ভোররাত চারটা। চারপাশের আকাশ তখনো কালচে চাদরে মোড়ানো, পুরোপুরি ভোরের আলো ফুটতে ঢের বাকি। নিস্তব্ধ রাজধানীর বুক চিরে ছুটে চলা দু-একটি গাড়ির শব্দ ছাড়া চারদিক অদ্ভুত রকমের শান্ত। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনের প্রশস্ত সড়ক দিয়ে তীব্র গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিল একটি ব্যাটারিচালিত রিকশা। সেই রিকশার যাত্রী ৪০ বছর বয়সী শিল্পী বেগম। তাঁর চোখে-মুখে খেলা করছিল রাজ্যের উৎকণ্ঠা আর ভয়। ভোরের এই নিস্তব্ধতা উপভোগ করার মতো মানসিক অবস্থায় তিনি ছিলেন না, কারণ তাঁর কোলে শক্ত করে চেপে ধরা ব্যাগের ভেতরে রয়েছে শাশুড়ির জরুরি চিকিৎসার জন্য জোগাড় করা নগদ ২৫ হাজার টাকা।
মাত্র কয়েক মিনিট আগেই রাজধানীর স্বনামধন্য নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল থেকে তাঁর স্বামী আবদুল হক অত্যন্ত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে ফোন করে জানিয়েছেন, মায়ের শারীরিক অবস্থা হঠাৎ করেই চরম আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, জীবন বাঁচাতে দ্রুত ওষুধের জন্য টাকা নিয়ে হাসপাতালে আসতে হবে। স্বামীর সেই আর্তনাদ শুনে এক মুহূর্তও দেরি না করে ইব্রাহিমপুরের বাসা থেকে রিকশা নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটেছিলেন শিল্পী বেগম। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, হাসপাতালের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর আগেই তাঁর পথ আগলে দাঁড়ায় সাক্ষাৎ যমদূত। দুটি বেপরোয়া গতির মোটরসাইকেলে চেপে আসা ছয়জন সশস্ত্র যুবক হঠাৎ করেই রিকশার গতিরোধ করে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তের মধ্যে অন্ধকারের বুক চিরে ঝিলিক দিয়ে ওঠে তাদের হাতের ধারালো সুইচ গিয়ার আর চাপাতি। জীবন বাঁচাতে আর শাশুড়ির চিকিৎসার টাকা রক্ষা করতে শিল্পী বেগম সামান্য বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই দুর্বৃত্তরা চরম নিষ্ঠুরতায় তাঁর পেট ও পায়ে এলোপাতাড়ি কোপ বসিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই রক্তাক্ত শিল্পী বেগম রিকশার পাটাতনে লুটিয়ে পড়েন, আর এই সুযোগে সশস্ত্র ছিনতাইকারী চক্র তাঁর হাতের ব্যাগ, নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে নির্বিঘ্নে অন্ধকারের মধ্যেই উধাও হয়ে যায়।
এই নির্মম ও লোমহর্ষক ঘটনাটি শুধু শিল্পী বেগমের একার নয়। এটি বর্তমান ঢাকার এক ভয়ংকর ও নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান প্রধান সড়কগুলোয় এমন অসংখ্য সশস্ত্র ছিনতাই, দস্যুতা এবং প্রাণঘাতী হামলার ঘটনার নীরব সাক্ষী হয়েছেন নগরীর বাসিন্দারা। ছিনতাইকারীর ধারালো ছুরির আঘাত আর সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের গোলাগুলির ঘটনায় বর্তমানে প্রায় প্রতিদিনই চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন রাজধানীর সাধারণ মানুষ। ঘর থেকে বের হলে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরতে পারবেন কি না, সেই শঙ্কা এখন প্রতিটি নাগরিকের মনে।
অনুসন্ধান ও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু সশস্ত্র ছিনতাই কিংবা ডাকাতি নয়, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাজধানীতে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের গত চার মাসেই রাজধানীতে ৭৮ জন মানুষ বিভিন্নভাবে হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অনেকেই এই ছিনতাইকারীদের হাতে প্রাণ দিয়েছেন। অন্যদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) দাবি করছে, গত ছয় মাসে তারা রাজধানী ঢাকা থেকে অন্তত এক হাজার ১০০ জন পেশাদার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনেছে। এর মধ্যে শুধু মে মাসের ১ তারিখ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত পরিচালিত বিশেষ অভিযানে নানা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ৭০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০০ জনই সরাসরি ছিনতাই ও দস্যুতার সঙ্গে জড়িত।
