বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসে রাজনৈতিক প্রভাবে কর্মকর্তাদের ‘ওএসডি’ (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করার সংস্কৃতি এখন চরম প্রশাসনিক পক্ষাঘাতের রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দোহাই দিয়ে বিপুল সংখ্যক দক্ষ কর্মকর্তাকে মূল ধারা থেকে সরিয়ে রাখায় সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন—সর্বত্রই কাজের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। একদিকে হাজার হাজার পদ শূন্য, অন্যদিকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখে বেতন দেওয়া—এই দ্বিমুখী সংকটে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ।
বর্তমানে জনবল সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি অনেকটা থমকে গেছে। অধিকাংশ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে কর্মকর্তাদের সংকট এতটাই তীব্র যে, একেকজন কর্মকর্তাকে একযোগে দুই থেকে ছয়টি পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন দপ্তরের দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় সেবা পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছে।
আইন পাস, বাজেট প্রণয়ন, উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ফাইলগুলো এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে যেতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এই ধীরগতি এখন কেন্দ্র থেকে মাঠ পর্যায়ের সেবা পর্যন্ত এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
‘টাইমস অব বাংলাদেশ’-এর পক্ষ থেকে ৫৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে চালানো এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা বর্তমানে একাধিক দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রবণতা অতিরিক্ত সচিব থেকে শুরু করে সহকারী সচিব পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই বিদ্যমান।
গড়ে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে অন্তত সাতজন কর্মকর্তা দুই বা তিনটি শাখা বা উইংয়ের দায়িত্ব একাই সামলাচ্ছেন। সবচেয়ে নাজুক অবস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, যেখানে ৩৫ জন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্বে নিয়োজিত। এরপরই রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ (২০ জন) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (১৬ জন)।
জনবল সংকটের প্রভাবে সবচেয়ে বড় স্থবিরতা দেখা গেছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে। এখানে ‘পুরাকীর্তি আইন’ সংশোধনের বিষয়টি গত দুই বছর ধরে ঝুলে আছে। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বর্তমান কাঠামোর কারণে এই কমিটি কোনো সভা করতে পারছে না, কারণ পদমর্যাদায় মহাপরিচালকের চেয়ে সংসদ সদস্যরা উপরে। এই আইনি জটিলতা নিরসনের জন্য একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনা হলেও তা গত দুই বছর ধরে মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে।
মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, অতিরিক্ত সচিব এ কে এম আবদুল্লাহ খান একাই প্রশাসন, বাজেট, শিল্পকলা, লাইব্রেরি, আইন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং জাদুঘরসহ মোট ছয়টি উইং সামলাচ্ছেন। যদিও তিনি দাবি করেছেন ওয়েবসাইটটি পুরনো এবং তিনি কেবল উন্নয়ন বিভাগ দেখেন, তবে অন্যান্য কর্মকর্তাদের মতে, মন্ত্রণালয়ে অন্য কোনো অতিরিক্ত সচিব না থাকায় সব দায়ভার তার ওপরই বর্তেছে।
একইভাবে এই মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এলোরা সুমনা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা পরিচালনা করছেন। অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে তাকে প্রায়শই অফিস সময়ের বাইরে বাড়ি থেকেও দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে।
প্রশাসনের এই অস্থিরতার অন্যতম কারণ ‘ওএসডি’ বা বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পদ। আইনিভাবে এটি জনবল উদ্বৃত্ত বা বিশেষ অ্যাসাইনমেন্টের জন্য ব্যবহার করার কথা থাকলেও, বাস্তবে একে রাজনৈতিক ‘শাস্তি’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গত অন্তর্বর্তী সরকার থেকে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের রূপান্তরকালীন সময়ে প্রায় ৭০০ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর বা ওএসডি করা হয়েছে।
সংসদে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার সরকারি পদ শূন্য রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি চারটি পদের একটিই খালি। অথচ দক্ষ কর্মকর্তাদের ওএসডি করে বসিয়ে রেখে এই শূন্যপদগুলো পূরণের বদলে বিদ্যমান কর্মকর্তাদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান এই পরিস্থিতির ওপর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার মতে:
“একজন কর্মকর্তা যখন তার মূল কাজের বাইরে আরও কয়েকটি দপ্তরের দায়িত্ব পালন করেন, তখন তিনি কোনোটিই কার্যকরভাবে করতে পারেন না। প্রয়োজনীয় ফাইলে কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর পেতে দেরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রশাসনিক গতি ফেরাতে হলে অবিলম্বে এই ওএসডি কর্মকর্তাদের কাজে লাগানো এবং শূন্যপদ পূরণ করা জরুরি।”
তবে এই সংকটের কথা সরাসরি স্বীকার করতে নারাজ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন উইংয়ের যুগ্ম সচিব মো. তৌফিক ইমাম। তিনি দাবি করেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব কেবল স্বল্প সময়ের জন্য দেওয়া হয় এবং এটি কোনো স্থায়ী সংকট নয়। তার মতে, কেউ ছুটিতে থাকলে বা অস্থায়ী শূন্যতা তৈরি হলে অন্য কেউ কয়েক দিনের জন্য সেই দায়িত্ব পালন করেন।
শীর্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চাপে মন্ত্রিপরিষদ ও সড়ক বিভাগ
প্রশাসনিক এই স্থবিরতার চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে দেশের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মন্ত্রণালয়ে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জনবল সংকটের কারণে অতিরিক্ত কাজের চাপে সবচেয়ে বেশি ধুঁকছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, যেখানে রেকর্ড সংখ্যক ৩৫ জন কর্মকর্তা একযোগে একাধিক দপ্তরের দায়িত্ব পালন করছেন। এর পরেই রয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, যেখানে ২০ জন কর্মকর্তাকে নিজ পদের বাইরে বাড়তি উইং বা শাখার ভার সামলাতে হচ্ছে। তালিকায় তৃতীয় অবস্থানে থাকা সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে এমন কর্মকর্তার সংখ্যা ১৬ জন। মূলত এই তিন শীর্ষ দপ্তরে জনবল সংকটের প্রভাব সরাসরি জাতীয় নীতিনির্ধারণী কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, জনবল সংকটের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অবিলম্বে রাজনৈতিক মেরুকরণ থেকে প্রশাসনকে মুক্ত করতে হবে। ওএসডি কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করা না গেলে ২০২৬ সালের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।