দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে বাংলাদেশে পেশাদার কূটনীতিকের বদলে একজন প্রবীণ রাজনীতিককে হাই কমিশনার হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। এই গুরুত্বপূর্ণ পদের জন্য ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বর্তমান বিজেপি নেতা ৭৫ বছর বয়সী দীনেশ ত্রিবেদীকে চূড়ান্ত করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। তিনি বর্তমান হাই কমিশনার ও পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হতে যাচ্ছেন। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা প্রণয় ভার্মাকে ইতোমধ্যে বেলজিয়াম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে বদলির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, দীনেশ ত্রিবেদীর মনোনয়নের বিষয়টি এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শেষ মুহূর্তে কোনো বড় পরিবর্তন না হলে পশ্চিমবঙ্গের ভোট শেষ হওয়ার পরপরই তাকে ঢাকায় পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন ‘ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট’ বা আইএফএস কর্মকর্তার পরিবর্তে একজন পোড়খাওয়া রাজনীতিককে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়াটা দিল্লির তরফ থেকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিরল পদক্ষেপ। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যথেষ্ট অবনতি ঘটে। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি ‘পলিসি রিসেট’ বা নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ঠিক এই সময়ে দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্তকে নরেন্দ্র মোদীর একটি ‘বিশেষ বার্তা’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে, এটি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতিকদের প্রতি এক ধরনের জবাবদিহির বার্তাও দিচ্ছে যে, প্রয়োজনে রাজনীতিকরাও কূটনীতির জটিল মাঠে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এর আগে বিহারের সাবেক রাজ্যপাল আরিফ মোহাম্মদ খানের নাম আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত দুই বাংলার সংস্কৃতিতে পারদর্শী ত্রিবেদীকেই বেছে নেওয়া হয়।
দীনেশ ত্রিবেদীর জন্ম এক গুজরাটি পরিবারে। হীরালাল ত্রিবেদী ও ঊর্মিলাবেন ত্রিবেদীর ছোট ছেলে দীনেশ হিমাচল প্রদেশের বোর্ডিং স্কুল থেকে পড়াশোনার পর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে কমার্সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। তিনি ঝরঝরে বাংলায় কথা বলতে পারেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে একজন অত্যন্ত দক্ষ সেতারবাদক। গুজরাটি হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, যা তাকে দুই বাংলার মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করেছে। দিল্লির সাউথ ব্লকের ধারণা, তৃণমূল পর্যায়ের এই বোঝাপড়া ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সেতুবন্ধনে দারুণ কাজে আসবে।
দীনেশ ত্রিবেদীর রাজনৈতিক জীবন বেশ বর্ণিল ও বৈচিত্র্যময়। আশির দশকে কংগ্রেসে যোগদানের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হলেও ১৯৯০ সালে তিনি জনতা দলে যোগ দেন এবং ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলে দীনেশ সেই দলে যোগ দিয়ে এর প্রথম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে ব্যারাকপুর আসন থেকে লোকসভা নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ সরকারে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরপর ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়লে দীনেশ সেই মন্ত্রণালয়ে বসেন, যদিও পরে দলের সাথে মতবিরোধের জেরে তাকে পদ ছাড়তে হয়। ২০১৯ সালে ব্যারাকপুর থেকে ফের প্রার্থী হয়ে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে গেলেও তৃণমূল তাকে রাজ্যসভায় পাঠায়। তবে ২০২১ সালের শুরুর দিকে তৃণমূলের সঙ্গে তার দূরত্ব চূড়ান্ত রূপ নেয় এবং ওই বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি রাজ্যসভা থেকে পদত্যাগ করে ৬ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দেন। এখন জীবনের এই পর্যায়ে এসে রাজনীতির মাঠ থেকে সরাসরি কূটনীতির ময়দানে তার এই পদার্পণ দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলাতে কতটা ভূমিকা রাখে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।