রাজধানীতে পুলিশের এমন ব্যাপক ধরপাকড় এবং এত বিপুলসংখ্যক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির কেন কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হচ্ছে না—এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গতানুগতিক পুলিশি অভিযান, টহল বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একক কার্যক্রম দিয়ে সমাজের গভীরে শেকড় গেড়ে বসা এই সংঘবদ্ধ অপরাধ পুরোপুরি রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এর থেকে মুক্তি পেতে হলে রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, সাধারণ মানুষসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে যেসব ছিনতাইকারী মাদকের ভয়াল থাবায় জড়িয়ে এই অন্ধকার জগতে প্রবেশ করেছে, তাদের শুধু জেলে না পাঠিয়ে আধুনিক মাদক নিরাময় কেন্দ্রে রেখে সুস্থ করে তুলতে হবে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে কর্মসংস্থানের কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় জেল থেকে বের হয়ে তারা আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হবে।
আগারগাঁওয়ের সেই ভয়ংকর ঘটনায় গুরুতর জখম হওয়া শিল্পী বেগম বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাঁর স্বামী, পেশায় ব্যবসায়ী আবদুল হক অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশার সঙ্গে এই প্রতিবেদককে জানান তাঁর এক বিষাদময় আইনি লড়াইয়ের কাহিনি। গত ১ মে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট থেকে স্ট্রোক করা অসুস্থ মাকে নিয়ে তিনি অনেক আশা নিয়ে এসেছিলেন ঢাকার আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে। মায়ের জীবন বাঁচাতে টাকার জন্য তিনি স্ত্রী শিল্পী বেগমকে ফোন করেছিলেন। সেই টাকা নিয়ে আসার পথেই তাঁর স্ত্রী এমন ভয়াবহ হামলার শিকার হন। তবে আবদুল হকের অভিযোগ আরও গুরুতর এবং পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মতো। তিনি চরম আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমার স্ত্রীর রক্তক্ষরণ হচ্ছে, এত বড় একটি মর্মান্তিক ঘটনার পর আমি যখন বিচার চাইতে শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করতে গেলাম, তখন পুলিশ আমার মামলা নিতে চাইল না। উল্টো তারা চরম অসহযোগিতাপূর্ণ আচরণ করে বলল, আমি যদি ছিনতাইকারীদের নাম-ঠিকানা না দিতে পারি, তবে কোনোভাবেই মামলা রেকর্ড করা হবে না। আমি একজন সাধারণ মানুষ হয়ে রাতের অন্ধকারে মাস্ক পরা অজ্ঞাত ছিনতাইকারীদের নাম কোথা থেকে জানব? শেষমেশ অনেক ঘোরানোর পর শুধু একটি সাধারণ ডায়েরি বা অভিযোগ (জিডি) নিয়ে আমাকে থানা থেকে একপ্রকার বিদায় করে দেওয়া হয়।’
থানা পুলিশের এই ধরনের অপেশাদার ও শীতল আচরণে সাধারণ মানুষের আইনি নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গাটি চরমভাবে হোঁচট খাচ্ছে। এই ছিনতাইয়ের অভিযোগটির তদন্তকারী কর্মকর্তা শেরেবাংলানগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদ অবশ্য দাবি করেছেন যে, তাঁরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন। কিন্তু ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় তাঁরা কোনো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পাননি। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যদি কোনোভাবে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়, কেবল তখনই এটিকে একটি নিয়মিত মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হবে। পুলিশের এমন বক্তব্যে সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর এলাকায় যদি ন্যূনতম সিসিটিভি নজরদারি না থাকে বা পুলিশ যদি আসামির নাম ছাড়া মামলা নিতে এমন প্রকাশ্য গড়িমসি করে, তবে অপরাধীরা তো ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকার নিশ্চয়তা পেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া ও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠবে।
শুধু আগারগাঁও নয়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, মালিবাগ, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, আদাবরসহ প্রতিটি এলাকাতেই প্রায় প্রতিদিন এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গত ১ মে মহান মে দিবসের রাতে মালিবাগ রেলগেটের ইবনে সিনা হাসপাতালের সামনের প্রধান সড়কে তিন নিরীহ পোশাক শ্রমিক করিমন, নবী ও রিফাতকে সুইচ গিয়ার (চাকু) দিয়ে নির্মমভাবে কুপিয়ে আহত করে ছিনতাইকারীরা। শ্রমিক দিবসের ছুটিতে একটু স্বস্তির আশায় ঘুরতে বেরিয়ে তাঁরা যে এমন নৃশংস হামলার শিকার হবেন, তা ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেননি। এর ঠিক এক দিন আগে, গত ৩০ এপ্রিল ভোরে শাহবাগ এলাকায় জামাল উদ্দিন ও সামছুন্নাহার নামের এক প্রবীণ দম্পতি প্রাতর্ভ্রমণে বেরিয়ে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে কাছে থাকা সামান্য কিছু টাকা ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়। কিছুদিন আগে যাত্রাবাড়ীর কাজলায় ভয়াবহ যানজটে আটকে পড়া একটি গাড়ির চালককে প্রকাশ্যে ছুরিকাঘাত করতেও একবিন্দু দ্বিধা করেনি এই ছিনতাইকারীরা।
