• বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০২:১২ অপরাহ্ন

হাওরের মাঠে লোকসানের আবাদ

সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি / ৩ Time View
Update : বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬

বোরো মৌসুমের শুরুতে স্বপ্ন ছিল ভালো ফলনের। ঋণ করে, জমি বন্ধক রেখে, সংসারের শেষ সঞ্চয় ঢেলে হাওরের বুকে বীজ বুনেছিলেন কৃষকরা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। এক দিকে উৎপাদন খরচ গত বছরের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেড়ে মণপ্রতি দেড় হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে, অন্য দিকে বাজারে ভেজা ধান বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৬০০ টাকায়। তার উপর শ্রমিক সংকট, অবিরাম বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা ধান। সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলজুড়ে এখন শুধু হাহাকার আর নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার আর্তনাদ।


মণপ্রতি লোকসান ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা

এ বছর হাওরে বোরো ধান উৎপাদনে খরচ বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সার, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য বলছে, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এক মণ ধান উৎপাদনে বীজ রোপণ থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত সব মিলিয়ে গত বছর খরচ হতো এক হাজার ২০০ টাকা। এ বছর সেখানে আরও ১০০ টাকা যোগ হয়েছে। এর বাইরে ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সব মিলিয়ে এ বছর মণপ্রতি মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। বর্গাচাষিদের ক্ষেত্রে এই খরচ আরও বেশি — মণপ্রতি এক হাজার ৪০০ টাকারও উপরে।

অথচ মাঠে এখন ভেজা ধানের দাম মাত্র ৬০০ টাকা মণ। আধাশুকনো মোটা জাতের ধান মিলছে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়, শুকনো চিকন জাতের ধান ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়। আর আড়তে এনে বিক্রি করার পরও কৃষক পাচ্ছেন সর্বোচ্চ এক হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে প্রতি মণে কৃষকের নিট লোকসান হচ্ছে ৯০০ থেকে এক হাজার টাকারও বেশি।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সরকার প্রতি কেজি ধানের দাম নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা, যা মণপ্রতি দাঁড়ায় এক হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু কৃষি বিভাগের হিসাবেই মণপ্রতি উৎপাদন খরচ সেই দামের চেয়ে বেশি। আর বাজারে যা দাম পাওয়া যাচ্ছে, তা সরকারি দামের মাত্র অর্ধেকেরও কম।


শ্রমিক সংকটে বিপর্যস্ত ধান কাটা

শুধু দামের সমস্যাই নয়, এ বছর হাওরের কৃষকরা ধান কাটার শ্রমিক পেতেও চরম বিপাকে পড়েছেন। বজ্রপাতের ভয়ে শ্রমিকরা হাওরের মাঠে নামতে রাজি হচ্ছেন না। এতে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। যারা কাজে রাজি হচ্ছেন, তাদের দিতে হচ্ছে এক হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি, যা আগে ছিল মাত্র ৭০০ টাকা।

সমস্যা হলো, একেকজন শ্রমিক দিনে ছয়-সাত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ দুই মণ ধান কাটতে পারেন। হিসাব করলে দাঁড়ায় প্রতি মণ ধান কাটতেই শ্রমিক খরচ ৫০০ টাকা। অথচ সেই ধান বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকায়। শুধু শ্রমিক আর পরিবহন খরচ মেটাতেই কৃষকের প্রায় পুরো বিক্রয়মূল্য শেষ।

হারভেস্টার মেশিনের উপর নির্ভরতাও কমেনি হাওরে। কিন্তু সেখানেও সমস্যা। হাওরে পানি থাকায় অনেক জায়গায় মেশিন চালানো যাচ্ছে না। যেখানে চালানো যাচ্ছে, সেখানে মেশিন মালিকরা চাইছেন ইচ্ছামতো ভাড়া। এক কানি বা ৩৬ শতাংশ জমির ধান কাটতে নেওয়া হচ্ছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। এত খরচ গুনে ধান কাটার পরও লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না কৃষকরা।

এই অবস্থায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে পাইকার ডেকে জমিতেই ভেজা ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন। কারণ শ্রমিকের মজুরি ও মাড়াই খরচ নগদ দিতে হয়, হাতে নগদ টাকা নেই। ক্ষেতের ধানই তাদের একমাত্র নগদ সম্পদ।


বৃষ্টি আর ঢলে ডুবল হাওর, নষ্ট হলো শুকানো ধানও

শ্রমিক সংকট আর দামের যন্ত্রণার মধ্যেই প্রকৃতি যেন চূড়ান্ত আঘাত হানল। টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জের হাওরে ব্যাপক বন্যা দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জের সদর, শান্তিগঞ্জ, শাল্লা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ছোট-বড় ২০টি হাওর তলিয়ে গেছে। কমপক্ষে ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান এখন পানির নিচে।

কিশোরগঞ্জের অবস্থাও করুণ। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অষ্টগ্রামে ৪৭০ হেক্টর, ইটনায় ২৫৩ হেক্টর, মিঠামইনে ১০০ হেক্টর, বাজিতপুরে ১২ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ১০ হেক্টর — মোট ৮৪৫ হেক্টর বোরো ধান পানিতে ডুবে গেছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, শুধু অষ্টগ্রামের খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়নেই অন্তত দুই হাজার হেক্টর পাকা ধান পানির নিচে। প্রকৃত ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

নিকলী আবহাওয়া কার্যালয়ের তথ্য বলছে, মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিন সোমবার ২৪ ঘণ্টায় ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। বুধবারও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

