সকাল হতেই বাজারে থলি হাতে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন আমজনতা। সংবাদপত্রে খবর আসছে—বিশ্ববাজারে চালের দাম এক বছরে ১৯ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কিন্তু সেই খবরের রেশ কাটতে না কাটতেই চালের দোকানে গিয়ে ক্রেতারা দেখছেন উল্টো চিত্র। এক কেজি চাল কিনতে পকেট থেকে বের করতে হচ্ছে আগের চেয়ে বেশি টাকা। এই যেন সেই প্রবাদ—‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তার ওপর চালের দাম ঘোড়ায় চড়ায়’। দেশের বাজারে চালের দাম ৫ থেকে ৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পেছনে কি শুধুই ‘জ্বালানি তেল’ বা ‘বৃষ্টির দোহাই’, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো অন্ধকার গলি?
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রব্যমূল্য ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা বিষয়ক টাস্কফোর্সের তথ্য এক বিষ্ময়কর বৈপরীত্য তুলে ধরছে। গত বছরের ১৯ এপ্রিলের তুলনায় এ বছরের চিত্রটি এমন—এক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে ৫ শতাংশ ভাঙা সেদ্ধ চালের প্রতি টনের দাম ছিল ৫২৯ ডলার, যা বর্তমানে ৪৩৩ ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজারে চালের দাম কমেছে ১৮ দশমিক ১৫ শতাংশ। ১৫ শতাংশ আধাসিদ্ধ চালের ক্ষেত্রে দাম কমার হার আরও বেশি—প্রায় ১৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ।
অথচ আমাদের দেশের বাজার যেন এক ভিন্ন গ্রহের অংশ। এক বছর আগে যে স্বর্ণা চাল ৫২-৫৭ টাকায় পাওয়া যেত, তা এখন ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের পাইজাম চালের দামও ঊর্ধ্বমুখী। চালের মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের এই অযৌক্তিক দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। আমদানিতে শুল্কছাড়ের যে ‘মধু’ সরকার বিতরণ করেছিল, তার পুরোটাই যেন মাঝপথে কোথাও কর্পূরের মতো উড়ে গেছে।
চালের দাম বৃদ্ধির পেছনে বিশেষজ্ঞরা চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন, যা মূলত এই অস্বাভাবিকতাকে জিইয়ে রাখছে:
১. তদারকির হাহাকার ও অকেজো মনিটরিং: বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) মতে, দেশের বাজার ব্যবস্থা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে তদারকির ছিদ্র দিয়ে মুনাফাখোররা অনায়াসে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে বা ম্যানেজ করে মিলার ও আড়তদার পর্যায়ে দামের কারসাজি এখন ওপেন সিক্রেট।
২. সিন্ডিকেটের মরণকামড়: দেশে চালের উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি। সরকারি তথ্যমতে, দেশে চাহিদা যেখানে ৩ কোটি ৮০ লাখ থেকে ৪ কোটি ২৪ লাখ টন, সেখানে উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৫ লাখ টনের বেশি। এরপরও বাজারে কৃত্রিম সংকট কেন? সাধারণ ক্রেতাদের দাবি, শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গোডাউনে চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে প্রতি কেজি চালে ৫-১০ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
৩. উৎপাদন ও যাতায়াত খরচের ‘বোঝা’: কৃষকের উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়ছে। সারের দাম বৃদ্ধি, শ্রমিকের উচ্চ মজুরি এবং দফায় দফায় জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে যাতায়াত খরচ বেড়ে গেছে বহুগুণ। ব্যবসায়ীরা এই খরচকে ‘অজুহাত’ হিসেবে ব্যবহার করে চালের দামের ওপর বাড়তি প্রলেপ দিচ্ছেন।
৪. ডলারের ‘কালো ছায়া’: আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আমদানিকারকরা বলছেন ডলারের উচ্চ বিনিময় হারের কথা। স্থানীয় মুদ্রায় ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল সাধারণ ক্রেতাদের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারছে না।
বাজারে অরাজকতা চললেও কেউ দায় নিতে রাজি নন। মিলাররা বলছেন দোষ আড়তদারদের, আর আড়তদাররা আঙুল তুলছেন মিলারদের দিকে। বাংলাদেশ অটো রাইস অ্যান্ড হাসকিং মিল অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, মিলার পর্যায়ে কোনো সিন্ডিকেট হয় না; যা হওয়ার তা খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে হয়। অন্যদিকে আড়তদারদের দাবি, তাঁরা কেবল কমিশন পান, তাই চালের দাম বৃদ্ধিতে তাঁদের কোনো লাভ নেই। এই যে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি, এর মধ্যেই পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-র গবেষণায় উঠে এসেছে এক গভীর সত্য। ২০২৩ সাল থেকে চলা উচ্চ মূল্যস্ফীতি চালের দামকে নাগালের বাইরে রাখছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এখনো ৮ শতাংশের ওপর। সিপিডি মনে করে, বাজারে যদি কার্যকর প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা না যায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের সুফল পাওয়া কল্পনা মাত্র।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সম্প্রতি জানিয়েছেন, সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মজুতদারদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তা নিয়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—চালের মতো সংবেদনশীল বাজারে যখন আগুন লাগে, তখন সেই আগুন নেভাতে টাস্কফোর্স কতটা কার্যকর হবে?
চালের উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ৪ কোটি টনের বেশি উৎপাদন হওয়ার পরও যদি চাল আমদানির অপেক্ষায় থাকতে হয় এবং আমদানির সুফল যদি সাধারণ মানুষের পাতে না পৌঁছায়, তবে তা জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত।
চাল এখন কেবল একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি রাজনীতির অন্যতম অনুঘটক। অসাধু ব্যবসায়ীরা যখন বৃষ্টির দোহাই দিয়ে বা জ্বালানি তেলের সংকটের তকমা লাগিয়ে পকেট কাটে, তখন রাষ্ট্রের অভিভাবক সুলভ আচরণ জরুরি। শুধু মুখে ‘সংকট নেই’ বললে হবে না, বরং গুদামে হানা দিয়ে মজুতদারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা আনা এবং ডলারের বাজারের স্থিরতা নিশ্চিত করা না গেলে, বিশ্ববাজারে চালের দাম শূন্যে নেমে এলেও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের থালায় সস্তায় ভাত জুটবে না।
সাধারণ জনগণের এখন একটাই দাবি—বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয় করে অবিলম্বে দেশে চালের দাম কমানো হোক। ভাতের গন্ধে যেন হতাশা নয়, বরং তৃপ্তি ফিরে আসে প্রতিটি বাঙালির ঘরে।