ছিনতাইয়ের পাশাপাশি রাজধানীতে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সন্ত্রাসীদের অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও গোলাগুলির ঘটনা। গত ৭ মে রাতে মহাখালীর পুরনো কাঁচাবাজারের সামনে মোটরসাইকেলে আসা পাঁচ-ছয়জন সশস্ত্র সন্ত্রাসী সম্পূর্ণ বিনা কারণে পথচারীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে রফিকুল ইসলাম নামের এক সাধারণ আউটসোর্সিং কর্মচারী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। একই দিন কদমতলীর ঢাকা ম্যাচ কলোনি এলাকায় মাদক ব্যবসা ও এলাকার আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুটি কিশোর গ্যাংয়ের গোলাগুলিতে লাকড়ি ব্যবসায়ী রনি, এক কিশোরসহ অন্তত চারজন গুলিবিদ্ধ হন। এসব লোমহর্ষক ঘটনার কোনো কোনোটির সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল ভিডিও সমাজমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, যা দেখে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হচ্ছে।
ডিএমপি পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান বলছে, গত ছয় মাসে রাজধানী থেকে অন্তত এক হাজার ১০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এত গ্রেপ্তারের পরও পরিস্থিতির কেন উন্নতি হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘এটি একটি চলমান আইনি ও সামাজিক সংকট। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর এই পেশাদার ছিনতাইকারীরা খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে এবং আবারও একই অপরাধমূলক পেশায় জড়ায়। আমাদের তালিকা অনুযায়ী, এদের বেশির ভাগই চরম মাদকাসক্ত। মাদকের টাকার অভাবেই তারা এই বেপরোয়া জীবন বেছে নেয়। তার পরও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রাতের বেলা পুলিশের মোবাইল টহল ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে চেকপোস্টের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।’
পুলিশের এই দাবির বাস্তব সত্যতা পাওয়া যায় আদাবর থানা পুলিশের সাম্প্রতিক একটি অভিযানে। সেখান থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ভয়ংকর কিশোর গ্যাং ‘রক্ত চোষা জনি গ্রুপ’-এর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে পরিচিত ‘পাংখা রুবেল’-কে গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে পিলে চমকানো তথ্য। এই রুবেল আদাবর থানার দুটি পৃথক মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি। শুধু তা-ই নয়, এত অল্প বয়সেই তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা, চাঁদাবাজি, হত্যাচেষ্টা ও মাদক ব্যবসাসংক্রান্ত মোট ৯টি গুরুতর মামলা রয়েছে। এর আগেও তাকে পুলিশ একাধিকবার গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই সে আইনের ফাঁকফোকর গলে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও নিজের গ্যাং নিয়ে ছিনতাইয়ে নেমেছে। এ বিষয়ে আদাবর থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ‘আমি এই থানায় নতুন ওসি হিসেবে যোগ দিয়েছি। আমরা পেশাদার ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছি। মাঠের লড়াইয়ে হয় এই অপরাধীরা থাকবে, না হয় আমরা পুলিশ বাহিনী থাকব। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না।’
গোয়েন্দা সূত্র ও পুলিশের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে রাজধানীতে মূলত তিন ধরনের ছিনতাইকারী চক্র অত্যন্ত সক্রিয়। এদের মধ্যে একটি গ্রুপ হলো পেশাদার ও সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী, যারা চোরাই প্রাইভেট কার বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে রাতের বেলায় নির্দিষ্ট স্পটে ওৎ পেতে থাকে এবং সুযোগ বুঝে বড় ধরনের ডাকাতি বা ছিনতাই করে। দ্বিতীয় গ্রুপটি হলো ভাসমান মাদকাসক্ত ও পথশিশুরা। এরা মূলত মাদকের টাকা জোগাড় করতে জ্যামে বসে থাকা গাড়ির জানালা দিয়ে যাত্রীদের মোবাইল বা পথচারীদের ভ্যানিটি ব্যাগ ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে দ্রুত দৌড়ে কোনো চিপা গলিতে পালিয়ে যায়। আর তৃতীয় ও সবচেয়ে ভয়ংকর গ্রুপটি হলো কিশোর গ্যাং ও শৌখিন অপরাধীরা। এদের মধ্যে অনেক উচ্চবিত্ত পরিবারের বখে যাওয়া সন্তান বা নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রও রয়েছেন, যাঁরা গভীর রাতে দামি স্পোর্টস বাইকে ঘুরে বেড়ান এবং নিছক ‘অ্যাডভেঞ্চার’ বা নিজেদের আধিপত্য জাহির করতে ছিনতাই ও দস্যুতায় অংশ নেন।
