• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩১ অপরাহ্ন
Headline
বাবার হাজার কোটি টাকায় মোহ নেই, লন্ডনে সাধারণ চাকরি করেন অক্ষয়-পুত্র প্রধানমন্ত্রী ও জাইমা রহমানকে বাফুফেতে আমন্ত্রণ জানালেন অধিনায়ক আফিদা হাম-রুবেলার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে কাল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু আ. লীগকেও পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া উচিত: রাশেদ খান জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে আইএমএফের শর্তের কোনো সম্পর্ক নেই: অর্থমন্ত্রী সংসদে সরকারি দলের এমপিদের অঙ্গভঙ্গি: তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জামায়াত আমিরের ‘সরকার জ্বালানি সংকট নিয়ে মিথ্যাচার করছে’: সংসদে রুমিন ফারহানা কিউবার সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একজোট মেক্সিকো, স্পেন ও ব্রাজিল ইসরায়েলের অকুণ্ঠ প্রশংসায় ট্রাম্প, ঘনাচ্ছে নতুন বিতর্ক ‘ইরানকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করার ট্রাম্প কে?’: পেজেশকিয়ান

পারস্য উপসাগরের ঢেউয়ে কি তলিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যের অহংকার?

Reporter Name / ১৮ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২৬

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বিশ্বে একক পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে দাপট ছিল, ২০২৬ সালে এসে তা এক মহাক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্ব যে ‘ইউনিপোলার’ বা একমেরু কেন্দ্রিক ব্যবস্থার সাক্ষী হয়েছিল, আজ তা বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষ করে চীন ও রাশিয়ার পুনরুত্থান এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অনমনীয় প্রতিরোধ যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমান সংঘাত, অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা এবং ডলারের বিকল্প মুদ্রার উত্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে—বিশ্ব হয়তো এক নতুন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক শক্তির উৎস: সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তির লড়াই

ইতিহাস সাক্ষী, ভূ-রাজনীতিতে শক্তির প্রধান উৎস হলো সমরাস্ত্র ও প্রযুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র দশকের পর দশক ধরে উন্নত সামরিক উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তির জোরে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি নিশ্চিত করা। কিন্তু এই সমীকরণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় ইরান। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব কেবল শাহ পাহলভির পতন ঘটায়নি, বরং মধ্যপ্রাচ্য থেকে পশ্চিমা প্রভাব উচ্ছেদের এক নতুন মতাদর্শের জন্ম দিয়েছিল। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি ইসরায়েলকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার যে ডাক দিয়েছিলেন, তা আজও ইরানের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি।

মার্কিন অহমিকায় আঘাত এবং পারস্যের উত্থান

বিপ্লবের পরপরই তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৫২ জন নাগরিককে ৪৪৪ দিন জিম্মি রাখার ঘটনাটি ছিল পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য প্রথম বড় ধাক্কা। এরপর থেকে চার দশক ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল করার বদলে সামরিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করেছে। ইরাকের সঙ্গে আট বছরের দীর্ঘ যুদ্ধ ইরানকে শিখিয়েছে—নিজেদের টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হতে হবে। এই যাত্রায় তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া, চীন ও উত্তর কোরিয়া।

জায়নবানি বনাম পারস্য: সংঘাতের চার দশক

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইসরায়েল আরব বিশ্বের সঙ্গে একাধিক যুদ্ধে জয়লাভ করে নিজেদের সীমানা বাড়িয়েছে। তবে ১৯৭৯ সালের পর ইরান হয়ে ওঠে তাদের প্রধান শত্রু। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায়নি মধ্যপ্রাচ্যের কোনো মুসলিম দেশ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হোক। গত বছরের ১৩ জুন শুরু হওয়া ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ ছিল সেই প্রচেষ্টারই অংশ। ১২ দিনের সেই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার অত্যাধুনিক বি-২ স্টিলথ বিমান ব্যবহার করে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে ‘বাংকার ব্লাস্টার’ বোমা বর্ষণ করে। কিন্তু ইরানও দমে না গিয়ে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে এর জবাব দেয়।

২০২৬: যুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট ও খামেনি হত্যা

এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত এক চূড়ান্ত রূপ নেয়। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনিসহ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড ইরানকে এক মরণজয়ী যুদ্ধে নামিয়ে আনে। খামেনি হত্যার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে যে নজিরবিহীন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়।

সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ইরান ব্যবহার করে ‘হরমুজ প্রণালি’। এই পথটি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয় এবং খাদ্য ও সার উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস নামে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্বকে এমন এক চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।

একাকী যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর অনীহা

ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার ন্যাটো মিত্রদের পাশে পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সংকটে দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্পেন ইরান আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে মার্কিন যুদ্ধবিমানের জন্য তাদের আকাশপথ বন্ধ করে দিয়েছে। ফ্রান্সও একই পথে হেঁটেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত মিত্র যুক্তরাজ্য সাফ জানিয়ে দিয়েছে—“এটা আমাদের যুদ্ধ নয়।” জার্মানিও যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রাসন থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছে।

মিত্র দেশগুলো এখন নিজেদের অর্থনীতি নিয়ে বেশি চিন্তিত। যুদ্ধের কারণে উচ্চমূল্যে তেল কিনতে গিয়ে ইউরোপজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি প্রকট আকার ধারণ করেছে। নিজ দেশের জনগণের চাপ এবং মিত্রদের অনীহায় অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে। তেহরান একে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পষ্ট পরাজয়’ হিসেবে দেখছে।

নয়া বিশ্বব্যবস্থার পথে

মার্কিন ডলারের বদলে ইউয়ানের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কূটনৈতিক প্রভাব এবং রাশিয়ার সামরিক কৌশল প্রমাণ করছে যে, একক মোড়লের দিন শেষ হয়ে আসছে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তার দীর্ঘদিনের একক আধিপত্যের আসন থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। যদি ইরান ও তার মিত্ররা এই সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ বজায় রাখতে পারে, তবে ২০২৬ সালটি ইতিহাসে চিহ্নিত হবে—এক পরাশক্তির পতন এবং একটি বহুমুখী ‘নতুন বিশ্বব্যবস্থা’র সূচনালগ্ন হিসেবে।

নয়া বিশ্বব্যবস্থা বনাম মার্কিন আধিপত্য

২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল সূচক

মানদণ্ড মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা (অতীত) উদীয়মান বিশ্বব্যবস্থা (বর্তমান)
অর্থনৈতিক শক্তি একচ্ছত্র ডলারের রাজত্ব। ইউয়ান ও স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বৃদ্ধি।
সামরিক কৌশল ন্যাটো ও মিত্রদের নিয়ে আগ্রাসন। মিত্রদের অনীহা ও প্রক্সি যুদ্ধের প্রাধান্য।
জ্বালানি নিয়ন্ত্রণ পেট্রো-ডলারের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ। হরমুজ ও সুয়েজ সংকটে বাজারের অস্থিরতা।
কূটনৈতিক প্রভাব একক মেরু কেন্দ্রিক বিশ্ব (Unipolar)। বহুমুখী বিশ্ব (Multipolar)।
* সূত্র: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সংবাদ সংস্থা (২০২৬)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category