মানুষের ইতিহাসে যুদ্ধকে অনেকেই আদর্শের সংঘর্ষ বলেছেন, কেউ বলেছেন সভ্যতার পরীক্ষা, আবার কেউবা আখ্যা দিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদের নেশা হিসেবে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা যুদ্ধকে দেখেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। তাদের কাছে যুদ্ধ মানেই একটি বিশাল বাজার—যেখানে একজন মরবে, আর অন্যজন বেচবে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেখে স্পষ্টতই মনে হচ্ছে, আমেরিকা তাদের সেই পুরোনো যুদ্ধের ব্যবসার খাতাটি নতুন করে খুলে বসেছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতির নাম করে যে ভঙ্গুর শান্তি এখন ঝুলছে, তা অনেকটা গ্রামের মাতব্বরের শালিসের মতো; সবাই জানে ঝগড়া থামেনি, শুধু লাঠিটা সাময়িকভাবে মাটিতে রাখা হয়েছে। আর ঠিক এই ‘বিরতি’র সুযোগেই আমেরিকা এমন তাড়াহুড়ো করে অস্ত্র বিক্রি শুরু করেছে, যেন ঈদের আগে নিউমার্কেটের কোনো ব্যস্ত দোকানদার। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং আমেরিকার ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করছে, পারস্য উপসাগর এখন আর কোনো সাধারণ আন্তর্জাতিক জলপথ নেই, বরং এটি পরিণত হয়েছে ‘জলদস্যুদের খাজনার ঘাটে’।
যুদ্ধের ভয়টাই এখন অস্ত্র কোম্পানিগুলোর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার পর সবার মনে একটাই প্রশ্ন—‘আমার আকাশ কে বাঁচাবে?’ এই আতঙ্কের সুযোগ নিয়েই ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে।
কংগ্রেসের দীর্ঘ পর্যালোচনার নিয়মকে পাশ কাটিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাঁর বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন। অর্থাৎ, যুদ্ধের বাজারে সময় নষ্ট করার কোনো সুযোগ নেই। এই বিপুল অস্ত্র বিক্রির তালিকায় রয়েছে:
ইসরায়েল: ৯৯২.৪ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে ১০,০০০ ‘অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল ওয়েপন সিস্টেম-২’। বিই সিস্টেমসের (BAE Systems) তৈরি এই অস্ত্র যেন আধুনিক যুগের শিকারি বাজপাখি।
কাতার: ইসরায়েলের সমান সংখ্যক অস্ত্রের পাশাপাশি ৪.০১ বিলিয়ন ডলারের ২০০টি ‘প্যাট্রিয়ট অ্যাডভান্সড ক্যাপাবিলিটি-২’ এবং ৩০০টি ‘প্যাট্রিয়ট-৩’ ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র।
সংযুক্ত আরব আমিরাত: ১৪৭.৬ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র।
কুয়েত: ২.৫ বিলিয়ন ডলারের ‘ইন্টিগ্রেটেড ব্যাটল কমান্ড সিস্টেম’।
এই বিপুল চুক্তির পেছনে কলকাঠি নাড়ছে নর্থরোপ গ্রুম্যান, আরটিএক্স (RTX) এবং লকহিড মার্টিনের মতো কর্পোরেট জায়ান্টরা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বন্দ্ব এখন কেবল আকাশে সীমাবদ্ধ নেই, তা সমুদ্রেও গড়িয়েছে। আর এই সমুদ্রযুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা শুনে মনে হয় তিনি কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট নন, বরং জলদস্যু সিনেমার কোনো চরিত্র।
সম্প্রতি একটি ইরানি জাহাজ জব্দের বর্ণনা দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা জাহাজটি দখল করেছি। এর মালপত্র এবং তেলও আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। এটি বেশ লাভজনক ব্যবসা।” পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের নেতার মুখে এমন ‘জলদস্যু’সুলভ স্বীকারোক্তি আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপকদেরও হতবাক করেছে। টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক জলসীমায় মার্কিন কার্যক্রম নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে, পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌ-অবরোধ তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালি—যেখান দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরল গ্যাস পরিবাহিত হয়—এখন যুদ্ধের নতুন কেন্দ্র। এই অবরোধের ফলে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই পরিস্থিতিকে ‘অসহনীয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আতঙ্কে কাঁপছে, সেখানে আমেরিকার তেল ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তেলের চাহিদা হঠাৎ করেই আকাশচুম্বী।
১৯৪৩ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে তাদের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি আমদানিকে প্রায় ছাড়িয়ে গেছে।
আমদানি-রপ্তানির নতুন সমীকরণ: গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের নিট আমদানি কমে দৈনিক মাত্র ৬৬ হাজার ব্যারেলে নেমে আসে। বিপরীতে, রপ্তানি বেড়ে দাঁড়ায় দৈনিক ৫২ লাখ ব্যারেলে।
নতুন বাজার: এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা মধ্যপ্রাচ্যের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে এখন আমেরিকার দিকে ঝুঁকছে। কেপলারের (Kpler) তথ্য বলছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৪৭ শতাংশ গেছে ইউরোপে এবং ৩৭ শতাংশ গেছে এশিয়ায়।
নতুন ক্রেতা: পরিবহন খরচ বাড়লেও উপায় না পেয়ে গ্রিস এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল কিনেছে। তুরস্কও অন্তত এক বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মার্কিন তেল আমদানি করছে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। ইউরোপের দ্রুত সরবরাহযোগ্য অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ১৫০ ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পৃথিবী যখন আতঙ্কে জ্বালানি কিনছে, আমেরিকার তেলের কূপগুলো তখন ডলার উগড়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধের সবচেয়ে পুরোনো নিয়ম হলো—যে বাঁচে সে ইতিহাস লেখে, আর যে লাভ করে সে বাজার লেখে। আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ মানে কেবল বোমা ফেলা নয়; এটি একই সঙ্গে অস্ত্রের প্রদর্শনী, তেলের বাজার এবং ভূরাজনৈতিক ব্যবসা। মধ্যপ্রাচ্যে যখন সাধারণ মানুষ প্রাণভয়ে বাংকারে আশ্রয় নিচ্ছে, তখন ওয়াশিংটনের বোর্ডরুমে কেউ না কেউ বসে হিসাব কষছে—আর কতটি ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি হবে, আর কত ব্যারেল তেল রপ্তানি করা যাবে।
সূত্র: দ্যা প্রেস