বন্যার ক্ষতি শুধু মাঠের ধানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। যেসব কৃষক কষ্টে ধান কেটে শুকানোর জন্য মাঠে রেখেছিলেন, ভারী বৃষ্টিতে সেই ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া ক্রমাগত মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির কারণে কাটা ধান শুকানোই যাচ্ছে না। শুকাতে না পারায় ধানের রং নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, ফলে বাজারে দামও পাওয়া যাচ্ছে না।


কালনী নদী ভরাট — বারবার বিপর্যয়ের কারণ

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ও খয়েরপুর এলাকায় প্রতি বছর বন্যার একটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। খোয়াই নদ দিয়ে উজানের পানি লাখাই উপজেলার মাদনা হয়ে কালনী নদীতে এসে পড়ে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে কালনী নদী ভরাট হয়ে পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীতে বাঁধ দিয়ে মাছ শিকার করেন স্থানীয় জেলেরা। ফলে উজানের পানি কালনী নদী দিয়ে নামতে পারে না, যার কারণে প্রতি বছরই অষ্টগ্রাম ও খয়েরপুর-আবদুল্লাহপুর এলাকায় হাওর তলিয়ে যাচ্ছে। নদী খননের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় সমস্যাটি কেবল বছরের পর বছর জিইয়ে থাকছে।


চাষের লাভ কার? কৃষক নয়, ব্যবসায়ীর

হাওরের কৃষকদের এই দুর্দশার একটি বড় কারণ বাজার কাঠামোর অসামঞ্জস্য। কৃষক যখন মণপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকায় ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেই ধান চাতাল ও মিলে গিয়ে চাল হয়ে বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি দামে। বাজারে ২৫ কেজির চালের বস্তা এখনও দেড় হাজার টাকার উপরে। অর্থাৎ, উৎপাদক কৃষক লোকসানে ধুঁকছেন, আর মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা মুনাফা করে যাচ্ছেন।

সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার আড়তদার মহসিন আহমেদ জানালেন বাস্তবচিত্র। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের ধান নিয়ে প্রতি বছর কৃষকরা বিপদে পড়েন। তবে এ বছরের মতো এত বড় বিপদে পড়েননি। ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না, আবার পেলেও মজুরি লাগছে এক হাজার টাকা। এরপর বৃষ্টির কারণে ধান মাড়াই ও শুকানো যাচ্ছে না। সবশেষে পরিবহন খরচ দিয়ে বাজারে আনতে প্রতি মণ ধানে কৃষকের খরচ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। আড়তে এনে বিক্রি করার পর কৃষক পাচ্ছেন সর্বোচ্চ এক হাজার ৪০০ টাকা।’


কর্তৃপক্ষ কী বলছে

সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, ‘সংকটময় পরিস্থিতির মধ্যেও কৃষকরা মাঠে আছেন। চেষ্টা করছেন ধান তোলার জন্য। আমরাও প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। কিন্তু গত দুই দিনের বৃষ্টি ও ঢলে অধিকাংশ জমির ধান ডুবে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী ১৫ মে’র মধ্যে ধান কাটা শেষ হবে।’

কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান বলেন, ‘এ বছর বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ বাজারে ধানের দাম কম। আমরা ধানের প্রকৃত উৎপাদন খরচ উচ্চমহলে পাঠাবো। আমরা চাই কৃষক যেন কোনোভাবে ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত না হন।’ তিনি আরও জানান, ধানগাছ পাঁচ-ছয় দিন পানির নিচে থাকলে ক্ষতি আরও বাড়বে, পানি নেমে গেলে ক্ষতি কিছুটা কমবে।

মিঠামইন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল ইসলাম খান অপু বলেন, ‘অতিবর্ষণের কারণে হাওরাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের জমিগুলোতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত পানি সরে না গেলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।’

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ‘অতিবৃষ্টিতে হাওরের পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। তবে ইটনায় ২৭ সেন্টিমিটার ও চামড়াঘাটে ৭ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।’


কোনো সমাধান নেই, কৃষকের পাশে কেউ নেই

সুনামগঞ্জ হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বললেন, ‘চোখের সামনে অনেক কৃষকের ধান তলিয়ে যাচ্ছে। কৃষকরা কাঁদছেন। অনেক কৃষক আধা ভাগিতেও ধান কাটা শ্রমিক পাচ্ছেন না। হাওরে কৃষকের অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে কেউ নেই।’

দুর্যোগের সময় সরকার যদি ভেজা ধান কিনে মিলিংয়ের ব্যবস্থা করত, তাহলে কৃষকদের এই দুর্দশা কিছুটা হলেও লাঘব হতো বলে মনে করছেন হাওরপারের মানুষ। কিন্তু সেই উদ্যোগ নেই। সরকারের ধান ক্রয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা আগামী ৩ মে থেকে, এবং তা শুধু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায়, নির্দিষ্ট কেন্দ্রে।

এ বছর কিশোরগঞ্জে মোট ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৩০ টন। সুনামগঞ্জে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। কিন্তু বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ধান, শুকাতে না পারা ফসল আর লোকসানে বিক্রি হওয়া শস্যের হিসাব মেলালে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় সংশয়।

হাওরের পানিতে এখন ডুবছে শুধু ধান নয় — ডুবছে একটি পরিবারের সারা বছরের স্বপ্ন, একটি সংসারের বেঁচে থাকার ভরসা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category