অভিযানে গিয়ে মাঝপথে গাড়ি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে, যা সার্বিক জননিরাপত্তার জন্য একটি বড় অশনিসংকেত হয়ে দেখা দিয়েছে |
পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করতে হলে দেশের থানাগুলোতে বর্তমান যাতায়াত ব্যবস্থার বাস্তব চিত্রের দিকে তাকাতে হবে | সরকারি তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশজুড়ে জেলা ও মহানগর পুলিশের অধীন মোট ছয়শত উনচল্লিশটি প্রশাসনিক থানা রয়েছে, যার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২৪টি রেলওয়ে থানা এবং ৭৩টি হাইওয়ে থানা | কিন্তু বিশাল এই ভৌগোলিক এলাকার নিরাপত্তায় নিয়োজিত ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় বর্তমানে সচল টহল ও অপারেশনাল গাড়ি রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি | সহজ হিসাবে প্রতিটি থানায় গড়ে দুটি গাড়িও বরাদ্দ নেই, যা দিয়ে প্রায় ১ লক্ষ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে নিয়মিত টহল এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা রীতিমতো অসম্ভব এক ব্যাপার | যখন কোনো থানার একটিমাত্র টিম কোনো জরুরি অভিযানে বের হয়, তখন বাকি বিশাল এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ পুরোপুরি থমকে দাঁড়ায় | অথচ একটি আদর্শ থানার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে একই সময়ে একাধিক স্থানে টহল দেওয়ার জন্য অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহল যানের সুব্যবস্থা থাকা বাধ্যতামূলক |
পুলিশের এই অভ্যন্তরীণ পরিবহন সংকটের তীব্রতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল বিগত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নজিরবিহীন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলো | অভ্যুত্থানের পটপরিবর্তনের আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত থানা, পুলিশ ফাঁড়ি এবং তদন্ত কেন্দ্রগুলোতে সংঘটিত হামলায় পুলিশ বাহিনীর প্রায় এক হাজার ৫৯টি যানবাহন সম্পূর্ণ ভস্মীভূত কিংবা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল | রাজধানী ঢাকার ডিএমপির ৫০টি থানার ২১টিসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ২১৬টি পুলিশি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আগুন দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ১৩টি থানাও সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল | এর বাইরে শত শত সরকারি জিপ, পিকআপ ও মোটরযান আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নির্বিচারে ভাঙচুর করা হয় | এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের ফলে থানা ও ফাঁড়িগুলোতে যানবাহনের ব্যবস্থাপনা একেবারে ভেঙে পড়ে এবং পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অতিরিক্ত গাড়ির জন্য জরুরি ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো স্থায়ী সুরাহা হয়নি |
দীর্ঘ টালবাহানা ও কড়াকড়ির পর অবশেষে পুলিশ বাহিনীর এই পরিবহন খরা কাটাতে সম্প্রতি সরকার একটি বড় ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে | সরকারি অর্থায়নে দুটি বড় প্রকল্পের আওতায় মোট ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি নতুন আধুনিক যানবাহন কেনার একটি সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে | পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায় যে, এই মেগা প্রকল্পের অধীনে ‘পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ খাতে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সাধারণ কার্যক্রমের উপযোগী প্রায় ৪ হাজার ৮২৯টি গাড়ি কেনা হবে | এর বাইরে দ্বিতীয় আরেকটি বিশেষায়িত প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও ১ হাজার ১টি বিশেষ ধরনের গাড়ি সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে | ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে শুরু করে ২০২৯ সালের জুনের মধ্যে এই প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে পুলিশের বর্তমান গাড়ি সংকট দীর্ঘমেয়াদে কিছুটা হলেও লাঘব হবে বলে আশা করা হচ্ছে |
নতুন এই গাড়ি ক্রয়ের কার্যক্রমে কেবল সাধারণ জিপ বা পিকআপ নয়, বরং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ, অপরাধ তদন্ত এবং দুর্গম এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত যানবাহনের ওপরও বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে | প্রস্তাবিত বিশেষায়িত প্রকল্পের আওতায় অল-টেরেন ভেহিকল বা এটিভি, মোবাইল কমান্ড সেন্টার এবং অপরাধস্থল থেকে দ্রুত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আলামত সংগ্রহের জন্য ফরেনসিক ভ্যান ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে | মোবাইল কমান্ড সেন্টারগুলো মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে কাজ করবে, যার মাধ্যমে আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে যেকোনো বড় ধরনের সংঘাত বা জনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর সরাসরি নজরদারি ও সমন্বয় করা সম্ভব হবে | এছাড়া এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অংশ হিসেবে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক মেরামতের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং ৯৬০ জন চালক ও মেকানিককে দেশীয় ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করারও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছে |
তবে এত বড় আয়োজনের পরেও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন যে, নতুন যানবাহন হাতে পেতে আগামী তিন বছরের বেশি সময় লেগে যেতে পারে, যা বর্তমান তীব্র সংকটের সাপেক্ষে অত্যন্ত দীর্ঘ সময় | অনেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, নতুন গাড়ি আসার আগ পর্যন্ত এই জরাজীর্ণ ও ফিটনেসহীন যানবাহনগুলো দিয়েই তাদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে ডিউটি চালিয়ে যেতে হচ্ছে | অনেক সময় মহাসড়কে টহল দেওয়ার সময় গাড়ি হুট করে বন্ধ হয়ে গেলে ধাক্কা দিয়ে চালু করতে হয় কিংবা রাতের আঁধারে টর্চলাইট জ্বালিয়ে পথ চলতে হয় | কিছু ক্ষেত্রে গাড়ির সংকটের কারণে স্থানীয় পর্যায়ে রেন্টাল বা ভাড়ায় চালিত লেগুনা ও অন্যান্য যান ব্যবহার করে পুলিশকে অপারেশন চালাতে হয়, যা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও পেশাদারিত্বের পরিপন্থী |
পুলিশের পরিবহন নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা আছে যে একটি সরকারি গাড়ি আট বছরের বেশি সময় ধরে রাস্তায় চালানোর কোনো নিয়ম নেই, অথচ বাস্তবে আজ দেশের বিভিন্ন থানায় বিশ বছরেরও বেশি পুরনো লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি দিয়ে জরুরি সেবা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে | গাড়িগুলোর ব্রেক ফেল করা, সামনের অংশ থেঁতলে যাওয়া কিংবা সামান্য বৃষ্টিতেই ইঞ্জিন স্টার্ট না নেওয়ার মতো নিত্যদিনের যান্ত্রিক ত্রুটি পুলিশের অপারেশনাল গতিশীলতাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে | অপরাধ সংঘটনের খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা কিংবা আলামত সুরক্ষিত রাখার মতো মৌলিক কাজগুলো এই যাতায়াত সমস্যার কারণে ব্যাহত হচ্ছে | অপরাধীরা খুব সহজেই পুলিশের ধীরগতির এই সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছে |
পরিশেষে বলা যায়, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ঘটাতে হলে কেবল দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে বসে থাকলেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ের বর্তমান জরুরি সংকট উত্তরণে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য | নতুন ৫ হাজার ৮৩০টি যানবাহন ক্রয়ের প্রক্রিয়াটিকে স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল থানাগুলোকে গাড়ি বণ্টনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে | একটি আধুনিক, গতিশীল ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হলে তাদের চলাচলের আধুনিক বাহন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই | সরকারের নীতিনির্ধারকদের এটি অনুধাবন করতে হবে যে, পুলিশের চাকা সচল থাকলেই কেবল দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার চাকা নির্ভয়ে ও দ্রুতগতিতে ঘুরতে পারবে |
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর