• সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:২০ পূর্বাহ্ন
Headline
লবণের রাজত্বে বিপন্ন জীবন: তৃষ্ণার্ত উপকূলে এক কলস পানির যুদ্ধ অলিগলি পেরিয়ে মূল সড়কে রাজত্ব: অনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রযানের কবলে বিপন্ন জননিরাপত্তা ও অর্থনীতি পাম্পে হাহাকার, অথচ উপচে পড়ছে ডিপো: দেশীয় প্রতিষ্ঠানের অকটেন নিচ্ছে না সরকার মাঠে অরক্ষিত কৃষক: বজ্রপাত রোধের কোটি টাকার প্রকল্পগুলো গেল কোথায়? বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের

ব্রিটিশদের পতন ঘণ্টা বাজিয়েছিল সুয়েজ, হরমুজ কি আমেরিকার জন্য একই পরিণতি বয়ে আনবে?

Reporter Name / ২৫ Time View
Update : শনিবার, ২৮ মার্চ, ২০২৬
প্রতীকী ছবি

ইতিহাসের চাকা কি পুনরায় তার পুরোনো কক্ষপথে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে? ১৯৫৬ সালের ঐতিহাসিক সুয়েজ সংকট যেভাবে পরাক্রমশালী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়ে তাদের পতনের ঘণ্টা বাজিয়েছিল, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঠিক একই পরিণতি বয়ে আনবে? প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের সাম্প্রতিক এক গভীর বিশ্লেষণে এমনই এক চাঞ্চল্যকর ও সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৫৬ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জামাল আবদেল নাসের যখন সুয়েজ খাল জাতীয়করণের দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত নেন, তখন ক্ষুব্ধ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরায়েল সম্মিলিতভাবে মিসরে সামরিক অভিযান চালায়। সামরিক দিক থেকে তারা সে যুদ্ধে জয়লাভ করলেও, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে তাদের চরম পরাজয় ঘটে। তৎকালীন উদীয়মান পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং বিশেষ করে খোদ আমেরিকার প্রচণ্ড চাপে ব্রিটেন শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। সেই একটিমাত্র ভূ-রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ পাউন্ডের মান বিশ্ববাজারে ধসিয়ে দেয় এবং বিশ্ব রাজনীতিতে লন্ডনের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের চিরস্থায়ী অবসান ঘটায়। মূলত সুয়েজ সংকটের পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে আমেরিকার একচ্ছত্র উত্থান ঘটে।

বিশ্লেষকদের মতে, ঠিক ৭০ বছর পর আজ আমেরিকা যেন ইতিহাসের সেই একই সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। ইরানের সঙ্গে চলমান তীব্র উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির ভূকৌশলগত গুরুত্ব ওয়াশিংটনকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) বিশাল একটি অংশ এই অত্যন্ত সরু জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি কোনো কারণে ইরান এই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয় কিংবা বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়, তবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম রাতারাতি আকাশচুম্বী হবে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে ভয়াবহ মূল্যস্ফীতি ও মন্দার ধস নামবে, তা সামাল দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা বা স্থিতিস্থাপকতা বর্তমান আমেরিকার নেই বললেই চলে। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে হুথিদের হামলার কারণে বিশ্ববাণিজ্যে যে সংকট তৈরি হয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে তার মাত্রা হবে বহুগুণ বেশি প্রলয়ংকরী।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ তাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বিশাল ঋণের পাহাড়। ১৯৫৬ সালে ব্রিটেনের ঘাড়ে যে পরিমাণ ঋণের বোঝা ছিল, আজকের আমেরিকার অবস্থা তার চেয়েও অনেক বেশি শোচনীয়। বর্তমানে প্রায় ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল জাতীয় ঋণের চাপে জর্জরিত ওয়াশিংটনের পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি ও সর্বগ্রাসী যুদ্ধ চালানো প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্রিকস (BRICS) জোটের মতো উদীয়মান শক্তিগুলোর ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলারের আধিপত্য কমানোর নিরন্তর চেষ্টা, যা মার্কিন অর্থনীতির ভিত্তিমূল ধরে নাড়া দিচ্ছে।

অন্যদিকে, সামরিক সক্ষমতা ও মনোযোগের দিক থেকেও আমেরিকা এখন চরমভাবে বিভক্ত। ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে শুরু করে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য ঠেকানো—বিশ্বের সব প্রান্তেই এখন মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও বিপুল অর্থায়ন প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে কোল্ড ওয়ার বা স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে তারা যেভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ করে ছড়ি ঘুরিয়েছে, এখন আর সেই আগের মতো একক মনোযোগ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এই সামরিক অতি-বিস্তার বা ‘মিলিটারি ওভারস্ট্রেচ’ যেকোনো সাম্রাজ্যের পতনের একটি ধ্রুপদি লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

এর বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তিগুলোর, বিশেষ করে ইরানের অভাবনীয় উত্থান সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে। ১৯৫৬ সালের মিসরের সামরিক সক্ষমতার তুলনায় বর্তমানের ইরান বহুগুণ বেশি শক্তিশালী ও আধুনিক রণকৌশলে পারদর্শী। তাদের হাতে থাকা দূরপাল্লার নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সর্বাধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’ বা প্রতিরোধ বলয়ের (লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি, ইরাক ও সিরিয়ার সশস্ত্র গোষ্ঠী) কারণে আমেরিকা চাইলেই সরাসরি যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করতে পারবে না। বরং সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ভয়াবহ হামলার শিকার হবে।

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দাবি করা হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ সামরিক আধিপত্য মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ সমর্থন ও বিশাল সামরিক সহায়তার ওপরই টিকে আছে। যদি হরমুজ সংকট বা অর্থনৈতিক চাপে আমেরিকার প্রভাব এই অঞ্চলে কমতে শুরু করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তাও চরম হুমকির মুখে পড়বে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পিছুটান শুরু হলে ইসরায়েলের মতো রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকতে গিয়ে দারুণভাবে হিমশিম খাবে, যা ফিলিস্তিন প্রশ্নে সম্পূর্ণ নতুন ও ফিলিস্তিনিদের অনুকূল একটি সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

ইতিহাস দ্ব্যর্থহীনভাবে এই সাক্ষ্যই দেয় যে, কোনো পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য কখনো এক দিনে ধ্বংস হয় না। যখন কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির সামরিক ব্যয় তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে যায় এবং ভুল রাজনৈতিক কৌশলের কারণে অভ্যন্তরীণ ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই তার পতনের আনুষ্ঠানিক শুরু হয়। সুয়েজ খাল যেমন একসময় ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক দম্ভ চূর্ণ করে তাদের সাধারণ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, তেমনি হরমুজ প্রণালির উত্তাল জলরাশিও হয়তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসানের চূড়ান্ত কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশ্ব এখন আর কোনো একক পরাশক্তির হাতে বন্দি নেই, বরং এই বহুমুখী ভূ-রাজনৈতিক সংকটের হাত ধরে পুরো বিশ্ব এখন একটি ‘মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড’ বা বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থার দিকেই দ্রুতগতিতে ধাবিত হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category