রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি ডিগ্রি কলেজে নারী প্রদর্শক (ডেমোনস্ট্রেটর) ও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মধ্যকার হাতাহাতি এবং জুতাপেটার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর জেরে এরই মধ্যে এক বিএনপি নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু পরীক্ষার মতো সংবেদনশীল সময়ে ক্যাম্পাসে ১৪৪ ধারা চলাকালীন ঠিক কী কারণে এমন নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো? ভাইরাল হওয়া একাধিক ভিডিও এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য থেকে উঠে এসেছে ঘটনার পেছনের ভিন্ন এক চিত্র।
গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দাওকান্দি সরকারি ডিগ্রি কলেজে পরীক্ষা চলছিল এবং নিয়ম অনুযায়ী কলেজ ক্যাম্পাস ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই সময় স্থানীয় বার্ষিক ওয়াজ মাহফিল উপলক্ষে কলেজ মাঠে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা এবং অনুষ্ঠানের খরচের জন্য কিছু টাকার দাবিতে স্থানীয় বিএনপি নেতারা অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করেন। এ নিয়ে কথাবার্তার একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুটি ভিন্ন ভিডিওতে ঘটনার দুটি আলাদা পর্যায় দেখা যায়:
অধ্যক্ষের কক্ষে (চড় ও জুতাপেটা): উত্তপ্ত বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে কলেজের নারী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা নিজের মোবাইল ফোনের ক্যামেরা চালু করে বিএনপি নেতাদের কর্মকাণ্ড রেকর্ড করার চেষ্টা করেন। এ সময় বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীর সাথে তার চরম তর্কাতর্কি শুরু হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, আলেয়া খাতুন প্রথমে চড়াও হন এবং শাহাদ আলীকে চড় মারতে উদ্যত হন (বা চড় মারেন)। এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় শাহাদ আলী নিজের পায়ের স্যান্ডেল খুলে ওই শিক্ষিকাকে বেধড়ক জুতাপেটা করতে শুরু করেন। অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকরা তাদের থামাতে গেলে তারাও হামলার শিকার হন।
ক্যাম্পাসের মাঠে (শিক্ষিকার পাল্টা আক্রমণ): ঘটনার জের কেবল অধ্যক্ষের কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্যাম্পাসের রাস্তার আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, নারী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরা জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীর ওপর চরম মারমুখী অবস্থায় চড়াও হয়েছেন এবং তাকে উপর্যুপরি আঘাত করছেন।

ঘটনার পর থেকে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন:
নারী প্রদর্শক আলেয়া খাতুন হীরার দাবি: “কলেজের পুকুরের টাকার জন্য তারা অধ্যক্ষকে মারধর করছিল। আমি এর প্রতিবাদ করায় আমাকে প্রকাশ্যে জুতা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।”
অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাকের দাবি: দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। তিনি কোনো পক্ষকে প্রশ্রয় না দেওয়ায় হিসাব চাওয়ার নামে এই হামলা চালানো হয়েছে।
বিএনপি কর্মী শাহাদ আলীর দাবি: ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে তিনি বলেন, “কলেজের ডেমোনস্ট্রেটর আলেয়াই প্রথম জনসম্মুখে আমার গায়ে হাত তুলেছেন।”
বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা আকবর আলীর দাবি: তিনি চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, “পূর্ববর্তী প্রশাসনের দুর্নীতির হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকেই আমাদের ওপর আগে হামলা করা হয়েছে।”
ঘটনার পরপরই বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে বহিষ্কার করা হয়। আহত শিক্ষকদের দাবি, আকবর আলীর নেতৃত্বেই ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী এই হামলায় অংশ নিয়েছিলেন।
অন্যদিকে, ঘটনার সময় পুলিশ ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। পরে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে কলেজে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।