ডিএমপির অপরাধ পরিসংখ্যান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে রাজধানীতে সরকারি খাতায় নথিবদ্ধ ১০১টি ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত এপ্রিল মাসে ছিনতাই ও দস্যুতার মামলা হয় ২৫টি। মার্চ মাসেও সমসংখ্যক অর্থাৎ ২৫টি মামলা রেকর্ড হয়। আর ফেব্রুয়ারি মাসে মামলা হয় ২২টি এবং বছরের শুরুতে জানুয়ারিতে এই সংখ্যা ছিল ২৯টি।
তবে অপরাধ বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, পুলিশের খাতায় থাকা এই হিসাব প্রকৃত অপরাধের খণ্ডচিত্র মাত্র। বাস্তবে ভুক্তভোগীদের একটি বিশাল অংশ পুলিশি হয়রানি, দীর্ঘমেয়াদি আইনি জটিলতা এবং মামলা করার পর আসামিদের কাছ থেকে প্রাণনাশের হুমকির ভয়ে থানায় গিয়ে কোনো অভিযোগই করেন না। অনেকে আবার শিল্পী বেগমের স্বামীর মতো পুলিশের ‘মামলা না নেওয়ার চরম প্রবণতা’ বা অসহযোগিতার কারণে কেবল একটি জিডি করে বা কিছুই না করে ভগ্ন হৃদয়ে ফিরে আসেন। ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা নথিবদ্ধ তথ্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। রাজধানীর ফুটপাতগুলোয় এখন সাধারণ মানুষ বা অফিসগামী পথচারীরা দিনের বেলাতেও পকেট থেকে মোবাইল বের করে কথা বলতে ভয় পান। সন্ধ্যার পর বাসে বা রিকশায় যাতায়াতের সময় জানালা দিয়ে ছোঁ মারা বা সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় গলায় ধারালো অস্ত্র ঠেকানো এখন যেন এক অতি সাধারণ ও গা সওয়া ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভোরে যাঁরা লঞ্চ, ট্রেন বা দূরপাল্লার বাসে করে ঢাকায় ফেরেন এবং গন্তব্যে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন, তাঁরা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত ও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
এসব বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশ্লেষক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘রাজধানীতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ছিনতাই ও হত্যার ঘটনাগুলো কেবল আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতিই নির্দেশ করে না, বরং এটি নাগরিকদের গভীর নিরাপত্তাবোধহীনতার এক ভয়ংকর সংকেতও বহন করে। বিশেষ করে ভোরবেলায় এবং জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্র ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত ছিনতাই সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর আস্থাহীনতা ও ব্যাপক আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। সমাজে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, সহজলভ্য মাদকসংযোগ, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধচক্রের বিস্তার এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত নজরদারি এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। এ ধরনের নৈরাজ্যজনক পরিস্থিতি মোকাবেলা বা নিয়ন্ত্রণে শুধু পুলিশি অ্যাকশন যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে দৃশ্যমান ও নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। পুরো ঢাকা শহরকে অত্যাধুনিক সিসিটিভি নজরদারির আওতায় আনতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো—গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা, যাতে আইনের ফাঁক গলে তারা বেরিয়ে আসতে না পারে। পাশাপাশি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা কার্যকর করা অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিরোধ এবং সাধারণ নাগরিকদের সচেতনতাও বহুগুণে বাড়াতে হবে। রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা অবকাঠামোগত কোনো অগ্রগতিই সাধারণ মানুষের কাছে কোনো অর্থ বহন করবে না।’
সূত্র: কালের কন্ঠ