যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী একটি সীমিত মাত্রার স্থল অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার মার্কিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনায় চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিলে চলমান এই সংঘাত এক নতুন এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রায় প্রবেশ করবে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি কোনো পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসন হবে না। বরং বিশেষ বাহিনী ও পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতির ঝটিকা অভিযান পরিচালনার ছক কষা হচ্ছে।
প্রধান লক্ষ্য: পারস্য উপসাগরে ইরানের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র ও প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র ‘খারগ দ্বীপ’ দখল করা।
কৌশলগত লক্ষ্য: হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম ইরানি সমরাস্ত্রগুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করা।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান: ট্রাম্প প্রশাসনের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান তাদের পারমাণবিক উচ্চাভিলাষ ও হুমকি বন্ধ না করলে ট্রাম্প তাদের জন্য ‘নরকের দুয়ার খুলে দিতে’ প্রস্তুত। তবে তিনি এও স্পষ্ট করেছেন যে, পেন্টাগনের এই প্রস্তুতি মানেই প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি যেকোনো পরিস্থিতির জন্য বিকল্প প্রস্তুত রাখা মাত্র।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার মাত্রা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ বেড়েছে। সরকারি তথ্যমতে, গত এক মাসে ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবে পৃথক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর।
তবে ইরানে স্থল অভিযানের বিষয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র জনরোষ ও বিরোধিতা রয়েছে:
স্থল অভিযানের বিরোধিতা: এপি এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর ঘোরবিরোধী। এই প্রস্তাবের পক্ষে সায় দিয়েছেন মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ।
বিমান হামলার সমর্থন: বিমান হামলার বিষয়ে জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। ৩৯ শতাংশ মানুষ এর বিপক্ষে থাকলেও ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা এর পক্ষে মত দিয়েছেন।
সামরিক বিশ্লেষকরা খারগ দ্বীপ দখলের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করেছেন। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মাইকেল আইজেনস্ট্যাডের মতে, ড্রোন ও কামানের গোলার মুখে ছোট্ট ওই দ্বীপে সেনাদের দীর্ঘসময় আটকে রাখা আত্মঘাতী হতে পারে। এর বদলে উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করে দ্রুত ফিরে আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ ধরনের অভিযানের জন্য ইতিমধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ নৌ ও মেরিন সেনা নিয়ে গঠিত ‘৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’কে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইআরজিসি সেখানে মরণপণ লড়াই করবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই এই যুদ্ধের বিরোধী। কিন্তু রিপাবলিকান শিবিরের ভেতরেও এখন ফাটল স্পষ্ট। ডেরেক ভ্যান অর্ডেন বা ন্যান্সি মেসের মতো কট্টর ট্রাম্প সমর্থক রিপাবলিকান নেতারা স্থল অভিযানের কড়া বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে, সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সরাসরি খারগ দ্বীপ দখলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিষয়টিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী ‘আইও জিমা’ যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে উভয় দলের তোপের মুখে পড়েছেন।